ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ক্ষত

আপডেট: নভেম্বর ১৪, ২০১৯, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারাণী চন্দ


প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত দেশে বাংলাদেশ। প্রতি বছরে ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসে এদেশের মানুষ বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলীয় মানুষ আক্রান্ত হয়। প্রকৃতির এ দানবীয় রূপটি পরিগ্রহ করবার শক্তি মানুষের নেই। তবে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জনগণের সচেতনমূলক কর্মকাণ্ড গ্রহণের ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। তবে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে প্রাণনাশের ঘটনা। বিগত সময়ে সিডর কিংবা আইলায় যে প্রাণ নাশ হয়েছে তা মানুষ আজও ভুলতে পরে না। মধ্যরাতে উপকূলীয় অঞ্চলে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। আগাম সতর্কবার্তা ঘোষণা করা হচ্ছিলো টিভি চ্যানেলগুলোতে। এমনকি মাইকিং করা হচ্ছিলো উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে। বেশির ভাগ মানুষই ঠাঁই নিয়েছিলো আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে। কিছু মানুষ অবশ্য সাহসে ভর করে থেকে গিয়েছিল নিজ নিজ বাসস্থানে। গাছ-পালা ভেঙ্গে পড়েছে, উপড়ে পড়েছে। উড়িয়ে নিয়ে গেছে ঘরের টিন। শুধু ঘরের চালই নয় অনেক বাড়ি ভেঙ্গে বাতাসের তোড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে আসবাবপত্রসহ প্রয়োজনীয় সব জিনিস। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ধান এবং শীতকালীন সব্জির ক্ষতি হয়েছে বেশি। উপকূলীয় অঞ্চলে গেলে দেখা যাবে শ্মশানপুরী। চারিদিকে গাছ পালার স্তূপ, ভাঙ্গা বাড়িঘর আর ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের খেত। জলোচ্ছ্বাসের ফলে ডুবে গেছে মাছের ঘের। ফলে মাছ-চাষিদের আবাদি মাছ চলে গেছে নদী-নালায়। ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে তারা। পত্রিকান্তরে জানা যায়, প্রাণহানি হয়েছে ১৪ জনের। ঝড়ের সময় বিভিন্ন স্থানে ঘর কিংবা গাছ চাপা পড়ে মারা গেছে ১৩ জন এবং ১জন মারা গেছেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে।
ঝড়ের আগাম বার্তায় উপকূলীয় অঞ্চলে ১০ নম্বর উপকূলীয় বিপদ সংকেত দেখানো হয়েছিল। আগাম সতর্কবার্তা থাকায়, একই সাথে মানুষের সচেতনতার ফলে এবারে প্রাণহানি কম হলেও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ সীমাহীন ও অপূরণীয়। প্রকৃতি বিরূপ হলে তা যেমন ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় ঠিক তেমনভাবে এ প্রকৃতিই আমাদের রক্ষাও করে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের যে ভয়ঙ্কর রূপ তা যদি সরাসরি আছড়ে পড়তো উপকূলীয় অঞ্চল তাহলে সে ক্ষতির পরিমাণ হতো এখনকার তুলনায় কয়েকগুন বেশি হতো। কিন্তু এবারও ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সুন্দরবন। বুলবুল যদি সুন্দরবন এলাকায় বাধাপ্রাপ্ত না হতো তাহলে তার রূপ হতো আরো ভয়ঙ্কর। তাই প্রকৃতির কাছে আমরা ঋণী। বিশেষ করে উপকূলীয় মানুষের কাছে বড় আশীর্বাদ সুন্দরবন। সুতরাং, এ বনভূমিকে রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। সিডর ও আইলার সময়ও সুন্দরবন এ এলাকার ক্ষতির পরিমাণ খানিকটা কমিয়েছে।
এবারের ঘূর্ণিঝড় বুলবুল বারবার গতি পরিবর্তন করে অবশেষে ১১৫ কিলোমিটার বেগে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশপরগনা জেলার সুন্দরবন উপকূল হয়ে বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন এলাকার প্রবেশ করে। তখন সে ঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯০ থেকে ৯৫ কিলোমিটার। সুন্দরবন না থাকলে এ ঝড়ের গতিবেগ হতো ঘণ্টায় ১১৫ কিলোমিটার থেকে ১২৫ কিলোমিটার। এই গতিবেগে যদি বুলবুল জনপদে আছড়ে পড়তো তা হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতো। সুন্দরবনে যদি বুলবুল বাধা না পেতো তাহলে জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতাও বাড়তো। তাতে করেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতো।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল ভারতের পশ্চিম উপকূলে প্রথমে আঘাত হেনে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে আসার সময় শক্তি হারিয়ে খুলনা ও সাতক্ষীরা এলাকায় আঘাত হানে। ফলে ক্ষয়ক্ষতি যতটা আশংকা করা হয়েছিল তার চেয়ে কম হয়েছে। বুলবুলের আঘাতে বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে গিয়ে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে বহু এলাকায়। ওইসব এলাকার মানুষকে অন্ধকারে রাত কাটাতে হচ্ছে। যে সব এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার ভেতরে কোনো কোনো এলাকার লোক পনিবন্দি অবস্থায় আছে। তাদের দুর্ভোগ আরো বেশি। উপকূলীয় অঞ্চলের যেসব স্থান বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা বুলবুল ক্ষতচিহ্ন রেখে গেছে সেগুলো হচ্ছে- বরিশাল, বানারীপাড়া, শরীয়তপুর, খুলনা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, বাগেরহাট, মংলা, ঝালকাঠি, রাজাপুর, কেশবপুর, বাউফল, চাঁদপুর, পিরোজপুর, মঠবাড়িয়া, ইদুরকানী, কাউখালী, স্বরূপকাঠি, নাজিরপুর, ভোলা, লালমোহন, চরফ্যাশন, সাতক্ষীরা, ঈশ্বরদী, নোয়াখালী, লক্ষ¥ীপুর, পাথরঘাটা ইত্যাদি। এসব এলাকা এখন শ্মশানপুরী। মাথার উপরে ছাউনি নেই, ঘরে খাবার নেই, খেতের ফসল নেই। চারিদিকে শুধু হাহাকার। চরম দুর্ভোগে আছেন এসব এলাকার লোকজন। সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে সাহায্য করবার। যতই সাহায্য আসুক একটা সাজানো সংসার যখন প্রকৃতির তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় তাকে স্বাভাবিক করা যায় না ২/৪ বছরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে যে ক্ষতি তৈরি হয় তা সারানো যায় না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সারা জীবনে। বিশেষ করে যাঁরা প্রাণ হারান সে ক্ষতি পূরণ হয় না কোনো কিছুর বিনিময়ে। বুলবুলও তেমনি ক্ষত তৈরি করলো ১৪টি অমূল্য প্রাণ কেড়ে নিয়ে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এ ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করার জন্য আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। বার বার সতর্ক করা সত্ত্বেও অনেকে নিজ বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যায় নি। বিপদের সময় সংঘবদ্ধ হয়ে থাকলে অন্তত প্রাণনাশের ঝুঁকি এড়ানো যায়। আমরা নিশ্চয়ই বুলবুলের ক্ষত খানিকটা হলেও কাটিয়ে উঠতে পারবো সময়ের সাথে সাথে। হতাশ না হয়ে নতুন উদ্যমে কাজে লেগে পড়তে হবে আক্রান্তদের। একই সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে সকলকে।