চলনবিলে শুরু হয়েছে বিনা হালে রসুন আবাদ

আপডেট: নভেম্বর ২৩, ২০১৭, ১১:২৩ অপরাহ্ণ

গুরুদাসপুর প্রতিনিধি


চলনবিলে আমন ধান কাটার পর অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে চলছে রসুনের বীজ রোপণের কাজ। রসুন চাষকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের নারী-পুরুষরা কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছেন-সোনার দেশ

চলনবিলের পানি নামছে। জেগে ওঠা জমিতে কাঁদাজলে চলছে আমন ধান কাটা। আমন ধান কাটার পর অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে চলছে রসুনের বীজ রোপণের কাজ। রসুন চাষকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের নারী-পুরুষরা কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় শ্রমিক ছাড়াও বহিরাগত শ্রমিকদের দিয়ে চাহিদা মেটাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষক। পুরুষরা মাঠে রসুন রোপণের কাজ করলেও কৃষক বধূরা বাড়িতে বসেই রসুন ভাঙার কাজ করছেন। রসুনের জমিতে একই সঙ্গে দুই ফসল পাওয়ায় গত প্রায় এক দশক ধরে এই প্রথায় রসুন আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। ফলে চলনবিল অঞ্চলে বিনা হালে রসুন চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কৃষকদের কাছে।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে- এ বছর চলনবিলের নাটোর জেলায় ৫৬ হাজার ৭শ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছিল। ধান কাটার পর সেসব জমিতে চলছে রসুনের আবাদ। চলতি মওসুমে নাটোরের গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম, সিংড়াসহ সাতটি উপজেলায় ২৫ হাজার ৭শ ৯৫ হেক্টর জমিতে রসুন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অধিক জমিতে রসুন চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সার্বিকভাবে চলনবিল অঞ্চলের গুরুদাসপুর, সিংড়া, বড়াইগ্রাম, তাড়াশ, চাটমোহরসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে বিনা হালে রসুন চাষের সম্ভাবনা দেখছে কৃষি অধিদফতর। এরইমধ্যে নাটোরে ১১ হাজার ৩শ হেক্টর জমির চাষ সম্পন্ন হয়েছে।
কৃষকরা জানায়, মাঠে মাঠে চলছে আমন ধান কাটার কাজ। আমন কাটার পর পরই ওই জমিতে রোপন করা হচ্ছে রসুনের বিজ। চলতি মওসুমে প্রতি বিঘা রসুন চাষে বীজ বাবদ ৭ হাজার, সার-কীট নাশক বাবদ ৩ হাজার ৫শ, জমি প্রস্তুত-রোপন বাবদ শ্রমিক খরচ ৬ হাজারসহ কৃষকের সার্বিক ব্যয় হচ্ছে ১৮-২০ হাজার টাকা। এছাড়া ক্ষুদ্র প্রান্তিক চাষিদের একবিঘা জমিতে (বর্গা) লিজ বাবদ ১৪ হাজার টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে অধিক খরচে রসুন আবাদ করলেও দর পতনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক।
কৃষক বধূরা জানায়- রসুন চাষকে কেন্দ্র করে গাঁয়ের নারীরা রসুন ভাঙার কাজ করছেন। এতে তাদের প্রতি মণ রসুন ভাঙার মুজুরি দেওয়া হচ্ছে ১৫০ থেকে ২শ টাকা। একমণ রসুন ভাঙতে সময় লাগে দুই দিন। চলনবিল অঞ্চলের কয়েক হাজার নারী রসুন ভাঙার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
বিনা হালে রসুন চাষ করতে আমন কাটার পর ধানের খড় তুলে জমি প্রস্তুত করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় সার-কীট নাশক দিয়ে কাদার ওপরে শুরু হয় রসুন রোপণ। রোপণকৃত রসুন ধানের খড় বা কচুরীপানা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। ঢেকে দেয়ার এক সপ্তার মধ্যই রসুনের চারা গজায়। তবে রসুনে লোকসান এড়াতে সাথী ফসল হিসেবে বাঙি চাষের জন্য রসুনের জমিতেই দুই হাত অন্তর অন্তর আলাদা জায়গা রাখা হচ্ছে। এক জমিতে একই সময়ে সিমীত খরচে দুই ফসল পাওয়ায় কৃষকদের কাছে রসুন চাষ বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে।
গুরুদাসপুর উপজেলার চরকাদহ গ্রামের কৃষক নিজাম উদ্দিন জানালেন, এবছর ৫ বিঘা জমিতে রসুন চাষ করছেন তিনি। রসুনের সাথী ফসল হিসেবে ৫ বিঘা জমিতেই বাঙি আবাদ করবেন। কৃষক আবদুল মালেক জানান, তিনি চলতি বছরে ৪ বিঘা জমি বর্গা (লীজ) নিয়ে রসুন আবাদ করছেন। বিগত কয়েক বছর ধরে রসুনে ভাল ফলন হলেও আশানুরুপ দাম না পাওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা। মাঝে মাঝে দাম বাড়লেও বেশিরভাগ সময় রসুনের দরপতন ঘটে। কৃষিতে খরচ বাড়ায় গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে প্রতি বিঘায় কিছুটা বেশি খরচ হচ্ছে।
নাটোর কৃষি বিভাগের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন,- গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে চলনবিলের নাটোরে ১০ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে রসুন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে রসুন চাষ হবে। মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