ক্রসফায়ার

আপডেট: জুলাই ১১, ২০১৯, ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


অনিয়ম, দুর্নীতি, অপশাসন অন্যান্য অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও বিরাজিত আইন-শৃংখলা রক্ষার কাজে যারা জড়িত তারা যতই সোচ্চার হোক না কেন দেশে আইনের শাসন অনেকটাই শিথিল। যে কারণে অনেকে অপরাধ না করেও শাস্তি পান। আবার চিহ্নিত অপরাধীও অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়, নতুন নতুন সন্ত্রাস বা অপরাধের সূচনা করে। কোনো কোনো মামলা ২০/২২ বছর পর্যন্ত ঝুলে থেকে অবশেষে বিচারের মুখ দেখে। বিচার কতটা ন্যায়সঙ্গত হলো সে প্রশ্ন নয়- প্রশ্ন হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া কতটা দীর্ঘসূত্রি হলো। যখন কোনো কেস ২০/২২ বছর পর্যন্ত চলতে থাকে অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় বাদি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে- ফলে কেস একপেশে হয়ে যায়। বিপরীত দিক থেকে অনেক সময় এমনও হতে পারে বাদি কিংবা বিবাদি পক্ষের কেউ মারা যেতে পারে। সেক্ষেত্রেও কেসের সেই গুরুত্ব থাকে না। বিচার প্রক্রিয়ার এ দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের দেশে একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ার যে ফল সেটি কারো জন্য সুখকর নয়। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার ফলে কেসের স্তুপ জমা হয় এবং এ জট নিরসন করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। তড়িঘড়ি করে বিচার কাজ শেষ করলে ‘উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে’ চেপে বসতে পারে। সেটি কারো কাম্য নয়। এতে করে প্রকৃত অপরাধী আইনের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে এবং নিরপরাধী শাস্তি ভোগ করতে পারে। অথবা অপরাধীর ‘লঘু পাপে গুরু দ-ও হতে পারে। ক্ষেত্র বিশেষে আমরা লক্ষ্য করেছি মূল আসামী হঠাৎ করে ক্রসফায়ারে বা বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। দু’দিন আগেও যে অপরাধী এক বা একাধিক মামলা ঘাড়ে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে প্রকাশ্যে, যাকে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করেনি বা করতে পারে নি তার ঘটানো সাম্প্রতিক কোনো দুর্ঘটনা যখন জনমনে ব্যাপক সাড়া দেয় বা গণমানুষের রোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন তাকে ক্রশফায়ারে মারা গেছে বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগে যে, সন্ত্রাসী বা অপরাধী আইন শংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না। ঘটনাচক্রে তাদের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় কোনো পতিত এলাকা, বনজঙ্গল কিংবা কোনো পরিত্যক্ত বা পোড়ো বাড়িতে। এটা অবিশ^াস্য।
সম্প্রতি রিফাত হতাকা-ের সাথে জড়িত নয়ন এবং তার সহযোগীদের বিচারের আওতায় আসার জন্য যে জনরোষ তৈরি হয়েছিল তা সময়ের দাবি। এ হতাকা-ের মূল হোতা নয়ন একাধিক মামলার আসামী হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্য দিবালোকে ঘুরে বেড়িয়েছে। এতগুলো মামলার আসামী হয়েও নয়ন ও তার বাহিনী আবারো মানুষ খুনের মতো জঘন্য অপরাধ করার সাহস পায় কোথা থেকে? আবার এটাও আমরা প্রত্যক্ষ করলাম নয়নের মৃতদেহ পাওয়া গেল এক জঙ্গলের কাছে। অতীতেও আমরা এমন অনেক ঘটনা অবগত হয়েছি। যেখানে একই চিত্র ফুটে উঠেছে। অনেকের মতেই এ ঘটনাগুলো বিচারহীনতার নামান্তর। যদি তাই হয় তবে এটা বন্ধ হওয়া উচিৎ।
