খেলাধুলায় নেই রাবি শিক্ষার্থীরা অবসর কাটে ইন্টারনেটে

আপডেট: জুলাই ১৭, ২০১৭, ১:০৮ পূর্বাহ্ণ

রফিকুল ইসলাম


অযত্নে আর অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যরয়ৈর বাস্কেটবল ও লন টেনিস গ্রউন্ড। ছবিটি তুলেছেন শরিফুল ইসলাম তোতা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহিন আলম। বিকেল ৫টায় স্মার্টফোন হাতে বসে আছেন আবাসিক হলের ইন্টারনেট রুমে। কী করছেন জিজ্ঞস করলে জানান, ফেসবুকে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি জানান, প্রায় প্রতিদিনই এই সময়ে ইন্টারনেটে কাটান তিনি। খেলার মাঠে যান কিনা জানতে চাইলে বলেন, যাওয়া হয় না। অবসর সময় কাটান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে কখনো কম্পিউটারে নাটক-সিনেমা দেখে। খেলাধুলার প্রতি এখন আগ্রহ হয় না বলে জানান শাহিন। শুধু শাহিন নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর খেলাধুলার প্রতি আগহ নেই। যার প্রমাণ মেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠগুলোতে খোঁজ নিলে। শিক্ষার্থীরা ক্লাশ-পরীক্ষা ও পড়াশোনার বাইরে দিনের একটা বড় সময় কাটান ইন্টারনেটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৪ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক হলগুলোর মাঠসহ ক্যাম্পাসে খেলার মাঠ রয়েছে ১৪টি। অথচ বিকেল বেলায়ও মাঠগুলোতে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা খুব বেশি না। যারা মাঠগুলোতে খেলতে আসেন তাদের অনেকে আবার স্থানীয় তরুণ। খেলা না হওয়ায় ঘাস-আগাছা হয়ে পরিত্যক্ত থাকছে ক্যাম্পাসের কয়েকটি মাঠ। বেশিরভাগ আবাসিক হলের মাঠে খেলা হয় শুধু শীত মৌসুমে। অন্য সময় পরিত্যক্ত থাকে। অন্যদিকে নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করেন না এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিতা বিভাগের মাস্টার্সের একজন শিক্ষার্থীর গবেষণায় উঠে এসেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী ফেসবুক ব্যবহার করেন। এর মধ্যে দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় ফেসবুক ব্যবহার করেন শতকরা ৮৫ ভাগ শিক্ষার্থী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক দশক আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠগুলোতে খেলাধুলায় আগ্রহী সব শিক্ষার্থীর একসঙ্গে খেলার সুযোগ হতো না। খেলাধুলা করার জন্য আগে থেকে লাইন দিতে হতো। বিকেল বেলা সব খেলার মাঠ শিক্ষার্থীদের পদচারণরায় মুখরিত থাকতো। সেই তুলনায় এখন খেলাধুলায় আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুব কম। অনেক খেলার মাঠ অবহেলায় নষ্ট হয়ে গেছে। খেলার মাঠ ছেড়ে শিক্ষার্থীরা অবসর সময় কাটাচ্ছেন ইন্টারনেটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক ডা. তবিবুর রহমান বলেন, ‘সুস্থ থাকার অন্যতম প্রধান সহায়ক শক্তি খেলাধুলা অথবা ব্যায়াম করে শরীর ফিট রাখা। তরুণরা খেলাধুলা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখনকার ছেলেমেয়েরা খুব কম খেলাধুলা করে। ফলে শারীরিকভাবে তারা দুর্বল। তরুণ বয়সেই নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ তারা খেলাধুলা করছে না এবং রাত জাগছে। শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা না করে ইন্টারনেটে সময় কাটাচ্ছে। খেলাধুলা তরুণদের মেধা ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য আবাসিক হলগুলোর সামনে এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে খেলার মাঠ রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা অবসর সময় কাটাচ্ছেন ইন্টারনেট ব্যবহার করে বা তথ্যপ্রযুক্তির অন্য কোনো উপকরণ নিয়ে। অধিকাংশ মাঠে খেলাধুলা করতে দেখা যায় হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে। অযত্ন