চট্টগ্রামে খেলাপি ঋণ হিসাবে যা, বাস্তবে তার দ্বিগুণ

আপডেট: জুলাই ৯, ২০১৮, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে চট্টগ্রামে খেলাপি ঋণ রয়েছে ৮৪৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। যদিও বাস্তবে তা চার গুণেরও বেশি। গত ডিসেম্বর শেষে বন্দরনগরীতে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৩ হাজার ৬৪১ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার এ অমিল শুধু ন্যাশনাল ব্যাংকের নয়। দেশের অন্য সব ব্যাংকের পরিস্থিতিও একই। খেলাপি ঋণবিষয়ক টাস্কফোর্সের বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণীকৃত ঋণ রয়েছে ১০ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। এছাড়া অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। আর আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে ৮ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণে। অথচ ব্যাংকগুলো নিজেদের ব্যালান্সশিটে শুধু শ্রেণীকৃত ১০ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকাকে খেলাপি হিসেবে দেখাচ্ছে।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকাকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছে টাস্কফোর্স। সে হিসাবে চট্টগ্রামে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ১৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ খেলাপি। এ হার ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের গড় হারের চেয়েও বেশি। বিদায়ী বছর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের গড় হার ছিল ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতের গড় খেলাপি ঋণের দ্বিগুণ রয়েছে চট্টগ্রামে। শ্রেণীকৃত, অবলোপনকৃত ও আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা ঋণকে খেলাপি হিসেবে ধরা হয়েছে।
ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামের পুরনো ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কিছু নতুন ব্যবসায়ীও তৈরি হয়েছে। ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণও পেয়েছেন এসব নব্য ব্যবসায়ী। ঋণের টাকা ব্যবসায় না খাটিয়ে তারা ভোগ-বিলাস, জমি ক্রয় কিংবা বিদেশে পাচার করেছেন। এছাড়া ভোজ্যতেল, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্পসহ বেশকিছু খাতের উত্থান-পতনে অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী লোকসানে পড়েছেন। ফলে ব্যাংকগুলোর চট্টগ্রামের অনেক শাখা দেউলিয়া হওয়ার অবস্থায় পড়েছে।
তবে চট্টগ্রামের বিদ্যমান ঋণখেলাপির সংস্কৃতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সমস্যা ও সংকট তৈরির কেন্দ্রস্থল হলো ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়। গোড়ায় সংকট থাকলে শাখা-প্রশাখা নিয়ে আলোচনা করে লাভ নেই। ব্যাংকে বড় গ্রাহক ও ঋণখেলাপিদের দাপট দিন দিন বাড়ছে। এটি ঠিক, চট্টগ্রামের কিছু বড় গ্রুপ এ মুহূর্তে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। তবে শুধু চট্টগ্রামের ঋণখেলাপিদের পৃথক করে বিশ্লেষণের সুযোগ নেই।
খেলাপি ঋণবিষয়ক টাস্কফোর্সের বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্যমতে, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ৬৪১ কোটি ৫১ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংকের। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে চট্টগ্রামে ন্যাশনাল ব্যাংকের বিতরণকৃত ৭ হাজার ২১১ কোটি টাকার মধ্যে ৩ হাজার ৬৪১ কোটি ৫১ লাখ টাকাই খেলাপি। সে হিসাবে বন্দরনগরীতে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৫০ দশমিক ৪৯ শতাংশই চলে গেছে ঋণখেলাপিদের পকেটে। এর মধ্যে অবলোপনকৃত ঋণ ৮১৪ কোটি ২১ লাখ, আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার ঋণে ও শ্রেণীকৃত ঋণ ৮৪৪ কোটি টাকা।
২ হাজার ৩৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণীকৃত ৮৩৫ কোটি, অবলোপনকৃত ৩৮২ কোটি, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা ৮২১ কোটিসহ মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৩৯ কোটি টাকা।
একই সময় পর্যন্ত চট্টগ্রামে সাউথইস্ট ব্যাংকের ১ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ৪ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ১ হাজার ১৫৪ কোটি টাকার ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকটির শ্রেণীকৃত ঋণ ১৫৫ কোটি ও অবলোপনকৃত ঋণ ২৮৮ কোটি টাকা।
চট্টগ্রামে ১ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের। এর মধ্যে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ৬৭০ কোটি টাকা। এছাড়া মন্দমানের খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকটি অবলোপন করেছে ৮৬৩ কোটি টাকার ঋণ।
