ক্ষণিকের অতিথি

আপডেট: অক্টোবর ৫, ২০১৯, ১:০৯ পূর্বাহ্ণ

রুমি শাইলা শারমিন


সারাটি দিন ধরে ক্ষণে ক্ষণে গভীর প্রার্থনা জানাই সৃষ্টিকর্তার কাছে। যে এসেছিল আমার ক্ষণিকের অতিথি হয়ে সে আজ যেখানেই থাকুক না কেন যেন ভাল থাকে, সুখ নিয়ে বেঁচে থাকে । সৃষ্টিকর্তা তাকে যেন হেফাজতে রাখেন। মনের অজান্তে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। তবে কি তাকে আমি ভালবেসে ফেলেছিলাম! আমার অতিথি হয়ে সে এসেছিল দিন পনের আগে। বয়স বড় জোর দশ এগারো হবে। পরনে তেলচিটা ময়লা জামা। ছোট ছোট ঝাপড়া চুল, জট বেঁধে আছে। কতদিন যে চুলে চিরুনী পড়েনি! ভিতু ভিতু চোখ, শ্যমলা পাতলা গড়ন। নাম জিজ্ঞেস করতেই কর্কশ কণ্ঠে বড় বড় চোখ মেলে দ্রুত কি যে বলল ঠিক বোঝা গেলনা। দ্বিতীয় বার আর জানতে চাইলামনা। কেননা, চেহারায় কেমন যেন একটা ভয়ঙ্কর ভাব আছে। সে এসেছে আমার বাসায় কাজের সহযোগী হয়ে থাকতে। এই ধরনের একজনকে আমাদের সাথে কিভাবে রাখব ভাবতেই পারছিনা। একরকম পাত্তা না দিয়েই নিজের কাজে মন দিলাম। ততক্ষনে দেখি আমার ছোট্ট খোকন গভির মনোযোগে তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। সেও চোখে চোখে কি যেন করল ওমনি আমার খোকন খিলখিল করে হেসে উঠল। মাত্র চার বছর বয়েসী আমার খোকন। খোকনের সাথে মেয়েটির ভাব জমতে এক ঘণ্টাও লাগলনা। ব্যপারটা ভাল মন্দ বোঝার আগেই অবচেতন মনে কোথাও সমর্থন পেলাম। আর সেখানে বার বার ধ্বনিত হচ্ছিল, ‘বেশতো খোকনের একটা সময় কাটানোর সঙ্গী হলো। একটা শিশুর মনে আর একটি শিশুর মন মিশে গেলে ক্ষতি কি?’

দু’দিন পেরুলো। যতটুকু সম্ভব মেয়েটিকে পরিপাটি করেছি। আমার কর্তা ও আমি চারটে ফ্রক, স্যান্ডেল, চিরুনী সহ প্রয়োজনীয় জিনিষগুলো কিনে দিলাম। সে এসব পেয়ে খুশিতে আত্মহারা। ভাবভাষা এখনো পরিষ্কার নয়। আঞ্চলিকতার টান রয়েছে। আধো বোঝা যায় , আধো বুঝে নিতে হয়। লক্ষ্য করলাম তার পরিবর্তন গুলো। নতুন কিছু শেখার প্রতি প্রবল আগ্রহ, কাজের প্রতিও বেশ মনোযোগী। বিশেষ করে রান্নার ব্যপারে। সুযোগ পেলেই খেলাধুলা করে আমার খোকনের সাথে। খোকনের রং পেন্সীল নিয়ে আকঁতেও বসে। তাকেও একটা খাতা আর রঙ কিনে দিলাম। এবারে খোকনের সাথে জোরতালে প্রতিযোগিতামূলক ছবি আঁকা শুরু হল তার। একটা বর্ণমালাও কিনে দিয়েছিলাম। সেটা হাতে নিয়েছিল বটে তবে সেটা দ্বিতীয় বার ও হাতে উঠেনি। পড়ে রইল এককোনে। লেখাপড়ার প্রতি কোন আগ্রহ ছিলনা। খুব তাড়াতাড়ি সে শিখে ফেলল সকালের নাস্তা তৈরি করা। সাতদিন পরেই ঘোষনা দিল সে নিজেই সকালের নাস্তা বানাবে। ভয় পেলাম। বললাম, ‘ছোট মানুষ হাত পুড়িয়ে ফেলবিতো!’ সে কিছুতেই মানবেনা। পরদিন সত্যি সত্যি নিভুর্লভাবে চমৎকার করে নাস্তা বানালো। তার চোখে মুখে সেই ভয়ঙ্কর ভাবটাও কেটে গেছে। বরং মুখখানি দেখলেই মায়া হয়। সবসময় হাসি খুশি প্রাণচঞ্চল ভাব। আমার ঘরটা যেন ভরে আছে আনন্দে। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ দেখি সে অন্যমনস্ক। একা কি যেন বিরবির করছে। আদর কোরে কাছে ডাকলাম। তাকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তার পরিবার সম্পর্কে। সে বলতে পারলনা। তার এক সৎ দাদু নাকি বছর দশেক আগে তাকে ডাষ্টবিনের পাশ থেকে উদ্ধার করেছে যা সে তার দাদুর মুখে শুনেছে। বয়সের ভারে তিনি এখন এতই কাবু যে আগের মত মেয়েটিকে দেখাশুনা করতে পারেন না। সেই দাদুর ঘরে ছেলে ও ছেলের-বৌ’রা তাকে রাত দিন গোয়ালঘরের কাজ, বাড়ির সকলের কাপড় ধোয়া, থালাবাসন পরিস্কার করা সহ অমানুষিক পরিশ্রম করায়। কাজ শেষে কোনদিন একবেলা খেতে দেয়, কোনদিন সেটুকুও জোটেনা। একবার নাকি ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। তাকে খুঁজে নিয়ে তারা হাত পা বেঁধে মারধোর করে এবং বাঁধা অবস্থায় পুকুরে ফেলে দেয়। পরে প্রতিবেশীরা তাকে অজ্ঞান অবস্থায় পানি থেকে উদ্ধার করে -এ পযন্ত শুনে আমার হৃদয় কেঁপে উঠল। আর শুনতে চাইলাম না। অনুভব করলাম রাজধানীর বুকে আমার পাশের ফ্ল্যাটের ওরই বয়সী শিশুরা কত আদরে আহ্লাদে বড় হচ্ছে। একটু আশ্চর্য হলাম, এরকম একটা হৃদয়বিদারক ঘটনা যখন সে বলছে তখন তার চোখে মুখে কোন কান্নার ছাপ নেই, কণ্ঠ একুটও কেঁপে উঠলনা। ভাবলেশহীন মুখখানা। তবে কি দুঃখ কষ্টে সে পাথর হয়ে গেছে? মেনে নিয়েছে রুঢ় বান্তবতাকে ?

