গোদাগাড়ীতে নিরাপদ ও বিষমুক্ত টমেটোসহ শাক সবজি উৎপাদন ১০ হাজার কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন

আপডেট: February 27, 2020, 1:16 am

একে তোতা, গোদাগাড়ী


রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে উৎপাদিত হচ্ছে নিরাপদ ও বিষমুক্ত টমেটোসহ শাক সবজি। গতানুতিক থেকে বের হয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও পদ্ধতিতে ফসল চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে কৃষকরা। এতে করে উপজেলার সার্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনা বদলে গেছে। আর কৃষকের ভাগ্যর পরিবর্তনের পিছনে কাজ করে যাচ্ছেন কৃষিবিদ শফিকুল ইসলাম। ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট গোদাগাড়ীতে কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে শফিকুল ইসলাম যোগদান করেন। এরপর থেকে তিনি উপজেলার কৃষকদের নিয়ে রবিশস্য চাষ বৃদ্ধিকরণের পাশাপাশি নিরাপদ শাব সবজি চাষের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাস্তবায়নে মাঠে নেমে পড়েন। কৃষকদের নিয়ে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে চাষের আধুনিক প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহারে পরামর্শ দেন মাঠ পর্যায়ের এই কৃষি কর্মকর্তা। এরপর কৃষকরা নিরাপদ ও বিষমুক্ত টমেটোসহ বিভিন্নি শাক সবজি চাষ করে সাফল্য পায়।
উপজেলার মাটাকাটা ইউনিয়নের কালিদিঘি গ্রামের মামুন হোসেন একবিঘা জমিতে বিষমুক্ত টমেটোর চাষ করে দেড় লাখ টাকা লাভ করেন। কৃষক মামুন হোসেন বলেন, গত দশ বছর ধরে টমেটো চাষ করে লাভ মুখ দেখতে পাই নি। এবার উপজেলায় বিষমুক্ত টমেটোর চাষের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী চাষে জৈব সার ব্যবহার করায় উৎপাদন খরচ কমে গেছে। তার একবিঘা জমিতে উৎপাদন খরচ হয় ২০ হাজার টাকা। উপজেলায় চলতি মৌসুমে টমেটো চাষ ২ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে। নিরাপদ ও বিষমুক্ত টমেটো চাষ করে উপজেলার ১০ হাজার কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে নিজদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার টমেটোর বাণিজ্য হওয়ায় ব্যবসায়ী ও কৃষি শ্রমিকরাও আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর ব্লকের উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার বলেন, পুরোনো পদ্ধতিতে টমেটো চাষ করায় কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার বেশি হওয়ায় বাজারে উৎপাদিত টমেটোর চাহিদা কমে যাওয়ায় কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছিল। কিন্ত কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম কৃষকদের নতুন পদ্ধতিতে ও প্রযুক্তি ব্যবহারে টমেটো চাষ করায় জমিতে জৈব সারের প্রয়োজন হয় বেশি। ফলে নিরাপদ ও বিষমুক্ত টমেটো উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এ এলাকায় উৎপাদিত টমেটোর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা বেশি দাম পেয়ে খুবই খুশি। উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের কালিদিঘি ও দেওপাড়া ইউনিয়নের ফুলবাড়িকে নিরাপদ ও বিষমুক্ত সবজি চাষ গ্রাম ঘোষণা করা হয়েছে। এই গ্রাম দুইটিতে শাক সবজি চাষ করেছেন ১০০ জন কৃষক। এদের মধ্যে অধিকংশই অসহায় নারী কৃষক রয়েছেন।
কালিদিঘি গ্রামের কৃষক মোসা. কাজল রেখা বলেন, গোদাগাড়ী কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম গ্রামে এসে উঠান বৈঠক করে সবজি চাষ করার জন্য পরামর্শ দিলে নারীরা বসত ভিটার পতিত জমিতে সবজি চাষের উপর আগ্রহ দেখায়। এরপর আগ্রহী ৪০ জন নারী কৃষককে বিনামূল্য প্রশিক্ষণ ও বীজ দেয়া হয়। ৭ কাঠা জমিতে জৈব সার ব্যবহার করে পালং শাক, কলমি শাক, পুই শাক, লাল শাক, ঢেড়শ, মরিচ ও বেগুন চাষ করে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে এ নারী কৃষক। এদিকে গোদাগাড়ী উপজেলায় চাষ কমতে থাকে রবি শস্যের। তবে কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের বিশেষ উদ্যোগে চলতি মৌসুমে উপজেলায় ব্যাপক রবিশস্যের চাষ হয়েছে।
গোদাগাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, উপজেলায় সরিষা ৬ হাজার ৭৪০, মসুর ৬ হাজার ৪৫০, ছোলা ১ হাজার ৩১০, ভুট্টা ২ হাজার ৫২৫ ও গম ৬ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
উপজেলার মহিশালবাড়ী গ্রামের কৃষক হাসান আলী বলেন, পানি সাশ্রয়ী ফসল চাষে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় কম। ফলে উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় ধান চাষের চেয়ে রবিশস্য লাভ বেশি হয়। এর আগে তানোর উপজেলায় ৪ বছরে ব্যাপকভাবে রবিশস্য চাষ বাড়িয়েছে কৃষিবিদ শফিকুর ইসলাম। গোদাগাড়ী কৃষক আন্দোলনের নেতা মুখলেসুর রহমান বলেন, অল্প সময়ে এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছে এ কৃষি কর্মকর্তা।
গোদাগাড়ী কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, এ অঞ্চলের কৃষকরা অত্যন্ত পরিশ্রমী। আমি এ সব কৃষকদের কাছে চাষের আধুনিক পদ্ধতি পৌঁছে দিয়েছি। আর নিরাপদ ও বিষমুক্ত টমেটোসহ শাক সবজি উৎপাদন মুজিবর্ষের উপহার।