ক্রমশ খাদের কিনারে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক

আপডেট: এপ্রিল ৯, ২০১৮, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


গত সাত বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা। ঋণের নামে লুটপাটের কারণেই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বড় অংকের মূলধন ঘাটতিতে পড়তে হয়েছে এসব ব্যাংককে। ঘাটতি পূরণে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নতুন করে ১২ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে। নিজেরা মূলধন ঘাটতিতে থাকলেও তাদেরই আবার মূলধন জোগান দিতে হচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত বেসরকারি ব্যাংককে। সরকারি আমানতের বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এখন তহবিল প্রত্যাহারও শুরু হবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে, যা তাদের আরো প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত ফারমার্স ব্যাংকে মূলধন জোগান দেয়ার বিষয়টি এরই মধ্যে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সোনালী, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। আজ জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও ফারমার্স ব্যাংকে মূলধন জোগানের বিষয়টি অনুমোদনের কথা রয়েছে।
এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিতে দুর্বল হয়ে পড়া অন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলো আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে যদি ফারমার্স ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তাহলে এটি সিদ্ধান্ত হিসেবে খারাপ নয়। তবে এর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রতি একটি ভুল বার্তা যাবে। সংকটে থাকা অন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোও এ সুযোগ নিয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। তারা ভাবতে পারে, সংকটে পড়লে সরকার এগিয়ে এসে বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করবে। এটি যেন না হয়, এজন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতির নজিরবিহীন ঘটনা হয়ে আছে সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক কেলেঙ্কারি। ঋণের নামে সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে হলমার্ক গ্রুপ। হরিলুট হয়েছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন একসময়ের আদর্শ ব্যাংক হিসেবে পরিচিত বেসিক ব্যাংকেও। একইভাবে লুটপাটের শিকার হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও। ফলে গত সাত বছরেই এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৬ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। ২০১০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) খেলাপি ঋণ ছিল ১১ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। ২০১৭ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৩২২ কোটি টাকায়। এর বাইরে অবলোপন করা হয়েছে এ ব্যাংকগুলো প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ।
বেপরোয়া লুটপাটের শিকার ব্যাংকগুলো ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণেও ব্যর্থ হচ্ছে। মূলধন ঘাটতি পূরণে বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় অর্থ ঢালছে সরকার। গত ১০ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে মূলধন জোগান দেয়া হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর পরও সরকারের কাছে আরো ২০ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত আট ব্যাংক। এর মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংক। সোনালী ব্যাংক একাই চেয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। জনতা ও বেসিক ব্যাংক চায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করে। এক্ষেত্রে রূপালী ব্যাংকের প্রত্যাশা ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল শেষে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকই ৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। রূপালী ব্যাংক ৬৩৭ কোটি ও জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬১ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ৬০০ কোটি টাকার বন্ড ছেড়ে বিদায়ী বছরে মূলধন ঘাটতি পূরণ করেছে। এছাড়া বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি রয়েছে ২ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা।
বড় কেলেঙ্কারির ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক। ঋণ বিতরণে সতর্কতার কারণে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে ব্যাংকগুলোর হাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকার আমানতের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত আটটি ব্যাংকের কাছেই আমানত রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ করার মতো নগদ টাকা ছিল ৮৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। এর সিংহভাগই ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের হাতে।
কিন্তু সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার নতুন নিয়মে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও তারল্য সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ব্যাংকিং খাত ঘিরে যে বলয় গড়ে উঠেছে, তাদের প্রভাবে এ তহবিল যাবে দুর্বল ব্যাংকগুলোয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি পুরোপুরি ব্যাংকিং খাতেই যা নতুন সংকট তৈরি করবে।
তবে বাধ্য না করলে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিয়ে বেসরকারি ব্যাংকে রাখার ঝুঁকি নেবে না বলে মনে করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত। তিনি বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি ভালো নয়। সরকারি কোনো প্রকল্পের টাকা বেসরকারি ব্যাংকে রেখে আটকে গেলে নির্বাচনী বছরে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
তহবিল প্রত্যাহারের শঙ্কা ও নিজেরাই মূলধন ঘাটতিতে থাকলেও বিপর্যস্ত ফারমার্স ব্যাংকে মূলধন জোগানের চাপে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। গত বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংক ও আইসিবির জন্য টাকার অংক নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেয়। পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক বৈঠকে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংককে ১৬৫ কোটি টাকা করে দেয়ার জন্য বলেছে। এর বাইরে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) দিতে বলা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ফারমার্স ব্যাংকে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংকে মূলধন জোগানের জন্য রাষ্ট্রীয় এ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পর্ষদ সভায় বিষয়টি উত্থাপন করতে বলে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিষয়টি জানিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ও আইসিবিকে চিঠি ইস্যু করা হয়। তার ভিত্তিতে এরই মধ্যে সোনালী, অগ্রণী, রূপালী ও আইসিবি পর্ষদ সভা ফারমার্স ব্যাংকে মূলধন জোগান দেয়ার বিষয়টি এরই মধ্যে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে।
মালিকানার শর্তেই ফারমার্স ব্যাংকে ১৬৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের পর্ষদে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল মাসুদ বলেন, আমাদের পরিচালনা পর্ষদ মূলধন দেয়ার বিষয়টি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। বিষয়টি জানিয়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছি। এখন ফারমার্স ব্যাংক থেকে চিঠি পেলে, চিঠির শর্তগুলো পর্ষদে পর্যালোচনা করে টাকা ছাড়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। এক্ষেত্রে ফারমার্স ব্যাংকের দেয়া শর্তগুলো অবশ্যই আমাদের মনঃপূত হতে হবে। জোগান দেয়া মূলধনের অনুপাতে আমরা ফারমার্স ব্যাংকের পর্ষদে পরিচালক দিতে চাই।
ফারমার্স ব্যাংকে মূলধন জোগান দেয়ার বিষয়টি আজ জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে অনুমোদন পাবে বলে জানা গেছে। সরকারের নির্দেশ হওয়ায় টাকা দেয়া ছাড়া ব্যাংকের কিছু করার নেই বলে জানান ব্যাংকটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।
এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রত্যাশিত মূলধন পেয়ে যাবে বলে আশাবাদী ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সারাফাত। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ৬৬০ কোটি এবং আইসিবি ৫৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেবে। বর্তমানে ফারমার্স ব্যাংকের মূলধন রয়েছে ৪০১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। এর বাইরে ৫০০ কোটি টাকা করে দুটি বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে আরো ১ হাজার কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করা হবে। পুরো টাকা হাতে এলে ফারমার্স ব্যাংক দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা