খাল-বিলের নৌকাডুবি নিয়েও ভাবতে হবে

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৯, ১:১০ পূর্বাহ্ণ

মোশাররফ হোসেন মুসা


এ বছর ঘটা করে নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ-২০১৯ পালিত হয়েছে। এবার নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল-‘দূষণ ও দখলমুক্ত করি, নৌযাত্রা নিরাপদ করি, বিশ^মানের নৌ ব্যবস্থার স্বপ্নকে সফল করি’ (কালের কণ্ঠ, ৩০শে মার্চ’১৯)। এখন পর্যন্ত নৌ নিরাপত্তা বলতে আমরা নদীপথ ও সমুদ্র পথের নিরাপত্তাই বুঝি। প্রতিবছর পুকুর, খাল-বিল ও হাওড়ে ডুবে কতজন মারা যাচ্ছে, তার প্রতিকার কি ইত্যাদি নিয়ে খুব কম লোকই চিন্তা-ভাবনা করেন। গত ২৭ জুলাই শনিবার রাজশাহী নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ১২-১৩ জন শিক্ষক নাটোরের নলডাঙ্গা হালতি বিলে (চলনবিল) নৌ ভ্রমণে বের হন। এক সময় সামান্য অসর্তকতার কারণে শিক্ষিকা প্রাপ্তি সাহা পানিতে পড়ে যান। তাকে উদ্ধারের জন্য বিজনেস স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক মোখলেছুর রহমান পানিতে ঝাঁপ দেন। মোখলেছুর রহমানের সাঁতার জানা থাকলেও প্রাপ্তি সাহা সাঁতার জানতেন না। সেজন্য তিনি প্রাপ্তি সাহাকে ভাসিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন। তাদের অবস্থা বেগতিক দেখে নৌকার মাঝিও পানিতে ঝাঁপ দেন এবং প্রাপ্তি সাহাকে নৌকার কাছে নিয়ে আসেন। সকলে ধরাধরি করে প্রাপ্তি সাহাকে নৌকার উপর তুলতে সক্ষম হলেও মোখলেছুর রহমানকে তুলতে ব্যর্থ হন। দুই দিন পর প্রায় ১৬ কি.মি. দূরে তার লাশ পাওয়া যায়। গত বছর ৩১ আগস্ট আমরাও পরিবার-পরিজন নিয়ে চলন বিলে নৌকা ভ্রমণে গিয়েছিলাম। আমরা ভাঙ্গুড়া থেকে যাত্রা শুরু করি। সকলের ইচ্ছায় বিল অতিক্রম করে তাড়াশ গিয়ে যাত্রা শেষ করি। কিন্তু কয়েকজনের খামখেয়ালিপনায় আবারও ভাঙ্গুড়ার দিকে যাত্রা শুরু করি। পথিমধ্যে হান্ডিয়াল কাটাখালে ¯্রােতের পাকে পড়ে নৌকাটি মুহুর্তের মধ্যেই তলিয়ে যায়। ফলে আমার স্ত্রী সহ ৫ জনের অকাল মৃত্যু ঘটে। উল্লেখ্য, প্রতি বর্ষা মৌসুমে চলনবিলের বিশাল জলরাশি দেখতে হাজার হাজার পর্যটক চলনবিল এলাকায় আসেন। এ রকম দুর্ঘটনা প্রায় বছরেই ঘটতে দেখা যায়। পর্যটকরা বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে নৌকা ভাড়া করে নৌ ভ্রমণে বের হন। বর্তমানে নৌকাগুলো স্টিলের শিট দ্বারা তৈরি করা হয়- যা কারিগরি প্রযুক্তি সম্মত না হওয়ায় মোটেই নিরাপদ নয়। নৌকাগুলোতে লাইফ জ্যাকেট ও বয়া থাকে না ; এমনকি সামান্য টায়ার-টিউব ও খালি বোতল পর্যন্ত রাখা হয় না। মোখলেছুর রহমান যখন তার সহকর্মীকে নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তখন নৌকার উপরে থাকা অন্যান্য সহকর্মীদের আহাজারি করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। নৌকাতে যদি ভেসে থাকার কোনো সরঞ্জাম থাকতো তাহলে তারা নিশ্চয়ই সেগুলো ছুঁড়ে মারতেন। একই অবস্থা আমাদের বেলাতেও হয়েছিল। ভেসে থাকার কোনো সরঞ্জাম না থাকায় আতঙ্কে সাঁতার জানা মানুষও ডুবে মারা গেছে। এ বিষয়ে নৌকার মাঝিদের সচেতন করার জন্য স্থানীয় সরকার সহ স্থানীয় প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। উপরিউক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করে আমি গত ২ মাস পূর্বে চলনবিল এলাকার সমস্ত ডিসি, এসপি, ইউএনও, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় সাংবাদিকবৃন্দ সহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে আবেদনপত্রের মাধ্যমে অবগত করাই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তারা যদি সামান্য উদ্যোগ নিতেন তাহলে এরকম প্রাণহানীর পুনরাবৃত্তি ঘটতো না। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রিক সংস্কৃতি চালু হওয়ায় সকলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় বসে থাকেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তাঁরা আমার আবেদন পত্রটির আলোকে কোনো পদক্ষেপ নেন নি। প্রতি উপজেলায় প্রতি মাসে উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপরিউক্ত সভা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কমিটির সদস্যরা ইচ্ছা করলে নৌ দুর্ঘটনার বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন। অনেকে মনে করেন, নদীমাতৃক দেশে সাঁতার না জানা একটি অপরাধ। তারা ভুলে যান যে, পূর্বে নদী ও পুকুর ছাড়া গোসলের জন্য অন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সে কারণে শিশুরা পিতার সঙ্গে গোসল করতে গিয়ে সাঁতার শিখতে বাধ্য হতো। বর্তমানে প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে নলকূপ রয়েছে; সেসঙ্গে বিদ্যুৎ চালিত মটর দ্বারা পানি তোলার ব্যবস্থা থাকায় কেউ আর পুকুরে কিংবা নদীতে গোসল করে না। তাছাড়া পুকুরে মৎস্য আবাদ চালু হওয়ায় পুকুরে সার সহ বিভিন্ন প্রকার মাছের খাবার দেওয়া হয়। ফলে পুকুরের পানি আগের মতো স্বচ্ছ নেই। সে কারণে ছেলে-মেয়েরা পুকুরে নেমে গোসল করতে আগ্রহী হয় না। অন্যদিকে মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ছেলে-মেয়েরা সাঁতার শেখার জন্য সুইমিং পুলকে উপযুক্ত স্থান মনে করা শুরু করেছে। প্রায় প্রতি উপজেলা পরিষদ চত্বরে ১টি করে পুকুর রয়েছে। সেসব পুকুরে সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেসব স্কুলের আর্থিক সক্ষমতা বেশি এবং প্রয়োজনীয় জায়গা রয়েছে, সেসব স্কুলে সুইমিং পুল স্থাপন করা জরুরি। পত্রিকা সূত্রে প্রায়ই দেখা যায়, পানিতে ডুবে শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যু। ইউনিসেফের হিসেব অনুযায়ী প্রতি বছর পানিতে ডুবে ১৭ হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটে। সেসঙ্গে রয়েছে পুকুর, খাল-বিল ও হাওড়ে নৌকাডুবির ঘটনা। এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বর্তমানে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরাধীন ‘কিশোর-কিশোরী ক্লাব’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, ওই ক্লাবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সঙ্গীত ও আবৃত্তি চর্চার সুযোগ পাবে। সেলক্ষ্যে জেন্ডার প্রোমোটর, সঙ্গীত শিক্ষক ও আবৃত্তি শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকার ইচ্ছা করলে ওই প্রকল্পে সাঁতার প্রশিক্ষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। সেলক্ষ্যে সাতার প্রশিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
লেখক : গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক।