ঘুষ সম্পর্কে পুলিশকে সতর্কতা পুলিশ গণমানুষের আস্থায় আসবে কি?

আপডেট: অক্টোবর ২, ২০১৯, ১:১৯ পূর্বাহ্ণ

সম্প্রতি পুলিশের ‘নৈতিক স্খলনজনিত প্রসঙ্গে’ একটি চিঠি ইস্যু করে পুলিশ সদর দফতর। ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে- পুলিশের সব রেঞ্জ, মেট্রোপলিটন ও ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অবৈধ আর্থিক লেনদেন ঘুষ-দুর্নীতি নিবারণ প্রসঙ্গে ‘শূন্য সহিষ্ণু (জিরো টলারেন্স)’ অবস্থান নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ক একটি প্রতিবেদন দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
ওই চিঠির উদ্ধুতিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মকাণ্ডে নৈতিক স্খলনের বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা একটি ‘ডিসিপ্লিন ফোর্স’ হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এই উপলব্ধিটাও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পুলিশের এমন ব্যক্তিরাও আছেন যারা ঘুষ-দুর্নীতির সাথে সম্পর্কিত এবং তারা পুলিশের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। এটাকে চলতে দেয়া যায় না। যারা এসব কাজে জড়িত তাদের শাস্তি হতে হবে। এই বোধ দ্বারা যদি পুলিশ সদর দপ্তর তাড়িত হয় তা হলে সেটা দেশের ও দেশের মানুষের জন্য কল্যাণকর। কিন্তু পুলিশ সদর দপ্তরের ওই উপলব্ধি যদি কার্যক্ষেত্রে পরিলক্ষিত না হয় সে ক্ষেত্রে এই উপলব্ধি বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ লোক দেখানো কিছু হাকডাক থাকবে- পুলিশ যেখানের সেখানেই থাকবে। এতে করে দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যরা ভয়ঙ্কর দৈত্যে পরিণত হবে। পূর্বের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। পুলিশ কর্মকর্তারা অপরাধ জগতের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা ক’রে পরের পরিস্থিতি যা ছিল তাই। কিংবা তার চেয়েও খারাপ। এ সবই দেশের মানুষের তিক্ত অভিজ্ঞতা। এ অভিজ্ঞতা একদিনে, দু দিনে হয় নি। ব্যক্তি নিজে সয়ে এবং অন্যের অসহায়ত্ব দেখে পুলিশ সম্পর্কে এমনই সিদ্ধান্তে এসেছে। এটা পুলিশের সাথে দেশের মানুষের আস্থার সঙ্কট। এর জন্য কোনোভাবেই দেশের মানুষ দায়ি নয়Ñ এর জন্য পুলিশ বিভাগ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিগণ এ দায় এড়াতে পারেন না।
পুলিশ সদর দপ্তর যখন ইউনিট সমূহকে ঘুষ-দুর্নীতি বিষয়ে বারবার সতর্ক করছেÑ এর মানে পুলিশ বিভাগে ঘুষ-দুর্নীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যতিক্রম পুলিশ সদস্য যারা আছেন তাদের সংখ্যাও নেহাতই কম- তারাও তাদের পেশাদারিত্ব দুর্নীতিবাজদের কারণে মেলে ধরতে পারছে না। এটাও পুলিশের মধ্যেকার একটা বড় সঙ্কট।
দেশের সরকারি সংস্থাগুলোর সেবাখাতে দুর্নীতি নিয়ে ২০১৭ সালে একটি জাতীয় ‘খানা’ জরিপ করে দুর্নীতি বিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টিআইবি। সেই জরিপে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে দুর্নীতিতে শীর্ষে স্থান পায় পুলিশ। ওই জরিপ তথ্যে দেখা যায়, পুলিশের কাছে সেবা নিতে গিয়ে ৭২.৫ শতাংশ খানা দুর্নীতি-অনিয়মের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। বছরে টাকার অংকে যা দুই হাজার ১শ কোটি টাকারও বেশি।
ওই সময় ওই জরিপ তথ্যের তিব্র প্রতিবাদ হয়েছিল সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে। মন্ত্রী-এমপিরাও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু এক তরফা প্রতিক্রিয়ার ফলে পুলিশ বিভাগের দুর্নীতিবাজ সদস্যরাই উৎসাহিত হয়েছে এবং তারা দুর্নীতি আপদ-মস্তক নিমজ্জিত হয়েছে।
শুধু নির্দেশনা দিয়েই পুলিশ বিভাগের দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে বিষয়টি তেমন নয়Ñ বরং কিছু ব্যবস্থা নেয়া যায় যাতে করে দুর্নীতি করার সুযোগটাই সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তি বিশেষর সংস্রব পরিস্থিতি প্রকট করেছে তুলেছে। এটা রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই বন্ধ করতে হবে। আর সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে সম্পদের হিসাব নিশ্চিত করতে হবে। চাকরিতে প্রবেশকালে ব্যক্তির সম্পদ এবং বছর বছর সেই সম্পদের আকার-বৃদ্ধি সঙ্গতিপূর্ণ কি না সেটা সরকারি চাকরি বিধিতে সংযুক্ত করার সময় এসেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