দিন গড়িয়ে গেল। বেশীর ভাগ সময় সে খোকনের সাথে কাটায়। আমার কর্তা ও আমি তাকে নিজ সন্তানস্নেহে আগলে রাখি। তার ভাব ভাষাও অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে। এরই মাঝে খোকন অসুস্থ হলো। ডাক্তারের কাছে গেলাম। মেয়েটিকে একা ফেলে যেতে মায়া হল তাই তাকেও সঙ্গে নিলাম। ইস্কাটনের রোড ধরে আমরা চলেছি। সারাটা সময় সে রাস্তার দিকেই তাকিয়ে রইল, দেখতে দেখতে সপ্তাহ দুই পেরুলো। খোকনকে নিয়ে স্কুল থেকে বাসায় ফিরছি। প্রচন্ড মাথায় যন্ত্রণা শুরু হলো। বাসায় পৌঁছে কোন রকমে খাওয়া দাওয়ার পাঠ শেষ করে খোকনকে পাশে নিলাম বিশ্রামের জন্য। মেয়েটিকেও বিশ্রাম নিতে বললাম। ভালো করে বুঝিয়ে বললাম দরজায় কেউ নক্ করলে যেন সে আগে ভাগে না খুলে দেয়। সে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। আজ তাকে একটু গম্ভির মনে হচ্ছে। বাড়ি যেতে মন চায় কিনা জিজ্ঞেস করতেই সে শিউরে উঠল। আমারও মনে পড়ে গেল বাড়িতে তার নির্যাতনের দিন গুলো কথা। তাকে আশস্ত করার জন্য এবারে বললাম, ‘একদিন খোকন আর তোকে শিশুর্পাক, চিড়িয়াখানা, যাদুঘর দেখতে নিয়ে যাব।’ মাথার যন্ত্রণা নিয়ে একসময় ঘুমিয়ে গেলাম। ঘ›ণ্টা দুই ঘুমিয়েছি। মাথায় হাল্কা বোধ করছি। হঠাৎ দেখি মেইন দরজা হাট করে খোলা। দৌড়ে দেখি এ ঘর ও ঘর, কোথায় মেয়েটি নেই। আমার চোখ ফেটে পানি আসছে। আতংকিত হলাম। ফোন করতে গিয়ে দেখি মোবাইল নেই। ইচ্ছে হলনা খুঁজে দেখি সে আর কি কি নিয়ে পালিয়েছে। তখন শুধু আমার মাথায় একটিই চিন্তা- সে তো কারো সন্তান। কোথায় গেল? কোথায় পাবো তাকে? পাশের বাসা থেকে কর্তাকে ফোন কোরে সব জানালাম। তিনি আমার মোবাইল নম্বরে ফোন করলে এক সহৃদয় ব্যক্তি রিসিভ করলেন এবং জানালেন মেয়েটি ও মোবাইলটি তার কাছেই রয়েছে। অবশেষে আমার বাসায় মেয়েটিকে পৌঁছে দিলেন। তিনি শুধু মৌখিক ধন্যবাদটুকু গ্রহণ করলেন। উদারমনা সেই অপরিচিত ভদ্রলোকটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় আজও আমার মন ভরে উঠে। মেয়েটি ফিরেই আমাকে জরিয়ে ধরল। আমি অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ কিরে কেন চলে গিয়েছিলি? ’ সে আরো জোরে জাপটিয়ে ধরে বলল, ‘আর কখনো কোথাও যাবোনা।’ কিছু সময় পরে কর্তা ও আমি তাকে কাছে নিয়ে ভালোভাবে জানতে চাইলাম আমার বাসায় তার কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা, কেনইবা ওভাবে পালাতে চাইছিল। সে উৎফুল্ল হয়ে বলতে শুরু করল ডাক্তারের কাছে যেদিন আমরা গিয়েছিলাম, আমাদের সাথে গাড়িতে বসে সে সমস্ত রাস্তা মুখস্ত করেছে। এবং সেই পথ ধরেই সে দোকানটিতে মোবাইল বিক্রি করতে গিয়েছিল। ঐ টাকা দিয়ে সে নানাদেশ ঘুরে বেড়াতে চেয়েছিল। মেয়েটির আর একটি কথাও আমাদের একবিন্দু বিশ্বাস করতে মন চাইছিলনা। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে যেখান থেকে আনা হয়েছে সেখানে ফেরত পাঠানো হবে। মেয়েটিকে বলা হলো ক’দিন তুই ঘুরে বেরিয়ে আয় আবার তোকে আনা হবে। সে বলল, ‘আমি বেশিদিন থাকবনা। আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে আসবেন।’ সে যাবার সময় একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল আমার। আমার মমতা, বিশ্বাস, স্বপ্ন সব যেন নিমেষে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। দেখি দুই সিঁড়ি নামার পর আবার সে ছুটে উপরে চলে এলো। আকষ্মিক সে আমাকে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি চোখে তাকালো। অস্কুটে বললাম, ‘ভাল থাকিস।’
সে চলে গেছে। বাড়িটা ফাঁকা। আমার খোকন সারাক্ষণ মনমরা। মাঝে মাঝেই জানতে চাইছে তার খেলার সঙ্গী কি করেছে, কেন তাকে রেখে আসা হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এ প্রশ্ন শুধু খোকনের নয়, এ প্রশ্ন আমারও। সত্যিই কি সে অপরাধী ছিল? নাকি শিশু বয়সের বৈচিত্র পিয়াসী কৌতূহলী মন এর জন্য দায়ী, নাকি তার অজানা জন্ম, অবাঞ্চিত বেড়ে ওঠা দায়ী, অথবা পোড় খাওয়া জীবনটা তাকে শিখিয়েছে পালিয়ে বেড়ানো। তাই হয়ত আর কোন সুশৃংখল জীবনে বাঁধ মানতে চায়না। সব কিছু ছাপিয়ে মনে হলো সে তো শিশু। শিশুর আবার কিসের অপরাধ? কিন্ত বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ভাবতে গেলেই মনে হয় চুরি করে বাড়ি থেকে পালানো অমন মেয়ে বিদেয় হয়েছে ঢেড় ভালো হয়েছে। তবুও মনের কোনে একটি শঙ্কা রয়েই গেল। আবার সেই সৎ দাদুর ছেলে, ছেলে-বৌ’দের খপ্পরে পড়ে তাকে নির্যাতন সইতে হবে নাতো? আঘাতে আঘাতে হোঁচট খেয়ে কোন একদিন এই কন্যা শিশুটি নিষিদ্ধ জগতের বাসিন্দা হয়ে যাবেনা তো? অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে তো ফুলের মত একটি শিশু! সৃষ্টিকর্তার দান। সে ছিল আমার ক্ষণিকের অতিথি।