চন্দ্রজয়ের গল্প

আপডেট: আগস্ট ১, ২০১৯, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

জাহাঙ্গীর সুর


প্রতি বছর ৩.৭৮ সেন্টিমিটার দূরে সরে যাচ্ছে চাঁদ। কিন্তু পৃথিবীর একমাত্র এই কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে মানুষের কৌতূহল এতটুকু কমেনি। ২০ জুলাই ১৯৬৯ ‘সুন্দর এই পৃথিবী’র বাইরে ভিন্ন কোনো মহাজাগতিক বিশ্ব হিসেবে চাঁদে প্রথম পা পড়েছিল মানুষের। চাঁদে পা রাখা প্রথম মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের নিল আর্মস্ট্রংয়ের মতে, ‘একজন মানুষের জন্য সেটা ছিল ছোট্ট একটা পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য ছিল বিরাট অগ্রগতি।’ চলতি মাসের ২০ জুলাই চন্দ্রজয়ের ৫০ বছর পূর্তি নানাভাবে উদযাপন করেছে বিশ্ববাসী।
চাঁদ আমাদেরই একটা অংশ। এবং সে কারণেই মানুষের পূর্বজাত বা আদিমানবেরা চাঁদের সঙ্গে মনের মিলও খুঁজে পেয়েছিলেন। চাঁদের সৃষ্টি নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে। উল্লেখযোগ্য একটি ভাবনা হলো: সূর্য সৃষ্টি হওয়ার পর আদি সৌরজগতে ‘থিয়া’ নামে একটি গ্রহ ছিল। আকারে মঙ্গলগ্রহের মতো। পৃথিবীর সঙ্গে সেই গ্রহের সংঘর্ষে চাঁদের জন্ম হয়েছিল। চাঁদের উদ্ভবে ভূমিকা থাকায় ওই গ্রহটার নাম রাখা হয় থিয়া; গ্রিক পুরানে চাঁদের দেবী সিলিন, আর থিয়া হলো সিলিনের মা।
আজ আমরা মঙ্গলগ্রহে এমনকি আরো দূরের গ্রহে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখছি, সেই সাহসের জন্ম হয়েছিল ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। সেদিন আন্তর্জাতিক সময় রাত ৮টা ১৭ মিনিটে চাঁদে অবতরণ করে মনুষ্যবাহী পৃথিবীর প্রথম নভোযান ‘অ্যাপোলো-১১’। এর ভেতর ছিলেন কমান্ডার নিল আর্মস্ট্রং ও অবতরকযানের পাইলট এডউইন বাজ অলড্রিন। ওপরে মূল চন্দ্রযান উড়াচ্ছিলেন তাদের সহযোগী ক্রু মাইকেল কলিন্স। এর ছয় ঘণ্টা পরে প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের পৃষ্ঠে পা রাখেন আর্মস্ট্রং। ১৯ মিনিট পরে তাকে অনুসরণ করেন অলড্রিন।
চাঁদে মানুষ পাঠানো সহজ কাজ ছিল না মোটেও। অ্যাপোলো প্রকল্পে বিশ্বের চার লাখ মানুষের নিরলস শ্রম ও মেধার গৌরব জড়িয়ে রয়েছে চন্দ্রজয়ের ইতিহাসের সঙ্গে। এদের মধ্যেই পড়েন তিন নভোচারী- আর্মস্ট্রং, অলড্রিন আর কলিন্স। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশ বন্দর থেকে স্যাটার্ন ফাইভ রকেটে করে তাদের ওড়ানো হয়েছিল, ১৬ জুলাই। চারদিনের মাথায় অ্যাপোলো-১১ নভোযানে চেপে তারা পৌঁছে যান চাঁদের কক্ষপথে। আঙিনায় নামার জন্য মূল নভোযান থেকে আলাদা হয়ে যান দুজন; ‘ইগল’ নামের অবতরকযানে চড়ে ১৩ মিনিটেই তারা ছুঁয়ে ফেলেন চাঁদের মাটি। কলিন্স কক্ষপথেই ঘুরতে থাকেন, অভিযান শেষে আর্মস্ট্রং আর অলড্রিনকে তো ফিরিয়ে আনতে হবে। তারা ‘আপন বাড়ি’ পৃথিবীতে ফিরে এসেছিলেন ২৫ জুলাই।
কলিন্সের মতো মোট ছয়জন নভোচারীর ‘গোপন যাতনা’-তারা চাঁদে গিয়েও নিরাপদে নভোচারীদের ফিরিয়ে আনার জন্য চাঁদের মাটিতে নামতে পারেননি।
