কোরবানির চামড়া নিয়ে কারসাজি

আপডেট: আগস্ট ১৫, ২০১৯, ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

শাহিনুল ইসলাম আশিক


ঈদের দিন চামড়া সংগ্রহ করছেন কয়েকজন মাদরাসার ছাত্র-সোনার দেশ

কোরবানির পশু চামড়া বিক্রি নিয়ে অসন্তোষ ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের মধ্যে। সর্বনিম্ন দামের তালিকায় এই প্রথম পশুর চামড়া কেনাবেচা হয়েছে রাজশাহীতে। ব্যবসায়ীরা গরু-মহিষের চামড়া ২০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে কেনাবেচা করেছেন। তবে খাসির চামড়া ৫০ টাকা হলেও বকরির চামড়ার দাম ১০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। অনেকটাই পানির দামে বিক্রি হয়েছে পশুর চামড়াগুলো।
তবে অল্প দাম হওয়ায় পশুর চামড়া কেনায় ব্যবসায়ীদের অবহেলা লক্ষ্য করা গেছে। অনেক সময় দায়সারা দাম বলতে দেখা গেছে। চামড়া ছোট আর বড় হোক একই দাম বলেছেন ব্যবসায়ীরাÑ এমন অভিযোগ তুলেছে চামড়া বিক্রেতারা। তারা বলছেন, ৫০ হাজার টাকা মূল্যে গরুর চামড়া ৩০০ টাকা, আবার লাখ মূল্যের টাকার গরুর চামড়াও ৩০০ টাকার উপরে দাম বলে না।
তবে চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন চামড়া সংগ্রহ করবে আরও ১০ থেকে ১২ দিন পর। ওইসময় পর্যন্ত ব্যবসায়ীরা যদি এ চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন, তাহলে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করতে পারবেন। না হলে আরো লোকসানে পড়তে হবে তাদের। যদিও ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে তারা শনিবার থেকেই কাঁচা চামড়া কেনা শুরু করবেন।
ব্যবাসীয়রা আরো জানায়, নির্ধারিত দামে চামড়া বিক্রি করতে হিমসিম খেতে হচ্ছে তাদের। ফলে ক্রয়কৃত চামড়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা। আর বিক্রেতাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেট করে কমানো হয়েছে চামড়ার দাম। তাই সব এলাকায় একই দাম হাকা হয়েছে।
দেখা গেছে, এবছর মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি তেমন ছিলো না। অল্প সংখ্যক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কিনেছেন। চামড়ার দাম কম হওয়ায় তারা লোকসানের কথা ভেবে অনেকেই চামড়া কেনেন নি।
রাজশাহীতে ব্যবসায়ীরা এককেটি চামড়া কিনেছেন, ২০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে। এমন দামে পশুর চামড়া বিক্রি করে হতাশ অনেকেই। চামড়ার দাম কম হওয়ায় অনেকেই চামড়া বিক্রি করেন নি। মাদ্রাসাগুলোতে দিয়েছেন।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পশুর চামড়া কেনাবেচায় অনীহা ছিলো ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে। চামড়া কেনায় ব্যবসায়ীদের গাঁ ছাড়া ভাব লক্ষ্য করা গেছে। ব্যবসায়ীরা ১০০ থেকে ২০০ টাকার বেশি গরুর চামড়ার দাম বলতে চান নি। পরে দর কষাকষি করে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করা হয়েছে চামড়া।
নগরীর বুধপাড়া এলাকার হামিদুজ্জামান হেনা জানায়, তার এলাকায় ১০ গরু ও একটি মহিষ কোরবানি হয়েছিল। এর মধ্যে গরুর চামড়াগুলো গড়ে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। এছাড়া খাসি-ছাগল ৫০ টাকা। আর বকরি ১০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে।
নগরীর মাসকাটাদীঘি এলাকার বাসিন্দা বাবু বলেন, চামড়া পানির দরে বিক্রি হচ্ছে। সোমবার দুপুরে একজন চামড়া ক্রেতা গড়ে ৪০০ টাকা করে দাম বলে চলে যায়। দাম বেশি হবে বলে এলাকার লোক চামড়া দেয়নি। কিন্তু তার পরে তিনি (ব্যবসায়ী) আর আসেনি। পরে অন্য ব্যবসায়ীর কাছে ৩০০ টাকা দরে চামড়া বিক্রি করা হয়।
এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় কোরবানি চামড়ার অস্থায়ী বাজার বসে। ঈদের দিনে বাজারগুলোতে গরুর প্রতিপিস চামড়া ২০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। আর বকরির চামড়া ১০ টাকা ও খাসির চামড়া ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
ঈদের পরের দিন মঙ্গলবার রেলগেট এলাকায় চামড়া ব্যবসায়ীরা ঈদের দিনের কোরবানি করা পশুর চামড়া ক্রয় করে নি। ব্যবসায়ীরা বিক্রেতাদের বলছেন,‘ একদিন আগের চামড়া পঁচে যায়। তাই এমনি দিলেও নিবো না।’ বাধ্য হয়ে অনেকেই ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন চামড়া। ঈদের পরের দিন কোরবানি হওয়া পশুর চামড়া ব্যবসায়ীরা কিনছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে। অনেকেই চামড়ার অল্প দাম শুনে ফেরত নিয়ে গেছেন। উপায়ন্তর না পেয়ে ফিরে এসে ওই দামেই বিক্রি করেছেন চামড়া।
জনৈক আফাজ্জল হোসেন বলেন, কয়েক জায়গা খোঁজ নিয়েছি। চামড়ার দাম নেই। তাই ফেরত নিলে, মাটিতে পুঁতে রাখা ছাড়া উপায় নেই। বাধ্য হয়ে বিক্রি করে দিলাম। মাদ্রাসার উন্নয়নে কাজে লাগবে টাকাগুলো।
তিনি আরো বলেন, চামড়ার দাম গত বছরের তুলনায় অর্ধেক। সরকারকে এদিকে নজর দেয়া দরকার। কারণ গরিবের হক নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ নিজের স্বার্থ হাসিল করছে।
এবারের কোরবানি মৌসুমে সরকার গত বছরের মত গরুর কাঁচা চামড়া প্রতি বর্গফুট সর্বোচ্চ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, গরুর কাঁচা চামড়ার দাম রাজধানীতে প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। খাসির কাঁচা চামড়ার দাম সারাদেশে ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির কাঁচা চামড়ার দাম হবে সারাদেশে ১৩ থেকে ১৫ টাকা। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনাবেচা হয়নি।
ব্যবসায়ী জাহিদ বলেন, চামড়ার দাম কম। ঈদের দিনে চামড়া একটু বেশি দামে কিনেছে ব্যবসায়ীরা। তবে ঈদের পরের দিন সর্বোচ্চ ২০০ টাকা দরে বেচাকেনা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এখন লবণ দিয়ে সংরক্ষণের পর যা খরচ পড়বে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করতে গেলে পুঁজিই উঠবে না।
রাজশাহী জেলা চামড়া গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদ বলেন, ব্লু লেদার পদ্ধতিতে চামড়া সংরক্ষণ করতে হবে। এই পদ্ধতিতে মাত্র ৭০০ টাকা খরচ হবে। এতে পশুর চামড়ায় ১৪ ধরনের কেমিক্যাল দিয়ে ড্রামের মধ্যে সংরক্ষণ করা যাবে। একটি ড্রামে প্রায় সাত থেকে ১০টি চামড়া সংরক্ষণ করা সম্ভব। এতে করে পাঁচ থকে সাত বছর চামড়া সংরক্ষণ করা যাবে।
তিনি আরো বলেন, এভাবে সংরক্ষণের পরে চামড়া সুবিধা মত সময়ে বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রি করা যাবে। এছাড়া বর্তমানে চামড়ার যে অবস্থা তাতে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনাবেচা করা সম্ভব হবে। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমাতে বাধ্য করেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