অতীতের অন্য সব ঘটনা বাদ দিয়েও যদি শুধুমাত্র নয়ন ও তার সহযোগিদের অপকর্মের বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে একটা সত্য দিবালোকের মত পরিষ্কার যে. নিশ্চয়ই এসব সন্ত্রাসীদের গডফাদার রয়েছে। তাদের বাঁচান্রো জন্য এ ধরনের গুপ্ত হত্যাকে ক্রসফায়ার বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। ‘কেঁচো খুঁড়ে সাপ’ বেরিয়ে আসার ভয়ে লোক চক্ষে যে অপরাধী তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে হয়। এ ধরনের ঘটনা অপরাধকে আরো প্রশ্রয় দেয়। গডফাদাররাই এক নয়নকে সরিয়ে প্রয়োজনে আর এক নয়নকে তৈরি করবে। এটাই বাস্তবতা, ফলে সমাজ থেকে অপরাধ বিলুপ্ত না হয়ে অপরাধ খুঁটি গেড়ে বসে। সমাজ নষ্ট হয়।
গড ফাদাররা অপরাধের সাথে জড়িতদের নিজেদের প্রয়োজনে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়। ক্রশফায়ারের মতো ঘটনায় যখন একজনের মৃত্য হয় তখন নতুন একজনকে তৈরি করে এবং অন্যদের জিম্মি করে রাখে। সামনে জ¦লন্ত উদাহরণ থাকে। কোনো রকম বিরোধিতা করলে কিংবা দল ছেড়ে দিতে চাইলে তার পরিণতিও আগের জনের মত হবে বলে শাসানো হয়। ফলে অনেকেই আর ওই চক্রের বাইরে যেতে সাহস করে না। প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকে এসব চক্রের সাথে। তারা হতে পারে রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিংবা ধন-সম্পদ বা আধিপত্যের প্রভাবশালী। সাধারণতঃ তারাই এদের টার্গেট হয় যারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল।
ক্রসফায়ারে মৃত্যু মানবাধিকার লংঘনের অন্যতম প্রধান অপরাধ। আইন্ শৃংখলার দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এটিকে অপরাধ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। তাদের মতে এসব অপরাধীকে আটক করে যদি জেলে রাখা হয় তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই এরা আইনের মারপ্যাঁচে জামিন পেয়ে যেতে পারে। আর জামিন পেলে এরা আবার সন্ত্রাস জড়িয়ে পড়ে বড় ধরনের সন্ত্রাসের জন্ম দিতে পারে, আগের চেয়ে আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। নতুন নতুন সন্ত্রাসীকে উৎসাহিত করতে পারে। সে ধরনের কাজ যাতে আর করে উঠতে না পারে সে জন্য তাদের ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়। তাদের যুক্তি যাই হোক না কেন ক্রস ফায়ার বে-আইনি। বিনা বিচারে কাউকে হত্যা করা কখনও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে না। সন্ত্রাসকে নির্মূল না করে বরং সন্ত্রাস লালন-পালনে উৎসাহিত করে ক্রসফায়ার। কারণ ক্রসফায়ারে নয়ন মারা যায়। কিন্তু পার পেয়ে যায় অনেক সহযোগী আর সন্ত্রাসের জন্ম দেওয়া লালন-পালনকারীরা। নয়ন বেঁচে থাকলে হয়তো বেরিয়ে আসতো ধরা পড়তো তার জন্মদাতা আশ্রয়দাতা এমনকি লালন-পালনকারীরা। তাদের আড়ালে রাখার জন্যই তৈরি করা হয় ক্রসফায়ার নামক নাটকের। একটু সচেতন ও সতর্ক হলেও এ নাটকের কুশীলবদের লোক সম্মুখে আনা যায়। কিন্তু প্রহসনের বিচার ব্যবস্থা মানুষকে ধোঁয়াশার ভেতরে রেখেই সব কিছু পরিচালনা করে। মানবতার স্বার্থে এ বিচারহীনতার রাজনীতি বন্ধ হওয়া উচিৎ। সন্ত্রাসী যেই হোক তার গভীরে গিয়ে প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করা উচিৎ, অপরাধের হোতা, তাদের লালন-পালনকারী আশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করা উচিৎ। তা না হলে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে নয়নরাই ক্রসফায়ারে যাবে। সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল হবে না। এক নয়ন মারা যাবে আর এক নয়ন তৈরি হবে। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন কোনো মানুষই এটা চায় না।