প্রশান্তির সাগরে : আর্মস্ট্রং আর অলড্রিন যেখানে নেমেছিলেন, চাঁদের সেই অঞ্চলকে বলা হয় মারে ট্র্যাংকুইলিতাতিস। ল্যাটিন এই কথার মানে ‘প্রশান্তির সাগর’। ১৬৫১ সালে ইতালির দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী এই নামকরণ করেন। ফ্রানচেস্কো গ্রিমালদি এবং জিওভান্নি বাতিস্তা রিচলি ‘আলমাজেসতুম নোভুম’ নামে চাঁদের মানচিত্রে এই নামটা ব্যবহার করেন।

স্বর্গে ‘অভাবনীয় নির্জনতা’ : পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসাবে চাঁদে পা রাখা আর্মস্ট্রং তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন, মানুষের এই ক্ষদ্র পদক্ষেপটি মানব সভ্যতাকে বহুদূর এগিয়ে রাখল। আর ইগল চন্দ্রযান থেকে বেরিয়ে অলড্রিন চাঁদের বিস্তীর্ণ সৌন্দর্য দেখে বলেছিলেন, ‘অভাবনীয় নির্জনতা’।
তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিচার্ড নিক্সন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি চাঁদে ফোন করেছেন। ল্যান্ডফোনে তিনি আর্মস্ট্রংদের সঙ্গে যে আলাপ করেছিলেন, তাও সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল টেলিভিশনে। নিক্সন নভোচারীদের বলেছিলেন, পৃথিবীবাসী তাদের জন্য গর্বিত, কারণ, ‘তোমরা যা করে দেখিয়েছ এতে স্বর্গ এখন থেকে মানুষের জগতের অংশ হয়ে গেছে।’
ওরা যদি বেঁচে না ফিরতেন : চাঁদে সফল অবতরণ নাও হতে পারত। যদি ইগল অবতরণকালে বিধ্বস্ত হতো, তাহলে নির্ঘাত মারা যেতেন কিংবা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হতেন আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন। আর সেরকম হলে প্রেসিডেন্ট নিক্সন কী বক্তব্য রাখতেন, তাও আগে থেকে ঠিক করা ছিল। নিক্সনের নির্দেশনা মোতাবেক ভাষণলেখক উইলিয়াম স্যাফায়ার সেই বক্তব্য লিখে রেখেছিলেন। স্যাফায়ার নিজেই ১৯৯৯ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি তুলে ধরেন। লিখিত ভাষ্য অনুযায়ী, নিক্সন তাহলে বলতেন, ‘নিয়তিই লিখে রেখেছিল, যারা শান্তিতে চাঁদে অভিযানে যাবে, তারা চিরশান্তিতে চাঁদেই রয়ে যাবেন।’
প্রেসিডেন্ট নিক্সন আর যা বলতেন, ‘এই দুই সাহসী মানব, নিল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন, ভালোই জানতেন যে, তাদের উদ্ধারের কোনো আশা থাকবে না। কিন্তু তারা এও জানতেন, তাদের আত্মত্যাগের মধ্যে মানবসভ্যতার জন্য আশা রয়েছে। আরো মানুষ অ্যাপোলো নভোচারীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। এবং তারা ঠিকঠাক পৃথিবীতে ফিরেও আসবে। কিন্তু আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন ছিলেন প্রথম এবং তারাই আমাদের হৃদয়ে সযতনে থাকবেন।’
স্যাফায়ারের লেখা ওই ভাষ্য শেষ হতো এভাবে, ‘রাতে যখন লোকে চাঁদের পানে চেয়ে দেখবে, তারা জানবে, আকাশে আরেকটা জগত আছে যা চিরদিন মানবজাতির।’
মৃত্যুমুখ থেকে বারবার বেঁচে ফেরা : অ্যাপোলো-১১ নভোযানে চড়ে চাঁদে যাওয়ার বছরখানেক আগে প্রায় মারাই যাচ্ছিলেন নিল আর্মস্ট্রং। ১৯৬৮ সালের ৬ মে। চাঁদে অবতরণকারী গবেষণাযানে তিনি পরীক্ষামূলক বৈমানিক হিসেবে ছিলেন। হাউসটনে প্রোপেল্যান্ট বিপর্যয়ে ফ্লাইটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন তিনি। যানটি মাটির দিকে ধেয়ে পড়তে থাকে। ভূপৃষ্ঠ থেকে নয় মিটার ওপরে আর্মস্ট্রং প্যারাশুট নিয়ে লাফ দেন। যানটি মাটিতে পড়েই বিস্ফোরিত হয়। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান তিনি।