চট্টগ্রামে ১ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে ব্যাংক এশিয়ার। এর মধ্যে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা ঋণ রয়েছে ৬০৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটির অবলোপনকৃত ৪৯৬ কোটি ও শ্রেণীকৃত ৩৯২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে।
অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের চট্টগ্রামে খেলাপি ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৩১৮ কোটি, এবি ব্যাংকের ১ হাজার ২০৮ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ১ হাজার ১০ কোটি, রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ৫৩ কোটি, পূবালী ব্যাংকের ৯৮৭ কোটি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮৩ কোটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ৯৩২ কোটি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ৭৭৩ কোটি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৭৪৯ কোটি ও ইস্টার্ন ব্যাংকের ৬৮৬ কোটি টাকা। এর বাইরে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ৬৬৩ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৬১৫ কোটি, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫০১ কোটি ও এনসিসি ব্যাংকেরও ৪৭৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে চট্টগ্রামে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭১৯ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫৭২ কোটি ও জনতা ব্যাংকের ৪৫৩ কোটি টাকা।
ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রামে বড় অংকের বিনিয়োগ করে দেশের প্রথম সারির সব ব্যাংকই বিপত্তিতে পড়েছে। চট্টগ্রামে নতুন বিনিয়োগের কোনো পরিবেশ আর অবশিষ্ট নেই। ব্যাংকের টাকায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বড় হয়েছেন। ওই ব্যবসায়ীরাই শেষ পর্যন্ত ব্যাংককে বিপদে ফেলেছেন।
ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র হওয়ায় চট্টগ্রামের শাখাগুলোকে প্রধান কার্যালয় থেকে লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া হয় জানিয়ে এ ব্যাংকার বলেন, ওই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়েই ব্যাংকাররা ভালো-খারাপ সবাইকে এক করে ফেলেছেন। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ব্যাংকারদেরও এক্ষেত্রে দায় রয়েছে। দুই দশক ধরেই চট্টগ্রামে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি চলছে। হঠাৎ করে ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াও বিপর্যয়ের একটি কারণ। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
চট্টগ্রামে যেসব ব্যাংকের কিছুটা সহনীয় মাত্রায় খেলাপি ঋণ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম উত্তরা ব্যাংক, বন্দরনগরীতে যাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৫২ কোটি টাকা। এছাড়া শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১৮৩ কোটি, ওয়ান ব্যাংকের ২৬৪ কোটি, যমুনা ব্যাংকের ৩২২ কোটি, আইএফআইসির ১১৫ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ১৪৮ কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ২৭৬ কোটি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ১৩০ কোটি ও ব্র্যাক ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে চট্টগ্রামে।
খেলাপি ঋণসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে শুধু চট্টগ্রামের শাখাগুলো থেকে নেয়া ঋণের হিসাব করা হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানের শাখা থেকে নেয়া ঋণকে এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশ ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানের ব্যাংকের শাখাগুলো থেকে বড় অংকের ঋণ নিয়েছেন। সে ঋণগুলো বিবেচনায় নিলে এ অংকের পরিমাণ বহুগুণ বাড়বে।
গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ ২৫ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকার আটটিই চট্টগ্রামের। এ আট প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮৮৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্সের। নূরজাহান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান জাসমির ভেজিটেবল অয়েলের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৪৭ কোটি টাকা। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মেসার্স সিদ্দিক ট্রেডার্সের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ৪২৮ কোটি, ইয়াছির এন্টারপ্রাইজের কাছে ৪১৫ কোটি, লিজেন্ড হোল্ডিং লিমিটেডের কাছে ৩৪৭ কোটি, ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের কাছে ৩৩৮ কোটি, নূরজাহান সুপার অয়েলের কাছে ৩০৪ কোটি ও সালেহ কার্পেটের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮৭ কোটি টাকা। তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা