গুরুত্বহীন বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস! খরাপ্রবণ বরেন্দ্র নিয়ে ভাবুন

আপডেট: জুন ১৯, ২০১৯, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ

১৭ জুন ছিল বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস। কিন্তু দুঃখজসক হলেও সত্য যে, রাজশাহীতে দিবসটি পালিত হয় নি। অথচ এই দিবসটি পালনের যথার্থতা রাজশাহী অঞ্চলের জন্যই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ নিয়ে যারা বা যে সব সংগঠন সোচ্চার হোন- তারা এই দিবসটি নিয়ে কোনো ধরনের আগ্রহ দেখালেন না। অথচ দুই দশক ধরে খুব বেশি বেশি উচ্চারিত হচ্ছে যে, রাজশাহী অঞ্চল ক্রমশ মরুকরণের দিকে যাচ্ছে। এর বাস্তবিক পরিস্থিতিও তাই। রাজশাহী অঞ্চলকে খরাপ্রবণ এলাকা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। আর খরাপ্রবণতা দুর্যোগেরই অংশ। কেননা খরাপ্রবণতা মানুষ ও প্রাণীর জীবন ও জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূউপরিস্থ পানির উৎস সমূহ আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে এ এলাকার মানুষ খাবার পানির উৎসের পাশাপাশি সেচ কাজেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক ব্যবহার পাশাপাশি অনাবৃষ্টি ও নদীতে পানি কম থাকার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বছরের ৪ থেকে ৫ মাস (মার্চ- জুন) এ অঞ্চলের অধিকাংশ নলকূপ থেকে পানি উঠে না। এ সময়ে তিব্র পানি সঙ্কটে বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্থ হয়।
দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানির জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। প্রতি বছর যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে তার সমপরিমাণ পানি ভূগর্ভে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নি¤œমুখি হচ্ছেÑ এটা এ অঞ্চলে মানুষ বসবাসের জন্য বিপর্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বরেন্দ্র এলাকা বাংলাদেশের কৃষিপ্রধান এলাকা। যেখানে খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু একই সাথে বরেন্দ্র এলাকা খরাপ্রবণ এলাকা বিধায় এখনে জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে আছে। খরা প্রতিরোধে এ অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির সুরক্ষাসহ ভূ-উপরিস্থ পানির আঁধার সংরক্ষণ, সস্প্রসারণ ও তার যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্যোগ এখনো সে ভাবে এগোয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বরেন্দ্রের খরাপ্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ভরা বর্ষা মৌসুমেও এ অঞ্চলের খরার লক্ষণ স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে এখনই খরা প্রতিরোধে টেকসই ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব না হলে এ অঞ্চলের কৃষি সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেই বিশেষজ্ঞদের মত। কৃষি বিপর্যস্থ হলে স্বাভাবিকভাবেই এ অঞ্চলের দরিদ্র ও নি¤œবিত্তের মানুষ বহুমুখি সঙ্কটের মধ্যে নিপতিত হবে।
বর্তমান পৃথিবীতে পরিবেশের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে মরুকরণ অন্যতম। জাতিসংঘ বলছে, পৃথিবীর প্রায় দেড়শ’ কোটি মানুষ বেঁেচ থাকার জন্য ক্ষয়িষ্ণু ভূমির ওপর নির্ভরশীল। আর পৃথিবীর অতিদরিদ্রদের ৪২ ভাগই বাস করে ক্ষয়ে যাওয়া এলাকায়, যারা মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাস করছে। এই ভূমিক্ষয় জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করছে, যা শুধু আমাদের বেঁচে থাকার জন্যই বিপদের কারণ নয়, বরং এটি আমাদের শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপ।
বরেন্দ্র অঞ্চল তেমনি একটি খরাপ্রবণ এলাকা। উন্নয়ন এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘোষণা। টেকসই উন্নয়নের ধারায় এ অঞ্চলের খরা প্রতিরোধের বিষয়টি এখনই খুব গুরুত্ব দিয়ে না দেখলে উন্নয়নের আর যে সব নিয়ে উচ্ছ্বসিত হওয়া যাচ্ছে- সেটিও রক্ষা করা যাবে না। উন্নয়নের অগ্রাধিকার ধাপ এড়িয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না বলেই আমাদের ধারণা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