গ্রামবাংলায় করোনার দিনকাল

আপডেট: April 25, 2020, 12:11 am

মো.গোলাম মোস্তফা


ভোরে বেলা আমাদের পাশের পাড়ার এক চাচী এসে ডাকাডাকি শুরু করেছেন। আমি ঘুম ঘুম চোখে উঠে বললাম কউ হয়েছে চাচী? উনি বললেন- “তুমাগের ফিরিজি( ফ্রিজ) যা কিছু আছে বের কোরে ফ্যালো। পুলিশ আয়েছে। সবার ফিরিজ ভ্যাঙে ফ্যালছে।” চাচী আমাকে আরো কিছু সতর্কবার্তা দিলেন। মূলত তিনি বলতে চাইলেন- করোনার কারণে মানুষ জিনিসপত্র কিনে কিনে ফ্রিজ ভরছে। এই কারণে পুলিশ বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে যাদের ফ্রিজে অতিরিক্ত খাবার আছে তাদের ফ্রিজ ভেঙে ফেলছে ।
করোনার দিনকালে এভাবেই চলছে গুজব। যেনো এটা গুজবের আতুরঘর!
আমার নিজের চলার জন্য এক মাসে যে পরিমাণ টাকা লাগে, সেই পরিমাণ টাকা দিয়ে নিজেদের পরিচিত কিছু মানুষদেরকে চাল, ডাল, তেল এবং কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিলাম। গ্রামে এটা একরকম প্রচার হয়ে গেছে। একজন এসে আমাকে বলে গেলো- ‘তুমার কাছে নাকি সাহায্যে আয়েছে’। আমি তখন তাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বললাম যে, এটা এক মাসের খরচ দিয়ে করেছি। শুনতে পেলাম অনেক গরিব মানুষই ত্রাণ পায়নি। ফলে সেইসব মানুষের অনেকেই আমাদের বাড়িতে এসেছে। কেননা ওই কিছু মানুষকে ত্রাণ দেওয়াতে একরকম রটে গেছে আমার কাছে নাকি ত্রাণ এসেছে। মনে মনে ভাবলাম- সত্যিই যদি ত্রাণ আসত আমার কাছে, তাহলে সব গরিব মানুষকে দিয়ে দিতাম। অথচ আমার পাশেই মহারাজপুর ইউনিয়নে ত্রাণের চাল নাকি পুকুরের ভেতর পাওয়া গেছে! হায়রে চাল! হায়রে ত্রাণ!! হায়রে জীবন!!!
পাশের বাড়িতে গতকাল শিরনী দিয়েছে। উদ্দেশ্য করোনা থেকে মুক্তি। সেই শিরনী খেতে পাড়ার বয়স্ক নারীরা ও ছেলেপুলেরা থাল হাতে নিয়ে একটা জটলা পাকিয়েছে। এভাবেই চলছে গ্রামের করোনা মোকাবেলা!!!
আমাদের গ্রামেই হাট বসে। আমার বাড়ি থেকেই প্রায় সবকিছু দেখা যায়। সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার এই দুইদিন হাটবার। মানুষ তাদের উৎপাদিত জিনিসপত্র নিয়ে হাটে আসে। করোনার কারণে হাট ১২টার পর থেকে শুরু হয়ে ৫.৩০ পর্যন্ত চলছে। হাটে চার পাঁচশ মানুষ আসছে। তবে শতকরা প্রায় ৯০ জন মাস্ক পরে এসেছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগের মাস্ক ময়লা তেলচিটচিটে। একটাই মাস্ক। হয়ত কতদিন ধরে পরিস্কার করে না! আবার শুনে দেখেছি স্বামীর মাস্ক স্ত্রী পরিস্কার করছে। ছেলে মেয়ের মাস্ক মা পরিস্কার করছে। এরা ভাবছে মাস্ক পরলেই বুঝি করোনা ধরবে না!
পাশেই ইটভাটা চলছে। ইটভাটার সামনের গেট অবশ্য লক করা। দেখে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী হচ্ছে। অল্প কিছু শ্রমিক ইট পোড়াচ্ছে ময়লা মাস্ক মুখে দিয়ে। কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেলো, এরা বেশিরভাগই ভূমিহীন দরিদ্র মানুষ। কাজ বন্ধ হয়ে গেলে নিঃশ্বাস বন্ধ হবার জোগাড় হবে।
গ্রামের পুরুষেরা প্রতিদিন বিকেলবেলা থেকে শুরু করে এশার ওয়াক্ত পর্যন্ত গ্রামের হাট ও মোড়ের দোকানে বসে চা খায়। দুদিন আগে আর্মি পুলিশ এসে তিনজন লোককে খুব করে পিটিয়েছে। সকাল বিকাল আর্মিতে, পুলিশে এসে টহল দিয়ে যাচ্ছে। বোঝাতে চেষ্টা করছে ভীড় পাকাবেন না। বাড়ি থাকুন, ঘরে থাকুন, বার বার হাত ধুয়ে নিন। এসবই বুঝিয়ে যাচ্ছে প্রশাসনের লোকজন।
কিন্তু কে শোনে কার কথা! একদল লোক মোড়ের দোকানে চা খেতে, একজায়গায় বসে গল্প করতে না পেরে বাগানের ভিতরে গিয়ে তাস খেলে গল্প করে সময় কাটাচ্ছে। বড় ফ্লাস্কে করে চা বানিয়ে দোকানিরা বাগানের ভিতরে বসে গেছে। কেনোনা এরা বুঝে গেছে বাগানের ভিতরে তো আর পাহারা দিতে আসবে না।
গ্রামের মেয়েরা একজায়গায় বসে গল্প করছে- “আল্লাহ কী আ্যালো দেশে”। গল্পের বৈঠকে যারা বসেছে তাদের বেশিরভাগেরই মাস্কগুলো ময়লা এবং তা খোলা।
আমি প্রথম থেকেই গ্রামের মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম। এমন একটা সহীহ হাদিস দিয়েও বোঝালাম যে, নবীজী মহামারির সময় এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যেতে নিষেধ করেছেন। এমনকি নবীজী বলেছেন- মহামরির সময় ঘরে বসে নামাজ পড়তে (বুখারী-৮৫৫)। আমার এসব শোনানোর পর কেউ কেউ চুপ করে চলে গেলো। কেউ কেউ বলল- ‘মরার টাইম হলি (হয়ে গেলে) সবাই মরতি (মরতে) হবে’।
এই হল গ্রামের অবস্থা। গ্রামে সবকিছু স্বাভাবিক চলছে। আমার এলাকায় গ্রামের ভেতরের রাস্তাগুলো এখন ব্যবহার হচ্ছে। সকাল আটটার পর কেবল বিশ্বরোডে গাড়ি চলছে না। গাড়ি বলতে কেবল বাস, ট্রাক, কার চলছে না। অন্য সবকিছুই চলছে।
এই করোনা এসে মানুষে মানুষে বিশ্বাস কমেছে। চাল চুরির ভাইরাল ঘটনাগুলো স্থানীয় মানুষের মনে জনপ্রতিনিধি মানেই খারাপ লোক এমন ধারণা জন্মাচ্ছে। ফলে কেউ ভাল কাজ করলেও লোকজন সেখানেও ঘাপলা (দোষ) খোঁজার চেষ্টা করছে। ভাল কাজ করা লোকগুলো খারাপ লোকের ভিড়ে চাপা পড়ছে। পাশের থানার কিছু লোকজন সাহায্য দেবার নাম করে অসহায় মানুষদের ডেকে ফটোসেশন করে পরে তাদের সাহায্য কেড়ে নিয়েছে। সরকার যতই তাদেরকে বোঝান না কেনো, এরা আছে নিজের আখের গোছাতে।
মানুষের সচেতনতা, বিবেকবোধ কমেছে। অবিশ্বাস জন্মেছে। সাধারণভাবে কেউ মারা গেলেও তাই কেউ সেই বাড়িতে যাচ্ছে না। ভয় তৈরি হচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসের গতিতে। আমাকে একজন এসে বলে গেলো -তেলাপিয়া মাছ, পোল্ট্রি খাওয়া যাবে না। ফলে গ্রামের ভেতরে যাদের পোল্ট্রি ফার্ম ছিল তারা পড়েছে মহাবিপদে। দাম কমিয়ে দিয়েও বিক্রি হচ্ছে না। আর বাইরে ব্যাপারিরাও আসতেছে না। ফলে পুঁজি হারাতে বসেছে এসব খামারিরা।
অনেকে থানকুনির পাতা, ঠাণ্ডা কাশির ওষুধ কিনে কিনে জমা করে রাখছে। কেউ কেউ বলছে কড়া রোদ পড়লে করোনা থাকবে না। কেউ বলছে কর্পুরে করোনা দূর হবে। কেউ বলছে পান খেতে হবে। একজন বলল- হাতে পায়ে সব জায়গায় সরিষার তেল মাখতে হবে। সরিষার তেলের ঝাঝের কাছে নাকি করোনা আসবে না। তাহলে বুঝেন- এই হচ্ছে গ্রামের মানুষের করোনা দূর করার পরিকল্পনা!
