বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

গণরুমের অভিজ্ঞতা

আপডেট: December 5, 2019, 1:14 am

শুভ্রা রানী চন্দ


এইচএসসি পাস করার পর শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীকে বাড়ি ছাড়তে হয়। অনেকে আবার বাড়িতে থেকেই পড়ার সুযোগ পেয়ে থাকে। তাদের সংখ্যা খুব কম। একটা সময় ছিল যখন মেস কিংবা ভাড়া বাসার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। ফলে সামর্থ্য থাকলেও অনেকের পক্ষেই এসব মেস কিংবা বাসায় থাকার সুযোগ মিলতো না। বাধ্য হয়ে তাদের থাকতে হতো হলে। হলেও যত শিক্ষার্থী তত সিট থাকতো না। তারপরে ১ম বর্ষে এসে তো তাকে উঠতে হতো গণরুমে-তাও কারো রেফারেন্সে। বিশাল বড় রুম তাতে ঠাসা বেড একটার সাথে আর একটা। মাঝখানে লম্বা দড়ি টানানো এ মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত। যাতে ঝুলতে থাকে ব্যবহার্য জামা-কাপড়, গামছা এমনকি মশারি পর্যন্ত। বেডের নিচে রাখা হতো রান্নার কাজে ব্যবহৃত হাড়ি-পাতিলসহ থালা-বাসন। কোথাও কোথাও টেবিল থাকলো তাতে বইপত্র তেমন থাকত না। কারণ সেটা রাখা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। প্রাইভেসির কোনো বালাই ছিল না সেখানে। আজব রুম গণরুম। সেখানে সারারাত আলো জ্বলে। কেউ সেখানে আলো বন্ধ করে ঘুমাতে গেলো তো আর একজন আলো জ্বালিয়ে পড়তে বসলো। কেউ খেয়ে নিলো তো আর একজন রান্না করতে বসলো। কেউ চুপ করতে বললো তো আর একজন সুর করে পড়া শুরু করলো। গণ রুমের বিচিত্র কাহিনী প্রকৃতপক্ষে বলে শেষ করা যাবে না। কোনো কোনো হলে আবার খাটের ব্যবস্থা নেই। মেঝেতে বিছানা পেতে থাকতে হয়। নীচ তলায় বিভ্রাট বেশি। এসব রুমে বর্ষাকালে কেঁচো, ব্যাঙসহ নানা রকম পোকা-মাকড় উঠে আসে। সত্যিই বিভীষিকাময় সে পরিবেশ। নানা রকম অসুবিধার ভেতরে আছে কিছু মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যা। কার গায়ে জামা লেগে গেলো, কার ভাত চুলায় পুড়লো, কে রাইস কুকার ব্যবহার করলো। কে স্টোভ জ্বালালো, লুডু খেলাতে কে হেরে গেলো, কে কার বিছানা সরিয়ে দিলো, কার বেড কার নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলো, হাঁটতে গিয়ে কার মশারিতে টান লাগলো ইত্যকার নানা সমস্যা। এ সালিশ করতে নালিশ যায় প্রভোস্টের কাছে। তবে এখানে থাকার মধুর স্মৃতিও কম নয়। দু’একজন ছাড়া সবাই সবার বন্ধু হয়ে যায়। বিপদে আপদে তারা একে-অন্যকে সাহায্য করে। কেউ অসুস্থ হলে সেবা করে। প্রয়োজনে হল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে মেডিকেলে নেবার ব্যবস্থা করে, দুপুর কিংবা রাত কোনো বিষয় নয়। শেয়ারিং-এর এক উত্তম স্থান- যেখানে খাবার থেকে বেড পর্যন্ত শেয়ার করে শিক্ষার্থীরা। জীবন চলার যাবতীয় জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব গণরুম থেকে। যারা গণরুমে সুন্দরভাবে চলতে শেখে-জীবনের কেথাও তাদের ঠেকতে হয় না। শেয়ারিং ও অ্যাডজাস্টমেন্টের এক অপূর্ব সুযোগ পাওয়া যায় এ গণরুমে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের গণরুম ব্যবহারের সুযোগ খানিকটা কমে যাচ্ছে। একটা সময় ছিলো যখন অভিভাবকেরা মেয়েদের হলের বাইরে থাকা কোনোক্রমেই অনুমোদন করতেন না। এখন সেটা অনেকটাই শিথিল। ফলে মেয়েরাও এখন মেসে কিংবা ভাড়া বাড়িতে থাকার সুযোগ নিতে পারছে। একথা সত্যি যে মেস কিংবা বাড়ি ভাড়া হলের ভাড়ার তুলনায় অনেক বেশি। তবুও সেখানে শিক্ষার্থীরা অনেকটাই আরাম আয়েশে কাটাতে পারে।
গণরুমে সবচেয়ে বড় অসুবিধা লেখাপড়ার। হলের গণরুমে থাকলে তাদের পড়ার জন্য রিডিং রুমে যেতে হয়। মেসে বা ভাড়া বাসায় সে সুযোগ অবারিত। নিজের মতো করে থাকা যায় এসব জায়গায়। প্রাইভেসিও রক্ষা করা যায় এখানে- যেটা গণরুমে প্রায় অসম্ভব। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া গণরুম থাকে-‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’- এভাবে। এ শিক্ষা তাদের পরবর্তী জীবনে অর্থাৎ কর্মজীবন কিংবা সংসার জীবনে পজিটিভ প্রভাব ফেলে। শিক্ষার্থীদের অনেকেরই অভিমত থাকার সুবন্দোবস্ত না করে তাদের ভর্তি করা উচিৎ নয়। এটি একটি সহজ সমাধান- যা খুব সহজ করে বলা যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চাইলেই শিক্ষার্থীদের হলে থাকার সুযোগ তৈরি করা যায় না। প্রথমতঃ হলগুলোর নির্দিষ্ট ধারণ ক্ষমতা রয়েছে অর্থাৎ সিট সংখ্যা নির্ধারিত। এছাড়াও নানা কারণে বরাদ্দকৃত সিটগুলো যথা সময়ে ফাঁকা হয় না। কারণ একাধিক। অন্যতম প্রধান কারণ যথা সময়ে পরীক্ষা না হওয়া কিংবা ফল না হওয়া।
একটা বাস্তব সমস্যা ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ পাওয়া। সে ক্ষেত্রে যদি থাকার সমস্যার কথা বিবেচনায় রেখে যোগ্য শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়া না হয়, তাহলে তারা যাবে কোথায়? ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেলে থাকার বন্দোবস্ত কোনো না কোনোভাবে করা যায়- কষ্ট হলেও। সুতরাং, সেটা কোনো সমাধান হতে পারে না।
গণরুমে থাকার অভিজ্ঞতা জীবনে চলার পথে অনেক কাজে লাগে। বাস্তব জ্ঞান অর্জনের একটা মোক্ষম সুযোগ মেলে এখানে। প্রকৃতঅর্থে হোস্টেল বা হলের জীবন বাস্তব শিক্ষা ক্ষেত্র। এখানে কেউ কাউকে হাতে তুলে দেয় না কিছু, অর্জন করে নিতে হয় নিজ গুনে। সুতরাং, নিজের অন্তর্নিহিত শক্তির ব্যবহার করে নিজেকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও গণরুম। সুতরাং, গণরুমের অভিজ্ঞতাকে শুধুমাত্র নেগেটিভভাবে নিলে ভুল হবে। বেঁচে থাকুক গণরুম যুগে যুগে।