ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার এখনো ১ শতাংশের নিচে

আপডেট: অক্টোবর ২৯, ২০১৮, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


স্থানীয় মুদ্রায় বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের প্রচলন দুই দশক আগে। এ দুই দশকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কলেবর বেড়েছে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। উচ্চ ব্যবসায়িক সম্ভাবনায় এখন ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করছে প্রায় সব ব্যাংকই ও অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। গ্রাহক আকর্ষণে পরিচালনা করা হচ্ছে নানা ক্যাম্পেইন। বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে ব্যবহারকারীদের। তার পরও ক্রেডিট কার্ডের পেনিট্রেশন প্রায় একই জায়গায় থেমে আছে। দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখনো ১ শতাংশের নিচে। শুধু উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী হিসাব করলেও এ হার ২ শতাংশের বেশি নয়।
বর্তমানে কারো মাসিক আয় ২০-৩০ হাজার টাকা হলেই ব্যাংকগুলো তাকে ক্রেডিট কার্ড দিচ্ছে। ব্যাংকভেদে ন্যূনতম আয়ের অত্যাবশ্যক অংকটি বড়জোর ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এজন্য ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার জন্য ব্যক্তির একটি করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকতে হয়। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি না হলে কিংবা অনিয়মিত আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড না থাকলে ব্যাংকের কার্ড বিভাগ থেকে একটি ক্রেডিট কার্ড পেতে তার কোনো সমস্যা হয় না।
এমন বাস্তবতায় দেশের মধ্যবিত্তদের বড় অংশই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের যোগ্য। তার পরও ক্রেডিট কার্ডের প্রতি মানুষ কেন আগ্রহী হচ্ছে না, তা জানতে কথা বলা হয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবহারকারীদের সঙ্গে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন এখনো নগদ লেনদেনের চর্চা থেকে মানুষের বেরোতে না পারার কথা। ঋণখেলাপি হওয়ার একটা ভয়ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে কাজ করে। পাশাপাশি কার্ড পেতে বিভিন্ন ধরনের নথিপত্রের বাধ্যবাধকতা ও উচ্চ সুদহারকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।
সব মিলিয়ে দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী এখন ১০ লাখের কিছু বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত মোট ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ১০ লাখ ২৩ হাজার ৭২০। অনেক ব্যবহারকারী আবার একাধিক প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। এটা বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছয়-সাত লাখের বেশি হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এর কারণ জানতে চাইলে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত নগদ লেনদেনে অভ্যস্ত। আবার সচ্ছলদের বড় অংশই ঋণ নিতে আগ্রহী নয়। ক্রেডিট কার্ড নিলেই ঋণখেলাপি হয়ে যাবে, এমন একটা ধারণা মানুষের মধ্যে রয়েছে। প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যয়ের কারণে ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ভোক্তাঋণের মতো নামিয়ে আনতে না পারাও জনপ্রিয়তা না পাওয়ার কারণ। তাছাড়া ক্রেডিট কার্ড নিতে টিআইএন বাধ্যতামূলক থাকায় কেউ কেউ ইচ্ছা থাকলেও তা নিচ্ছেন না।
কার্ড ব্যবহারকারী, সেবাদাতা ও সুযোগ থাকার পরও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন না এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলে ২০১৫ সালে একটি গবেষণা করেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন গবেষক। ফলাফলে দেখা যায়, সহজ লেনদেন ও বহনযোগ্য, ঝামেলাহীন ঋণপ্রাপ্তি ও মর্টগেজ-সংক্রান্ত জটিলতা থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বব্যাপী ক্রেডিট কার্ডের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশেও গত ১০ বছরে এক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। তবে দেশে ক্রেডিট কার্ডে উচ্চসুদ ও ব্যবহারকারীদের সচেতনতার অভাবে প্রত্যাশিত হারে বিকশিত হয়নি এটি। গত কয়েক বছরে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও দেশের মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ তা ব্যবহার করছে।
গবেষণাটির তথ্য অনুসারে, মোট ক্রেডিট কার্ডধারীদের ৫৮ শতাংশ একটি করে কার্ড ব্যবহার করেন। ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ কার্ডধারী দুটি ও ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ কার্ডধারী ব্যবহার করেন তিনটি করে ক্রেডিট কার্ড। পাঁচটি করে কার্ড ব্যবহার করছেন ৭ দশমিক ১ শতাংশ কার্ডধারী। অন্যদিকে সাতটি বা তার চেয়ে বেশিসংখ্যক কার্ড ব্যবহার করছেন ১ শতাংশের বেশি।
ভাতাসহ মাসিক ৮০ হাজার টাকার বেশি বেতনে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে গবেষণা পরিচালক পদে চাকরি করছেন মো. আহসান হাবিব। পুরান ঢাকায় নিজেদের দুটি বাড়ি রয়েছে। বিত্তশালী হলেও সনাতন পদ্ধতির ব্যাংক লেনদেনের বাইরে একটি মাত্র ডেবিট কার্ড ব্যবহার করছেন তিনি। বছর শেষে ব্যাংক তার কাছ থেকে অনেক টাকা কেটে নিতে পারেÍ এমন আশঙ্কায় এখনো ক্রেডিট কার্ডে আগ্রহী নন তিনি। তার যুক্তি, জরুরি প্রয়োজনে লেনদেনের জন্য ভিসা ডেবিট কার্ডটিই যথেষ্ট। তবে যদি কোনো ব্যাংক জটিলতা কমিয়ে, নানা ধরনের ফি বাদ দিয়ে কার্ড দেয়, তাহলে তিনি আগ্রহী হতেও পারে।
ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার এখনো সীমিত থাকার কারণ হিসেবে উচ্চ সুদহারকেও দায়ী করছেন অনেকে। দেশের ক্রেডিট কার্ড ইন্ডাস্ট্রিতে বার্ষিক সুদহার ১৮-২৭ শতাংশ বলে জানা গেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যবসার ভলিউমে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ইস্যুয়াররা গড়ে ২৫ শতাংশের মতো সুদ চার্জ করছেন।
১৯৯৮ সালে স্থানীয় মুদ্রায় ক্রেডিট কার্ড চালু করে লংকাবাংলা ফিন্যান্স লিমিটেড। ক্রেডিট কার্ড ব্যবসায় শীর্ষ দশে অবস্থান করা আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির হেড অব রিটেইল ফিন্যান্স খোরশেদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর বাইরে খুবই কম। আমরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের যোগ্য গ্রাহকদের হাতে ক্রেডিট কার্ড তুলে দেয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু তারা নিজ শহরে কার্ডটি ব্যবহারের সুযোগ খুব বেশি পাচ্ছেন না। তাছাড়া খুচরা বিক্রেতাদের একটি বড় অংশ এখনো নগদে লেনদেন করে কার্ডে লেনদেন প্রসেসিংয়ের ২ শতাংশ ফি এড়াতে চান। তারা বুঝতে চান না, ভোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক হলে এ ফি তাদের ব্যবসায় খুব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না।
কয়েক বছর ধরে ঢাকা অফিস থেকেই কার্ড নেটওয়ার্ক ব্যবসা পরিচালনা করছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড মাস্টার কার্ড। ব্যবহারকারীদের কিছু বাড়তি সুবিধা দিতে দেশের অনেক খুচরা বিক্রেতার সঙ্গে সমঝোতা করছে তারা। এর সুবাদে ইস্যুয়ার ও ব্যবহারকারীর কাছে মাস্টার কার্ডের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। তবে সম্ভাবনার বিপরীতে ক্রেডিট কার্ড ও কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুবই কম বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।
কারণ জানতে চাইলে মাস্টার কার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, শহরের শিক্ষিত মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা ক্রেডিট কার্ডের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। মধ্যবিত্ত মানুষজন ইএমআই সুবিধা, বিভিন্ন ক্যাম্পেইন চলাকালে কার্ডে কেনাকাটায় ডিসকাউন্ট পাওয়াÍ এগুলো উপভোগ করছেন। তবে আমাদের সমাজে এ শ্রেণীটি যত বড়, কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা তত বেশি হয়নি। এর কারণ হিসেবে অনেক বিষয় উঠে আসে। আমি চারটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, প্রথমত, টিআইএনের আবশ্যকতা। ক্রেডিট কার্ড নিতে গিয়ে কর কর্তৃপক্ষের নথিপত্রে অন্তর্ভুক্ত হতে নারাজ অনেক সচ্ছল মানুষও। আমরা নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ করেছি, যাতে একটি নির্দিষ্ট সিলিংয়ের নিচে লিমিট থাকলে ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর সময় টিআইএনের বাধ্যবাধকতাটি তুলে দেয়া হয়। তিনি বলেন, ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার লিমিটও অনেক গ্রাহককে নিরুৎসাহিত করছে। দেশে আনসিকিউরড লোনের সিলিং ২০ লাখ টাকা। সেখানে সচ্ছল মানুষজনের জন্য সীমাটি বাড়ানো হলে ক্রেডিট কার্ড তাদের কাছে আরো জনপ্রিয় হবে। ট্রাভেলার্স কোটাও উচ্চবিত্ত মানুষজনের কাছে ক্রেডিট কার্ডের আবেদন কমাচ্ছে। বাংলাদেশের নাগরিকরা সার্ক দেশগুলোয় খরচের জন্য বছরে ৫ হাজার ডলার আর সার্ক-বহির্ভূত দেশগুলোয় ৭ হাজার ডলার এনডোর্স করতে পারেন। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে তারা ১ হাজার ডলার করে ব্যয় করতে পারেন। উচ্চ আয়ের বাংলাদেশীদের অনেককেই বাস্তবে বিদেশ ভ্রমণে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি খরচ করতে হয়। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এটি অনেক শিথিল করা যেতে পারে, অন্তত যাদের প্রয়োজন তাদের জন্য।