গ্রামের কৃষক ফসল নিয়ে পড়েছে মহাবিপদে। শাকসবজি মাঠেই পচে যাচ্ছে। অনেকে এলাকার মানুষের কাছে কম দামে বিক্রির চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বিপদে পড়েছে দিনমজুরেরা। এরাই মূলত খাবারের তাগিদে বের হচ্ছে।
গ্রামের মানুষের জীবিকার অনেকটা আসে হাঁসমুরগি, গরু-ছাগল পালন করে। কোনো কারণে এসব অসুস্থ হলে উপজেলা পশু হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যায়। কিন্তু এখন পশুহাসপাতাল বন্ধ। আমি নিজেই খুব প্রয়োজনে সতর্কতার সাথে গিয়ে ফিরে এসেছি।
গ্রামের তরুণদের অনেকেই ঢাকাতে গার্মেন্টসে কাজ করত। এখন তারা বেকার। কেননা এটা তো আর সরকারি চাকরি নয় যে, হাতি বাঁচলেও লাখ টাকা, মরলেও লাখ টাকা। গ্রামের লোকজন বলাবলি করছে- এখন সুখে আছে সরকারি চাকরিজীবীরা
জিনিসপত্ররের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। জিগগেস করলে বলছে কিনার সময় বেশি দাম দিয়ে কিনেছি। তাই বেচতেও হচ্ছে বেশি দামে।
এতক্ষণে আপনি আমার লেখায় যে বিষয়গুলো পেলেন তা থেকে মনে হবে গ্রাম বাংলা অশিক্ষিতদের কারখানা। বিষয়টি কিন্তু প্রকৃতঅর্থে তা নয়। এই গ্রাম বাংলার মানুষেরাই টিকিয়ে রেখেছে এদেশের কৃষি, সবুজ প্রকৃতি, সুন্দর বায়ু আর ঔষধি বৃক্ষরাজি। তাছাড়া এদেশের মোট গাছপালার বেশি অংশই গ্রামাঞ্চলে রয়েছে।
তাহলে গ্রামে আসলে কী প্রয়োজন?
প্রয়োজন গ্রামের দরিদ্র মানুষদের পাশে দাঁড়ানো। কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে প্রণোদনা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। কেনোনা ভবিষ্যতে এরকম মহামারি যে আর আসবে না সেটার তো নিশ্চয়তা নেই । সেক্ষেত্রে কৃষি অর্থনীতিকে আরো চাঙ্গা করতে হবে। কৃষি ও কৃষক বাচানোর কোনো বিকল্প নেই।
আর দরকার গণশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার। এক্ষেত্রে গণশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে গ্রামের শিক্ষিত তরুণদের দিয়ে। আর গ্রামের লেখাপড়া না জানা এসব মানুষের একটা তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। তাদেরকে প্রণোদনাও দিতে হবে। গণমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। মোটামুটি একটা কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ভয়াবহ এই করোনা আমাদের সেই শিক্ষাই দিচ্ছে।
অসহায় মানুষের চাল চুরির হিড়িক থামানোর এখনই সময়। নইলে দেশের অর্থনীতি যাদের শ্রমে চাঙ্গা থাকে, তারা ভেঙে পড়বে। ফলে গভীর মানবিক সংকট সৃষ্টি হবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর হাতে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব দিতে হবে। এই সময়ে দায়িত্বশীল আচরণের কোনো বিকল্প নেই। কেনোনা হুহু করে বাড়ছে মানুষের লাশের সারি। কান্নায় কান্নায় পৃথিবী ভারী হয়ে উঠছে। আসুন আমরা মানুষ মানুষের জন্য এই মূলমন্ত্র ধারণ করে করোনা মোকাবেলায় সচেতন হয়ে উঠি।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক, বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন সোসাইটি (বিইপিএস)