ঘুঘুছানা ও মন্টু

আপডেট: নভেম্বর ১১, ২০১৭, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

মোনোয়ার হোসেন


বিকেলে বাঁশঝাড়ের পাশে হাঁটছিল মন্টু। হঠাৎ তার নজর পড়ল বাঁশের ঝোপের উপর। ঝোপের ভিতর একটি ঘুঘুর বাসা। বাসায় একটি ঘুঘু বসে আছে। মন্টু বুঝলো-এটি মা ঘুঘু। ঘুঘুর বাসা দেখে সে খুব খুশি হলো। ঘুঘুটি যখন বাসা থেকে উড়ে চলে গেল, তখন সে চুপিচুপি বাঁশ বেয়ে উপরে উঠলো। উঠে দেখে বাসায় দু’টি ঘুঘুর ডিম। ডিম দেখে সে খুব পুলকিত হলো। এরপর প্রতিদিন বিকেলে স্কুল থেকে এসেই সে বাঁশঝাড়ের দিকে যায়। একবার করে ঘুঘুর ডিমগুলো দেখে আসে। একদিন তো সে অবাক! বাসায় আর ডিম নেই ; ডিম ফুটে বের হয়েছে ফুটফুটে দুটি ছানা। একটির রঙ সাদা অপরটির রঙ ধূসুর। ঘুঘুছানা দেখে তার আনন্দ আরো বেড়ে গেল। সে ঠিক করলো ছানাগুলো বড় হলে বাসায় নিয়ে যাবে। পুষবে। পরেরদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে একটি পাখির খাঁচা কিনলো। পাখির খাঁচা দেখে মা বললো, কিরে মন্টু, পাখির খাঁচা পেলে কোথায় ?
মুচকি হেসে মন্টু বললো, কিনে নিয়ে এলাম মা ।
কেন ?
পাখি পুষবো বলে ।
পাখি !
হুম।
কি পাখি ?
ঘুঘু পাখি।
ঘুঘু পাখি কোথায় পাবে ?
ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে বললো, আমাদের বাঁশঝাড়ে দুটি ঘুঘুর ছানা ফুটেছে মা ।
তাই নাকি ?
হুম।
তারপর বুলু কাকুকে ফোন দিলো সে। বুলু কাকু শহরে লেখাপড়া করে। বুলু কাকু খুব ভালো। তাকে খুব বুঝে। পাখি খুব পছন্দ বুলু কাকুর। মন্টু যখন ছোট, তখন বুলু কাকুর অনেক প্রজাতির পাখি ছিল। ঘুঘুপাখি, টিয়াপাখি, ময়নাপাখি আরো কত্ত কত্ত পাখি। তাকে নিয়ে বিকেলে মাঠে যেতো বুলু কাকু। মাঠ থেকে ঘাসফড়িং ধরতো।
জানিস মন্টু ?
কী কাকু ?
ঘাসফড়িং হলো পাখির প্রিয় খাবার। পাখিকে যতো বেশি ঘাসফড়িং খাওয়াবে, পাখি ততো তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠবে।
তাই নাকি?
হুম।
মন্টু খুব খুশি হয়। সেও কাকুকে ঘাসফড়িং ধরে দেয়। সন্ধ্যায় কাকু আগে পাখিদেরকে পেটপুরে ঘাসফড়িং আর পানি খাওয়ায় তারপর পড়তে বসে। মন্টুও কাকুর পাশে মাদুরে বসে। মাদুরে বসে কাকুর কাছে অ-আ পড়ে আর পাখির খাঁচার দিকে তাকায়। পাখি দেখে। খুব মজা পায় সে। ভাবে সেও মন্টু কাকুর মতো বড় হলে পাখি পুষবে। অনেক পাখি পুষবে।
মন্টু এখন বড় হয়েছে। স্কুলে যায়। ক্লাস ফোরে পড়ে।
মন্টুর ফোন পেয়ে কাকু বললো, কিরে মন্টু, কোনো খবর আছে ?
আছে কাকু।
কি খবর?
আমাদের বাঁশঝাড়ে দুটি ঘুঘুর ছানা ফুটেছে।
তাই নাকি ?
হ্যাঁ, কাকু।
কাকু খুব খুশি হয়। বলে, সাবধানে রাখিস। কেউ যেনো চুরি করতে না পারে।
ঠিক আছে, কাকু।
মন্টু প্রতিদিন সকাল-বিকেলে গিয়ে ঘুঘুছানা দেখে আসে। ঘুঘুছানা আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠে। ডানা ঝাপটায়। তা দেখে খলখলিয়ে হেসে উঠে মন্টু।
বাসায় এসে কাকুকে ফোন করে। কাকু !
হ্যাঁ মন্টু, বল।
ঘুঘুছানা বড় হয়ে গেছে। এখন ডানা ঝাপটায়।
তাই নাকি ?
হুম।
তুমি তাহলে কালকেই ছানা দুটি বাসায় নিয়ে এসো। নতুবা আর দুদিন গেলে উড়ে চলে যাবে।
ঠিক আছে কাকু।
পরেরদিন স্কুল থেকে এসেই বাঁশঝাড়ে গেল মন্টু। ছানাদুটি বাসায় নিয়ে এলো। খাঁচায় ঢুকালো। ঘাসফড়িং আর পানি খেতে দিল।
কিন্তু এ কি ! ছানাদুটি যে কিছুই খাচ্ছে না। ঘাসফড়িংও না।
ডানাও ঝাপটাচ্ছে না।
খাঁচার ভিতর কেমন যেনো মন মরা হয়ে চুপচাপ বসে আছে। তা দেখে মন্টুর খুব মন খারাপ হয়। মন খারাপ করে না খেয়ে শুয়ে পড়ে সে। হঠাৎ শুনে কে যেন চিকন সুরে কাঁদছে। কান্নার আওয়াজ অনুসরণ করে সামনে এগিয়ে আসে সে। বারান্দায় এসে দেখে পাখির খাঁচার ভিতর থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে। খাঁচার ভিতরে কাঁদছে কে ? মন্টুর একটু একটু ভয় লাগে। ভয়ে ভয়ে খাঁচার কাছে আসে ও। দেখে খাঁচার ভিতরে ঘুঘুছানা কাঁদছে। তোমরা কাঁদছ কেন?
একটি ছানা কেঁদে কেঁদে বললো, আমাদেরকে ছেড়ে দাও বন্ধু। আমরা মায়ের কাছে যাবো। মায়ের জন্য আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। প্লীজ, তুমি আমাদের ছেড়ে দাও।
ঘুম ভেঙে যায় মন্টুর। ভাবে সত্যিই কি বাবা মায়ের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে ঘুঘুছানার? সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে কাবিলা দুষ্ট লোকটা যখন তাকে অপহরণ করেছিল, তখন মায়ের জন্য তার যেরকম কষ্ট হচ্ছিল, ঘুঘুছানারও কি সেরকম কষ্ট হচ্ছে ? তার মানে আমিও কি দুুষ্ট লোক? কাবিলা শয়তান লোকটার মতো?
মনটা আরো খারাপ হয়ে যায় তার। ধীরে ধীরে বারান্ধায় খাঁচার পাশে এসে দাঁড়ায় ও। তাকায় ছানাদুটির চোখের দিকে। চোখের পানিতে ছানাদুটির চোখ টলমল করছে। মন্টু বুঝলো মায়ের জন্য কাঁদছে তারা। মায়ের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে তাদের। ছানাদুটির চোখের পানি দেখে তার খুব মায়া হলো। খাঁচার দরজা খুলে দিলো। দরজা খোলা পেয়ে পড়ি-মরি করে উড়ে যায় ছানাদুটি। মন্টু তাদের উড়ে চলা পথের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে।