চরবাসী মানুষের কষ্টগাথা || শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট প্রকট

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৮, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব, চর আষাড়িয়াদহ থেকে ফিরে


শিশুটি গুরুতর অসুস্থ। অগত্যা উপায় না পেয়ে খাটিয়ায় করে গ্রাম থেকে কাদাপানি ভেঙে পদ্মার তীরে নিয়ে এসেছেন স্বজনরা। নেয়া হবে শহরের হাসপাতালে। নদী পারাপারের জন্য অপেক্ষা-সোনার দেশ

এখানে সকাল হয় প্রতিদিনিই। সূর্যও অস্ত যায় একইভাবে। কিন্তু এখানকার মানুষদের জীবনযাত্রার কোনো পরিবর্তন আসে না। সেই একই সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি। তবে ভোরটা এখানে অদ্ভুত। পাখির কিচির-মিচির শব্দে ঘুম ভাঙে বাসিন্দাদের। নগরকেন্দ্রিক জীবন থেকে যেখানে বাবুই পাখির বাসা অন্তর্ধান নিয়েছে, সেখানে এই অঞ্চলে ঠিকই ঝুলতে দেখা যায় বাবুই পাখি বাসা। নিজ হাতে গড়া হলেও এদের জীবন বাবুই পাখির বাসস্থানের মতোই নড়বড়ে। একটু ঝড়-বৃষ্টিতে ভেঙে পড়ে। প্রতিবছর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় তাদের আবাসস্থল।
বলছিলাম ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের মানুষদের কথা। গোদাগাড়ী উপজেলার একটি ইউনিয়ন। গোদাগাড়ীর বিদিরপুর থেকে এক ঘণ্টায় পদ্মা নদী পার হয়ে সেখানে পৌঁছাতে হয়। শান্ত সুনিবিড়। ছবির মতো। পুরো ইউনিয়নটাই নদীর ধার ঘেঁষে। আরেক পাশে ভারতীয় সীমান্ত। ইউনিয়নের ভেতরেই রয়েছে বিশাল বিল। উঁচু জমি। সেইসব জমিতে সব ধরনের কৃষি পণ্যই উৎপন্ন হয়। গ্রামের মানুষও বেশ পরিশ্রমী। চোর-ডাকাতের কোনো উৎপাত নেই। ছায়া সুনিবিড় গ্রামে মানুষরাও বেশ সহজ সরল। কিন্তু সেখানেও রয়েছে অন্তহীন সমস্যা। পুরো ইউনিয়নজুড়ে চলাচল উপযোগী কোনো রাস্তা নেই। একটি রাস্তা আছে তার অবস্থাও বেহাল। নেই স্বাস্থ্য সুবিধাও। একটু অসুখ-বিসুখে গ্রামের মানুষদের সাত/আট কিলোমিটার পদ্মা নদী নৌকায় পার হয়ে গোদাগাড়ীতে যেতে হয়।
ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, চর আষাড়িয়াদহে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। এই ইউনিয়নের প্রধান গ্রামগুলো হলো, বোয়ালমারী, দিয়াড় মানিকচর, চর ভুবনপাড়া, আষাড়িয়াদহ, পানিপার, আষাড়িয়াদহ নতুন গ্রাম, কানপাড়, নওশেরা, হনুমান্তনগর উল্লেখযোগ্য। নয়টি ওয়ার্ড নিয়ে ইউনিয়ন। এর মধ্যে ১,২,৩ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে চলাচল উপযোগী কোনো রাস্তা নেই। সম্পূর্ণটাই কাঁচা রাস্তা। সেই রাস্তাগুলো একটু বৃষ্টি হলে হাঁটু সমান কাদা জমে।
ওই ইউনিয়নে সাহেবনগর নামে একটি সীমান্ত ফাঁড়ি রয়েছে। সেখানে পৌঁছাতে হলে ভাঙাচোরা, এবড়ো থেবড়ো ও কাদা ভেঙে পৌঁছাতে হয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা নদীর তীর থেকে সীমান্ত ফাঁড়িতে পৌঁছান মোটর সাইকেলযোগে। ভাঙাচোরা, এবড়োথেবড়ো রাস্তায় মোটর সাইকেলেই অভ্যস্ত তারা। আর একটি যানবাহন চলে ওই রাস্তায় তা হচ্ছে ট্রলি (শ্যালো ইঞ্জিন চালিত যানবাহন)। ট্রলি করে সীমান্ত ফাঁড়ি কিংবা ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছানো যায়।
এলাকাবাসীর জানান, নদীর তীর থেকে সাহেবনগর সীমান্তে যেতে একটি মাত্র বাহন এই ট্রলি। এছাড়া ভাড়ায় মোটরসাইকেলও পাওয়া যায়। পুরো বর্ষাকালজুড়ে এই অবস্থায় থাকে রাস্তার। দীর্ঘ সময় রাস্তা মেরামতও হয় না। তবে বিলের উপর এক কিলোমিটার রাস্তা পুরো সিমেন্ট ঢালাই রয়েছে। সেই রাস্তাগুলো ভাঙে না।
চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সানাউল্লাহ জানান, রাস্তাগুলো মেরামতের জন্য কোনো টেন্ডার হয় না বললেই চলে। যেটুকু হয় তা খুবই যৎসামান্য। আবার ইউনিয়নের মোট নয়টি ওয়ার্ডের চারটিতে কোনো রাস্তাই নেই।
চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের বাসিন্দাদের আর একটি প্রধান সমস্যায় ভুগতে হয়Ñ তা হচ্ছে চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তি। চিকিৎসা সেবা নেই বললেই চলে। চিকিৎসাসেবা পেতে চরাঞ্চলের মানুষদের যেতে হয় পদ্মী নদী পার হয়ে সেই গোদাগাড়ীর প্রেমতলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কিংবা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। যদিও ওই ইউনিয়নে রয়েছে একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও দুইটি কমিউনিটি ক্লিনিক। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি প্যারামেডিক ডাক্তার বসেন। তিনি প্রতিদিন পদ্মা নদী পার হয়ে চরাঞ্চলের মানুষদের চিকিৎসাসেবা দিতে যান। তিনি চিকিৎসা দিলেও মেলেনা প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। সরকারিভাবে চাহিদার তুলনায় খুবই যৎসামান্য ওষুধ দেওয়া হয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে। ফলে ওষুধ কিনতে ঠিকই তাদের পার হতে হয় পদ্মা নদী। পাশ করা এমবিবিএস ডাক্তার মেলে না তাদের। তাই সামান্য একটু গুরুতর রোগ দেখা দিলে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তাদের ঠিকই ছুটতে হয় প্রেমতলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কিংবা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে এখানে নারীদের গর্ভকালীন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বলতে কিছুই নেই। বিশেষ করে বিয়ে পরবর্তীতে নারীরা যখন গর্ভবর্তী হন, তখন কোনো চিকিৎসা সেবাই পান না। তখন জীবন হাতে নিয়েই তাদের সময় পার করতে হয়। অনেকের জীবনাবসানও ঘটে। প্রসবকালীন সময়ে তাদের জীবন হাতে নিয়েই পৌঁছুতে হয় শহরের হাসপাতালে।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সানাউল্লাহ জানান, এখানে যে দুইটা কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে তাতে যৎসামান্যই চিকিৎসা দেয়া হয়। গর্ভবতী নারীদের কোনো চিকিৎসাসেবাই নেই এখানে। তখন গোদাগাড়ী কিংবা প্রেমতলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যাওয়া ছাড়া আর কোনো ভরসা নেই। অনেক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তখন গর্ভবতী নারীকে।
ভুবনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার আলী বলেন, পরিস্থিতি এত ভয়াবহ যে, কেউ অ্যাকসিডেন্ট করলে কিংবা একটু পড়ে গিয়ে হাঁটু ভেঙে গেলে চরে চিকিৎসার পাওয়ার উপায় নেই। রাত একটা হোক, দুইটা হোক, এখন পদ্মা নদীতে তুফান চলছে, তারপরও রাজশাহী ছাড়া কোনো উপায় নাই। কোনো চিকিৎসা নেই এখানে।
নওশেরা গ্রামের বাসিন্দা ইয়াছিন আলী বলেন, এখানে মাত্র একজন ডাক্তার রয়েছেন। তা-ও সপ্তাহে মাত্র দুই দিন আসেন। আর যারা ভিজিটর হিসেবে আসে, তারা সকাল ১০টার সময় এসে দুপুর দুইটার দিকে চলে যায়। ওষুধও পাওয়া যায় না। একদিন ওষুধ দিয়ে বলে আর কোনো ওষুধ নাই। আগে গরুর গাড়ি ভর্তি করে ওষুধ আনা হতো, এখন কোনো ওষুধই আসে না। যেটুকু ওষুধ আসে তা-ও চিকিৎসকরা বিক্রি করে খেয়ে নেয়।
ইউনিয়নে বিদ্যালয়ের সংখ্যাও অপ্রতুল। যে কয়টা বিদ্যালয় আছে সেখানে শিক্ষক সংকটও প্রকট। ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়নের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে মোট ৯টি আর উচ্চ বিদ্যালয় আছে দুইটি। কোনো কলেজ নেই।
চর আষাড়িয়াদহের একটি প্রধান উচ্চ বিদ্যালয় হচ্ছে চর আষাড়িয়াদহ কানপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার। জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলো ২১৯ জন। আর এসএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করেছে ১২০ জন। অথচ এদের পাঠদানের জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৯ জন। অস্থায়ীভাবে শিক্ষক রয়েছে দুই জন। পদ শূন্য রয়েছে মাত্র দুইজন শিক্ষকের। অর্থাৎ অনুপাতে একশো জন শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একজন শিক্ষক।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজগর আলী জানান, যেসব শিক্ষক আছেন তাদের নিয়েই আমরা বিদ্যালয়টি চালাই। পাঠদান করি। কোনো অসুবিধা হয় না।
আরেকটি প্রধান সমস্যা রয়েছে চরাঞ্চলের মানুষদের জীবনে। তা হচ্ছে বাল্যবিবাহ। তবে শিক্ষার বিস্তৃতি ও জনপ্রতিনিধিদের তদারকির কারণে অনেকটাই কমে গেছে বাল্যবিবাহ।
মো. সানাউল্লাহ জানান, আগে প্রচুর বাল্যবিবাহ হতো। কিন্তু শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ায় বাল্যবিবাহ আর আগের মতো নেই। এছাড়া আমরা নিয়মিত ওয়ার্ডের মেম্বারদের নিয়ে মনিটরিং করার কারণেও বাল্যবিবাহ অনেকটা কমে গেছে। এখন যেটুকু বাল্যবিবাহ হয় তা প্রধানত গোপনেই হয়ে থাকে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রকট সমস্যা থাকলেও চরাঞ্চলে বেশ ভালো ফসল উৎপন্ন হয়। ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি, পাটসহ প্রায় সবধরনের ফসলই উৎপাদন হয়। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন তারা। অনেক সময় অতিরিক্ত খরচ করেই নদীর ওপারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেন উৎপন্ন ফসল।