গ্র্যাজুয়েট হচ্ছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা

আপডেট: মার্চ ৪, ২০১৯, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


সাথী আক্তার গ্র্যাজুয়েট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু দিনমজুর বাবার পক্ষে তার পড়াশোনার খরচ জোগানো সম্ভব ছিল না। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে একসময় তিনি নাম লেখান গার্মেন্টস শ্রমিকের খাতায়। চাকরি হয় মোহাম্মদী গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানটি মেধাবী শ্রমিকদের গ্র্যাজুয়েট হওয়ার সুযোগ করে দেয়। সাথী আক্তার এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
সাথী আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তার স্বপ্ন এখন সত্যি হতে যাচ্ছে। আগামী এক বছর পরই তার গ্র্যাজুয়েশন কোর্স শেষ হবে। সাথীর মতো অনেক গার্মেন্টস শ্রমিকই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছেন।
জানা গেছে, চট্টগ্রামে অবস্থিত বেসরকারি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে পড়ালেখা করছেন দেশের বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস শ্রমিক। এর মধ্যে মোহাম্মদী গ্রুপের বিভিন্ন গার্মেন্টেসের রয়েছেন নয়জন। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এই গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিনা খরচে উচ্চশিক্ষা দিচ্ছে।
মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক বলেন, ‘মোহাম্মদী গ্রুপ একজন শ্রমিকের পড়ালেখার আগ্রহকে সন্মান দেখায়। সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে শ্রমিকদের জন্য বেশ কয়েকটি পজিটিভ কাজ করে যাচ্ছে মোহাম্মদী গ্রুপ।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের মেধাবী শ্রমিকরা যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে সে জন্য আমরা এশিয়ান ইউনিভারসিটি ফর উইমেনের সঙ্গে চুক্তি করেছি।’
রুবানা হক জানান, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন প্রতি বছর তিন বার কারখানায় পরীক্ষা নিয়ে থাকে। যারা পরীক্ষায় কৃতকার্য হয় তাদের সব খরচ বহন করে মোহাম্মদী গ্রুপ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া সাথী আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কখনও ভাবিনি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ হবে। বাবা স্বপ্ন দেখতেন আমাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। কিন্তু আর্থিক অভাবের কারণে মাধ্যমিক পাশ করেই পড়াশোনার বন্ধ হয়ে যায় আমার।’ তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদী গ্রুপে চাকরি পেয়েছিলাম বলে আজ আমি গ্র্যাজুয়েট হওয়ার স্বপ্ন দেখছি।’
সাথী আক্তারের মতো গ্র্যাজুয়েট হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন গ্রামের নি¤œবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রোকেয়াও। দিনমজুর বাবা অসুস্থ হওয়ার পর টাকার অভাবে মাধ্যমিকের পর আর পড়তে পারেননি। রোকেয়া বলেন, ‘অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের সময় পার করেছি আমি। স্বপ্ন দেখা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ মোহাম্মদী গ্রুপের স্যারদের কাছে কোম্পানির সহযোগিতায় বিনা মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগের কথা শুনি। কোম্পানি থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস পেয়ে আমি আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। ভর্তির পরীক্ষায় অংশ নিয়ে আমি ভর্তির সুযোগ পেয়েছি।’
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মেয়ে জিন্নাত আরা জনি ২০১৮ সালে মোহাম্মাদী গ্রুপে ‘কোয়ালিটি ইনস্পেক্টর’ হিসেবে যোগ দেন। এর ১০ দিন পরই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান তিনি। ভর্তি পরীক্ষায় টিকে যান। লেখাপড়া শেষে তিনি গায়িকা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে চান। পাশাপাশি মোহাম্মাদী গ্রুপে ভালো পদে চাকরি করতে চান।
এশিয়ান ইউনিভারসিটি ফর উইমেনের শিক্ষার্থী মারুফা খাতুন বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও শ্রমিক ছিলাম। এখন গ্র্যাজুয়েট হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি। বেতন পাচ্ছি। বোনাস পাচ্ছি।’ পড়ালেখা শেষ করে তিনি সমাজের জন্য কাজ করতে চান। বিশেষ করে শ্রমিকদের জন্য কিছু করতে চান। দরিদ্রদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ অবারিত করতে চান।
মোহাম্মাদী গ্রুপের শ্রমিক ফারজানা ভবিষ্যতে নারীদের উন্নয়নে কাজ করতে চান। তার আগে গ্রাজুয়েশন শেষ করাই তার ধ্যান-জ্ঞান। ফারজানা বলেন, ‘মোহাম্মাদী গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর একজন বড় মনের মানুষ। তিনি আমাদের আর্থিক সার্পোট দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের মানসিক সার্পোটও দেন।’
আরেক গার্মেন্টস শ্রমিক আইরিন আক্তার বলেন, ‘আমি গ্রাজুয়েট হবো, এটা কল্পনারও বাইরে ছিল। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমি মোহাম্মাদী গ্রুপকে আমার সাধ্যমতো সহযোগিতা করতে চাই।’
মোহাম্মদী গ্রুপ কেবল শ্রমিকদের পড়ালেখার খরচ বহন করছে তা-ই নয়, প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিকদের বাচ্চাদের পড়ালেখার খরচও বহন করছে। মোহাম্মদী গ্রুপের এইচআরডি অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স প্রধান সৈয়দ এহেতাসুম কবীর জানান, উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া কর্মীদের কোর্স চলার সময় কোম্পানি থেকে তাদের থাকা-খাওয়া, নিয়মিত বেতন-বোনাসসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। মেধাবী শ্রমিকদের উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করা ছাড়াও শ্রমিকদের বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে মোহাম্মদী গ্রুপের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পাশে একটি করে স্কুলও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে শ্রমিকরা তাদের সন্তানদের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতন পড়াতে পারছেন। বাচ্চাদের খেলার জন্য মাঠ রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, স্কুলে থাকার সময় তাদের বিনামূল্যে খাবারও দেওয়া হয়।-বাংলা ট্রিবিউন