গুজরাটেই গদি হারানোর মুখে নরেন্দ্র মোদি

আপডেট: ডিসেম্বর ৭, ২০১৭, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ

দীপঙ্কর দাসগুপ্ত


নিজেদের রাজ্য গুজরাটেই গদি হারানোর মুখে পড়েছেন নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ। সর্বশেষ জনমত সমীক্ষাগুলি থেকে প্রথম পর্বের ভোট শুরুর চারদিন আগে এই ইঙ্গিতই ফুটে উঠতে শুরু করছে। গুজরাটের প্রথম দফার ভোট শনিবার। দু’দফার এই ভোট পর্ব শেষ হবে ১৪ ডিসেম্বর। ফলাফল প্রকাশ হতে এখনও কয়েক সপ্তাহ বাকি। মাত্র চারদিন আগে এই মুহূর্তে গোটা গুজরাট জুড়ে যে রাজনৈতিক বাতাবরণ তাতে সব ধরনের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ ও সমীক্ষা থেকে যে তথ্য উঠে আসছে, তা হল বিজেপি’র নিশ্চিত পরাজয়।
যত সময় অতিবাহিত হচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একদিকে ঊর্ধ্বমুখি হচ্ছে কংগ্রেসের জয়ের সম্ভাবনার পারদ, আর নি¤্নমুখি হচ্ছে বিজেপি’র পারদ। ১৮ ডিসেম্বর প্রকাশ হবে হাই-ভোল্টেজ গুজরাট ভোটের ফল। চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে তা ইভিএম বাক্স খুললে বোঝা যাবে।
তবে তার আগে এখন দুই যুযুধান শিবিরের প্রধান দুই কুশীলব থেকে শুরু করে নিচু স্তরের কর্মী-সমর্থকদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের ধরনধারণ থেকে পরিষ্কার প্রায় নিশ্চিত জয়ের জন্য ক্রমশ আশান্বিত হচ্ছে কংগ্রেস শিবির। আর উল্টোদিকে প্রায় নিশ্চিত পরাজয়ের জন্য অশনিসঙ্কেত দেখতে পাচ্ছে বিজেপি শিবির। গুজরাটের কংগ্রেস কার্যালয়গুলিতে কার্যত উৎসবের মেজাজ। আর বিজেপি শিবিরের সর্বত্র বিমর্ষ ছবি। নেতাদের কপালে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে, চোখেমুখে ফুটে উঠেছে উৎকণ্ঠার ছবি।
জাতপাতের রাজনীতির অন্যতম পীঠস্থান গুজরাটের ভোটের ফল নির্ভর করে প্যাটেল ভোটের ওপর। গত কয়েক বছর যাবৎ সংরক্ষণের দাবিতে জঙ্গি আন্দোলনকে ঘিরে একদিকে শাসক দলের সঙ্গে প্যাটেল সম্প্রদায়ের দূরত্ব বেড়েছে। সেই আন্দোলনে মদত দেয়ার সুবাদে প্যাটেলদের সঙ্গে কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে গিয়েছে অনেকটাই।
কংগ্রেসের সঙ্গে হার্দিক প্যাটেলদের নির্বাচনী জোট বিজেপি’র বুকে যে শেল লেগেছিল, তা ক্রমশ গোটা শাসক শিবিরের হৃদকম্প বাড়িয়ে চলেছে।
নির্বাচনী প্রচারের একেবারে শেষ পর্বে পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্যে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা বিজেপি’র সভাপতি অমিত শাহ ‘এস-ও-এস’ পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে- সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করে গুজরাটে এসে আরো যত বেশি সম্ভব জনসভা করুন। অমিতের এই বার্তা থেকে বিজেপি শিবিরের টেনশনের মাত্রা বোঝা যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যতই আরো সভা করুন না কেন, সেই সব সভায় যে খুব একটা লোকজন জড়ো করা যাচ্ছে না তা ইতোমধ্যেই দেখা গিয়েছে। এখনও ১২টা জনসভা করার কর্মসূচি রয়েছে নরেন্দ্র মোদির। কিন্তু অমিত শাহের জরুরি বার্তার পরে সেই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। মোদির শেষ দিকে বক্তৃতাগুলো থেকেই স্পষ্ট রাহুল গান্ধী এবং সোনিয়া গান্ধীকে আক্রমণ করবেন তিনি।
তাই ইতোমধ্যেই যে সব জায়গায় নরেন্দ্র মোদির জনসভা হয়েছে, সেখান থেকে আসা গোপন গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সভায় তেমন লোক না হওয়ার ফলে ভোটারদের মধ্যে উল্টো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। অন্যদিকে রাহুল গান্ধীর সভাগুলিতে উপচে পড়া ভিড়ই শুধু নয়, বিশেষভাবে লক্ষণীয় সেই সব সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানুষের মধ্যে উৎসাহ আর উদ্দীপনার মেজাজ।
যেমন গতকাল বুধবারই দেখা গিয়েছে কচ্ছে রাহুল গান্ধীর সভায়। ওখির দাপটে কচ্ছে নামতে পারছিলেন না রাহুল। কিন্তু মাটিতে জনতা এতটুকু বিরক্ত না হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শেষ পর্যন্ত তাঁর হেলিকপ্টার অবতরণ করলে উল্লাসে ফেটে পড়েন মানুষ। মিছিল করে উটের গাড়িতে চাপিয়ে রাহুলকে তাঁরা নিয়ে যান সভাস্থলে। গুজরাট ভোটের ঠিক আগে রাহুলের এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাই চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে নরেন্দ্র মোদি- অমিত শাহদের।
তবে ক্ষমতাশীল দল হিসেবে এবং নির্বাচনী কৃৎকৌশলে দুই বড় ওস্তাদ নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের রাজ্যে বিজেপি পরাজয় বরণ করবে, এমনটা সহজে মেনে নিতে পারছেন না সমীক্ষকরাও। ফলে জনমত সমীক্ষার ফলাফল হিসেবে তাঁরা যে আগাম আভাস দিচেছন, তাতে এককথায় বিজেপি’র হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা না বলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কথা বেশি বলছেন। কিন্তু রাজ্যের দোকানপাট, অফিস-কাছারি থেকে শুরু করে সর্বত্র মানুষের কথাবার্তা থেকে যা স্পষ্ট হচ্ছে তা হল, ‘হাড্ডাহান্ডি লড়াই’ বলতে যা বোঝায় বিজেপি’র অবস্থা তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ।
জনমত সমীক্ষা যে সব সময় মিলে যায় তা নয়, তবে তা থেকে ভোটারদের মানসিকতার একটা আভাস পাওয়া যায় বলে মনে করেন ভোট-বিশেষজ্ঞরা। সেই জনমত সমীক্ষা বলছে, গুজরাটের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি আর কংগ্রেসের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বলা হচ্ছে, এই মূহুর্তে গুজরাটে নির্বাচন হলে বিজেপি বড়জোর টেনেটুনে জিততে পারে। গতকাল প্রকাশিত হওয়া সমীক্ষায় তেমনটাই বলা হয়েছে। সমীক্ষার পূর্বাভাস, বিজেপি এবং কংগ্রেস উভয় দলই পেতে চলেছে ৪৩ শতাংশ করে ভোট। তবে ১৮২ সদস্যের রাজ্য বিধানসভায় বিজেপি জিততে চলেছে ৯১ থেকে ৯৯টি আসন। সেখানে কংগ্রেস পেতে পারে ৭৬ থেকে ৮৬টি আসন।