চরম অনিরাপদ বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম || গ্যালারির চাবি জামায়াত-শিবিরপন্থী কর্মচারির হাতে!

আপডেট: মার্চ ১২, ২০১৯, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


দর্শনার্থীরা ব্যাগ নিয়ে অনায়াসেই মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন-সোনার দেশ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের গ্যালারি ও প্রবেশ দরজার সকল চাবি তৃতীয় শ্রেণির এক কর্মচারি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তার বাড়িতেই চাবি থাকে। সেখান থেকে চাবি এনে সকালে মিউজিয়াম খোলা হয়, বিকেলে আবার তার বাড়িতে চাবি রেখে আসতে হয়। এই কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, গভীর রাতেও তিনি গোপনে মিউজিয়ামে প্রবেশ করে থাকেন। মিউজিয়ামে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। ফলে, মিউজিয়ামে মূল্যবান প্রত্ননিদর্শন সম্পূর্ণ অনিরাপদে রয়েছে।
জামায়াত-শিবির কর্মী হিসেবে পরিচিতি ওই কর্মচারী চার দলীয় জোট সরকারের আমলে গণনিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের অন্যতম (৫৪৪-এর কর্মচারী নামে খ্যাত)। মিউজিয়ামের পাশেই তার বাড়ি। অভিযোগ আছে, অজ্ঞাতনামা লোকদের নিয়ে তার রয়েছে বিশাল সিন্ডিকেট। ‘আমি প্রশাসনের লোক, যা বলব তাই হবে’-এই বলে সে দাপট দেখিয়ে থাকে। তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করে না।
একটি সূত্র জানায়, প্রয়াত পরিচালক ড. এম. সুলতান আহমদকে সে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার কথার বাইরে গেলে বহিরাগতদের দিয়ে পরিচালককে হুমকি দেয়া হতো। পরিচালককে জিম্মি করে বৈদেশিক অনুদানে পাওয়া মিউজিয়ামের কোটি কোটি টাকার কাজের সকল কেনাকাটা হয়েছে তার মাধ্যমে। বর্তমান পরিচালক তার ভয়ে অস্থির, দৃশ্যত তিনিও জিম্মি হয়ে আছেন। তার প্রভাবে সম্প্রতি প্রগতিশীল দুইজন নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাকে (একজন উপ-রেজিস্ট্রার ও মিউজিয়ামের সচিব) মিউজিয়াম থেকে বদলি করা হয়েছে। মিউজিয়ামে জামাত-শিবিরের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখতে দুইজন জামাতি আদর্শের (একজন অবাঙালি উর্দুভাষী বিহারী পরিবারের সদস্য) কর্মকর্তা আড়ালে ওই কর্মচারীকে উৎসাহ যুগিয়ে থাকেন।
দীর্ঘ অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও অভিযোগে এসব তথ্য পাওয়া গেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত এই কর্মচারীর নাম মো. জাকির হোসেন। সে নিজেসহ তার পরিবারের সকল সদস্য জামাত-বিএনপির নেতা-কর্মী। জানা গেছে, মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে জাকির হোসেন নিম্নমান সহকারী পদে ২০০৪ সালে ১৯ এপ্রিল মিউজিয়ামে যোগদান করেন। মিউজিয়ামে এই পদ সৃজিত ছিল না। তার নিয়োগপত্রে ‘বিনা সৃজিত পদের বিপরীত’ উল্লেখ রয়েছে। অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া এই মাস্টাররোল কর্মচারী যোগদানের পরই সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ২০০৬ সালের ৫ ডিসেম্বর তার চাকরি স্থায়ী হয়। গত একবছর যাবত সে অবৈধভাবে পদোন্নতি লাভের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। বার বার তার ফাইল সিন্ডিকেট থেকে ফেরত আসে। কিন্তু গত ২ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভা থেকে তদ্বির করে পদোন্নতি পাশ করিয়ে নিতে সক্ষম হয় (সেকশন অফিসার)।
প্রকাশ যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. সুলতান আহমদ ২০১১ সালের ২ নভেম্বর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন এবং এই পদে বহাল থাকা অবস্থায় গত বছরের ২৯ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মেয়াদের পুরো সময়েই জাকির হোসেন একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার করে মিউজিয়ামে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিউজিয়ামের একজন কর্মচারী জানান, ‘প্রায়শই কিছু সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোক মিউজিয়ামে প্রবেশ করে পরিচালকের নিকট গিয়ে চাঁদা দাবি করতো। স্যারকে ফোনেও হুমকি দেয়া হতো। পরে জাকির সাহেব গিয়ে অনেক সময় টাকা দিয়ে মধ্যস্থতা করতেন। আবার অনেক সময় জাকির সাহেব ধমক দিয়ে ওদের তাড়িয়ে দিতেন। আসলে এরা জাকির সাহেবেরই লোক। পরিচালক স্যার যেন জাকিরের কথা মত চলেন এবং স্যারকে চাপে রাখার জন্য সে এই ঘৃণ্য কাজ করতেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ড. সুলতান আহমদের সময়ে আমেরিকা ও ভারত সরকারের কাছ থেকে অনুদানে প্রাপ্ত ৪ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে। সরকারি বিধি লংঘন করে বিনা টেন্ডারে এই কাজ করা হয়েছে। এই কাজে মিস্ত্রি, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট জনবল ঠিক করা এবং ইট, কাঠ, রড, টাইলস, মোজাইক সামগ্রী, বালু, সিমেন্ট, তৈজসপত্র, আসবাবপত্রসহ সকল সামগ্রী ক্রয় হয়েছে জাকিরের হাত হয়ে। লেনদেন হয়েছে তার মাধ্যমেই। লাখ লাখ টাকার ভুয়া বিল ভাউচার সে সংগ্রহ করতো। আরো অভিযোগ রয়েছে যে, মিউজিয়াম রং করানোর সময়ে সে একজন রাজমিস্ত্রির মাধ্যমে বিশাল অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়, যার কোনো তদন্ত হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাকির হোসেনকে ফোন দেওয়া হলে, সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে প্রথমে তিনি কথাই বলতে চাননি। একবার নামাজ পড়ার কথা বলেন আরেকবার বলেন ফোনে আরেকজনের সাথে কথা বলছেন। একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই বললে তিনি বলেন, ঢাকার এক সাংবাদিক তার বন্ধু সেকথা জানান। চাবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি এই বিষয় নিয়ে ডিরেক্টরের সাথে কথা বলেন। পরে তিনি ফোন কেটে দেন।
আর পরিচালক ড. মজিদ জানান, মূল ফটক ও গ্যালারির চাবি জাকিরের কাছে আছে। এটা পূর্ববর্তী পরিচালকের সময় থেকেই হয়ে আসছে। মিউজিয়াম ক্যাম্পাসের বাসায় ওঠার পরই তিনিই চাবির জিম্মাদার হবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মৃত্যুর কিছুদিন আগে পরিচালকের কাছ থেকে মিউজিয়ামের চাবি করায়ত্ত্ব করে নেয় জাকির হোসেন। বর্তমানে প্রত্ননিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছে ১১টি গ্যালরি ও আভ্যন্তরীণ বারান্দায়। এই ১১টি গ্যালারি, উত্তরের গোডাউন ভবন, অফিস কক্ষ ও সকল গেটের চাবির জিম্মাদার এই জাকির হোসেন। তার কাছে চাবি থাকার কারণে মিউজিয়াম অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। অফিস সময়ের বাইরে বিশেষ করে রাতে অবাধ যাতায়াতে কারণে নিরাপত্তার শঙ্কা আরও বেড়েছে। কারণ সে রাতে মিউজিয়ামে প্রবেশ করে ব্যাগে করে বিভিন্ন জিনিসপত্র বাসায় নিয়ে যায়। আনসার সদস্য তাতে বাধা দিলে তাদেরও হুমকি-ধামকি দিয়ে নীরব রাখা হয়। এমনকি কয়েকজন আনসার সদস্যকে সে হুমকি দিয়ে বদলি হতে বাধ্য করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মিউজিয়ামে প্রহরারত একাধিক আনসার সদস্য জানান, ‘তিনি রাতে মিউজিয়ামে প্রবেশ করে থাকেন, এটা নিত্যই ঘটে, এখানকার সকলেই জানে। আমরা নিরুপায়, বাধা দিলে আমাদেরকেই শাস্তি পেতে হয়, গালমন্দ শুনতে হয়।
ড. সুলতান আহমদের মৃত্যুর পর প্রায় ৮ মাস মিউজিয়াম পরিচালক শূন্য ছিল, এমনকি ভারপ্রাপ্ত হিসেবেও কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। পরে, রাজশাহী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. আলী রেজা মোহাম্মদ আব্দুল মজিদকে ২ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিতে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলে তিনি গত বছরের ১৭ নভেম্বর যোগদান করেন। পরিচালক শূন্য সময়ে জাকির হোসেন আরও বেশি বেপরোয়া আচরণ করেছে বলে অভিযোগে জানা গেছে।
নতুন পরিচালক ড. মজিদ যোগদানের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জাকির হোসেন তাকে এক ধরনের জিম্মি করে ফেলে। চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পরিচালক যোগদানের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে লিখিতভাবে কর্মবণ্টন করেন, কিন্তু কর্মবণ্টনের চিঠি ইস্যুর আগেই জাকির হোসেন পরিচালককে চাপ সৃষ্টি করেন স্থায়ী অগ্রিম (পি.এ) হিসাবের দায়িত্ব তাকে দেয়ার জন্য। প্রশাসনের এক কর্মকর্তার নাম ধরে বলেন ‘এখনই ওনাকে জানাব’ বলে হুমকি দিলে পরিচালক হিসাবের দায়িত্ব জাকির হোসেনকেই দিয়ে দেন। জানা গেছে, মিউজিয়ামের সচিবকে সেখানকার জামায়াত-শিবির চক্র ৮ বছর ধরে কক্ষচ্যুত করে রাখে। পরিচালক যোগদানের পরদিনই তাকে যৌথভাবে একটি কক্ষে বসার ব্যবস্থা করে তাকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেন এবং সাচিবিক দায়িত্ব পালনের মৌখিক আদেশ দেন। কিন্তু একদিনের মধ্যেই পরিচালককে দিয়ে আবার সচিবকে কক্ষচ্যুত করা হয় এবং এরপর সচিবকে বিশ^বিদ্যালয়ের মাকেটিং বিভাগে বদলি করিয়ে দেয়া হয়। সচিবের সাথে একজন উপ-রেজিস্ট্রারকেও বদলি করা হয়। পরিচালককে না জানিয়েই বদলির ঘটনা ঘটে, ফলে এখানেও তিনি হতাশ হন। জাকির হোসেন অসত্য তথ্য প্রচার করে বদলিতে ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মিউজিয়াম অনুরাগী একজন কর্মকর্তা ও একাধিক কর্মচারী জানান, ‘মিউজিয়ামের তীব্র জনবল সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে। মিউজিয়ামের বিপন্ন অবস্থা বাইরে থেকে অনুধাবন করা যায় না।
এমনকি দর্শনার্থীরা তাদের ব্যাগ বহন করে গ্যালারির অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। বাইরে ব্যাগ রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। ব্যাগ ভেতরে নিয়ে যাওয়ায় গ্যালারিও অনেক অনিরাপদে পড়ে।