১৯৫১ সালে আর্মস্ট্রংয়ের বয়স তখন ২১ বছর; কর্মরত মার্কিন নৌবাহিনীতে। উত্তর কোরিয়ার আকাশে যুদ্ধবিমান উড়াচ্ছিলেন। এমন সময় প্রতিপক্ষের বিমানঘাতী বিস্ফোরণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তিনি প্যারাশুট নিয়ে লাফ দেন। থাকেন অক্ষত। এরপর কোরীয় যুদ্ধে তিনি ৮০টি মিশনে বিমান ওড়ান। এরকম আরো পাঁচবার আর্মস্ট্রং মৃত্যুর দোয়ার থেকে বেঁচে ফিরেছেন। প্রতিবারই মার্কিন সরকারের বিমান বা নাসার কোনো যানের দুর্ঘটনায়।
আর্মস্ট্রংয়ের জন্ম ১৯৩০ সালের ৫ আগস্ট। ২০১২ সালের ২৫ আগস্ট তার জীবনাবসান হয়।
এবার গন্তব্য নক্ষত্র : এডুইন অলড্রিনের জন্ম ১৯৩০ সালের ২০ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। তার বড় দুই বোন তাকে ‘ব্রাদার’ বলতে পারত না, বলত ‘ব্রাজার’। পরে সংক্ষিপ্ত রূপে ১৯৭৯ সাল থেকে এডুইন অলড্রিন ‘বাজ’ নামটা গ্রহণ করেন। চন্দ্রজয়ের এই অনুভূতি তিনি ভাগ করে নিয়েছিলেন ১৯৯৮ সালের এক সাক্ষাৎকারে। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আহ্বান করেছিলেন, ‘এবার গন্তব্য হোক নক্ষত্র।’
এডুইন অলড্রিন মহাশূন্যকেই ক্যারিয়ার হিসেবে দেখতেন। তবে এটাই যে ভবিষ্যতের সব আশা-ভরসা ছিল তেমন নয়। স্কুলে পড়ার সময় কল্পবিজ্ঞানের গল্প নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছেন। বন্ধু এড হোয়াইট জেমিনি মহাকাশযানের অভিযাত্রী হিসেবে নির্বাচিত হলে তিনি অনুপ্রাণিত হয়ে নাসার অ্যাপোলো প্রোগ্রামে সম্পৃক্ত হন।
বাজ অলড্রিন আর নিল আর্মস্ট্রং ছিলেন অ্যাপোলো-৮-এর বিকল্প ক্রু। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে অ্যাপোলো-৯ ও অ্যাপোলো-১০-এর জন্য ইতিমধ্যে ক্রু নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল। ফলে অ্যাপোলো-৮-এর বিকল্প ক্রু যারা ছিলেন তারা অ্যাপোলো-১১-এর ক্রু নির্বাচিত হন। সেই দলে নতুন যোগ হন মাইক কলিন্স।
চাঁদ থেকে পৃথিবী দেখা সম্পর্কে বাজ অলড্রিন বলেন, ভরা পূর্ণিমার রাতে পৃথিবী থেকে চাঁদকে যত বড় দেখায়, চাঁদের মাটি থেকে আমাদের এই পৃথিবীকে তার চেয়ে ৪ গুণ বড় দেখায়। চাঁদ থেকে আমি পৃথিবীকে দেখেছি নিকষ কালোর ভেতর যেন দীপ্তিমান পাথর। তিনি আরো বলেন, আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে চাঁদের মাটির কোনো মিল নেই। ওখানে প্রাণের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। পুরো ভূমি যেন পাউডারের সাগর। এছাড়া ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের পাথর-নুড়িপাথরের চাদর যেন বিছানো আছে চাঁদের গায়ে।
চাঁদে হাঁটাহাঁটির পর থেকে লুনার মডিউলে চড়ে মূল যানে ওঠাটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অন্তত বাঁচা-মরার প্রশ্নে। কিন্তু ফেরার সময় লক্ষ্য করি, এডুইন অলড্রিন বলেন, ইঞ্জিনের একটা সার্কিট কাজ করছে না। মহা মসিব্যৎ। শেষে লেখার জন্য ব্যবহৃত একটি কলম দিয়ে আমরা সার্কিটটা আবার ঠিকঠাক করি। (চলবে)