আর অবহেলার কারণে অনেক খেলার মাঠ পরিত্যক্ত হয়ে যাচ্ছে। যে মাঠগুলো খেলার উপযুক্ত আছে সেগুলোও নির্দিষ্ট খেলার সময় একটু মুখরিত থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সুজন আলী বলেন, ‘স্কুল-কলেজে পড়ার সময় বিকেল হলেই মাঠে যেতাম। বিভিন্ন খেলার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম। এখন পড়াশোনার বাইরে বাকি সময় কাটে অনলাইনে। শুধু আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট খেলার সময় একটু মাঠে যাই। এখন আর আগের মতো বাইরে মাঠে গিয়ে খেলাধুলার সময় পাচ্ছি না বা ইচ্ছাও জাগছে না।’
সরেজমিন দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে টেনিস, বাস্কেটবল, ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা মাঠ থাকলেও শুধু ক্রিকেট আর ফুটবলের সময়ে একটু শিক্ষার্থীদের দেখা যায়। আর যথাযথ যত্নের অভাবে অধিকাংশ বাস্কেটবল ও টেনিস কোর্টে বড় বড় ঘাস জন্ম নিয়েছে। শাহ মখদুম ও আমীর আলী হলের বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের দুপাশের পিলারগুলোও ভেঙে গেছে। টেনিস গ্রাউন্ড চেনার উপায় নেই। খেলা না হওয়ায় ঘাস-আগাছা হয়ে পরিত্যক্ত হয়ে আছে মাদারবক্স হলের সামনের মাঠ ও শাহ মখদুম হলের সামনের মাঠ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীর চর্চা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ২৫ হাজার আসনবিশিষ্ট একটি স্টেডিয়াম, দুইটি জিমনেশিয়াম (১টি পুরুষ, ১টি নারীদের জন্য), একটি সুইমিংপুল, চারটি ফুটবল মাঠ, একটি হকি মাঠ, চারটি লনটেনিস হার্ডকোর্ট, দুইটি বাস্কেটবল হার্ডকোর্ট, একটি স্কোয়াশ কোর্ট আছে। চারটি ফুটবল মাঠের মধ্যে স্টেডিয়াম এবং হবিবুর হল মাঠই শুধুমাত্র নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়। অন্য দুটি (জুবেরি মাঠ ও ইবলিশ মাঠ) শরীরচর্চা শিক্ষা বিভাগের অধিভুক্ত না থাকায় আর যত্ন নেয়া হয় না। ফলে খেলার উপযুক্ততা হারাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আন্তঃবিভাগ খেলার তিন মাস মাঠগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভালো পদচারণা দেখা যায়। বাকি সময়টা পড়ে থাকে ফাঁকা। আর বাস্কেটবল, লন টেনিস, স্কোয়াশ, হকির মাঠগুলোও ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। স্টেডিয়ামও তার জৌলুস হারাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর মিজানুর রহমান বলেন, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন দেখতাম অনেক শিক্ষার্থী খেলাধুলা করতো। ক্যাম্পাসের সব মাঠ ছাড়াও হলের মাঠগুলোতে প্রতিদিন ফুটবল, ভলিবল খেলা হতো। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা অনেক বেড়েছে। সেই তুলানায় এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলাধুলা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় উৎসাহী করার জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। খেলাধুলায় যারা ভালো করবে তাদের জন্য আবাসিক হলে সিট দেয়া, বিভিন্ন উপকরণ দেয়াসহ বিভিন্ন সুবিধা আছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা খেলাধুলায় আগ্রহী কম। শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগ সময় কাটায় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রয়োজনে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যেতেই পারে কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার শরীর ও মন দুটোর জন্যই ক্ষতিকর। তিনি বলেন, মেধা ও মনন বিকাশে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও সময় দেয়া উচিত। তিনি শিক্ষার্থীদের অল্প সময়ের জন্য হলেও খেলাধুলা করার পরামর্শ দেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