চলনিবেলর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট: মে ৩, ২০১৭, ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

নাটোর অফিস


নাটোরের চলনবিলে উজান থেকে নেমে আসা ঢল আর বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মাঝে সরকারি ত্রাণ বিতরণের তালিকা তৈরিতে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে আত্মীয়-স্বজনদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে জেলা প্রশাসনের হিসেবে বন্যার পানিতে আড়াই হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্তের কথা বলা হলেও ত্রাণ পাচ্ছে চার হাজার ৬শ কৃষক। তারপরও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম তালিকায় উঠে আসে নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে চলনবিল অধ্যুষিত সিংড়া ও গুরুদাসপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। বোরো ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, বাদামসহ অন্যান্যে ফসল তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চলনবিলের কৃষকরা।
জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, অসময়ের এই বন্যায় নাটোরের দুই উপজেলায় চারশ হেক্টর জমির ধান পুরো এবং আংশিক নষ্ট হয়েছে এক হাজার সাতশ হেক্টর জমির ফসল। আর মোট কৃষকের সংখ্যা নির্ণয় করা হয় দুই হাজার পাঁচশ জন।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে সরকারি সহায়তা প্রদানের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে তালিকা করতে বলা হয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের। আর এই কাজে সহায়তা করেন স্থানীয় সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষি বিভাগ। সেই নির্দেশ অনুযায়ী তালিকা তৈরির কাজ করেন তারা। কিন্তু সোমবার দুপুরে ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন অনেকে। এই সময় স্থানীয় ইউপি সদস্যেরাও তালিকায় অনিয়মের কথা গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে বলেন।
তবে তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া হচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করবেন। প্রথমে কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেন। এরপর কৃষি কর্মকর্তারা যে তালিকা তৈরি করেন সেই তালিকা ঠিক রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে পাশ করে নিতে হয়। তারপর সেই তালিকা চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানরা তালিকা তৈরিতে অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতি করেছেন বলেই অভিযোগ উঠেছে।
জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ বিভাগ সূত্র জানায়, জেলার চলনবিল অধ্যুষিত সিংড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে ৪ হাজার ২শ জন এবং গুরুদাসপুরে ৪শ জনের। এরমধ্যে গত সোমবার দুপুরে সিংড়ায় ৩শ জনের মাঝে এবং বিকেলে গুরুদাসপুরে ১৫০ জনের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে সিংড়ায় ৩০ কেজি চাল এবং পাঁচশ টাকা আর গুরুদাসপুরে ১০ কেজি চাল এবং পাঁচশ টাকা বিতরণ করা হয়।
তবে এর আগে ক্ষতিগ্রস্তের মাপকাঠিতে জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিংড়া উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ১১ টন চাল এবং ১ লাখ টাকা আর গুরুদাসপুর উপজেলায় ৪ টন চাউল ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।
ডাহিয়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আবদুল আহাদ বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এবং কিছু কিছু ইউপি সদস্যরা তাদের ইচ্ছেমতো তালিকা তৈরি করেছে। যার কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের সেই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সাইফুল ইসলাম, কামাল উদ্দিনসহ অনেকে বলেন, যাদের বন্যার পানিতে ধান তলিয়ে যায় নি তারাও ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় ত্রাণ পাচ্ছে। অথচ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। অনেকেই সরকারি এই ত্রাণের চাল বাজারে বিক্রি করে দিবে।
তবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করতে কোন অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতি হয় নি দাবি করে চলনবিলের সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এমএম কালাম বলেন, বন্যার পানিতে যাদের বোরো ধান তলিয়ে গেছে, সেই সব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি এমন কৃষকের নাম তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি।
সিংড়া উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, যথাযত নিয়ম মেনেই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল আহসান বলেন, প্রাথমিকভাবে ৩শ জন ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষককে ত্রাণ দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সকলকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তালিকা তৈরিতে কোন অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতি থাকলে, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, তালিকা তৈরি এবং ত্রাণ বিতরণে কোন অনিয়ম সহ্য করা হবেনা। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদেরই তালিকা তৈরি করে ত্রাণ দেয়া হবে। যদি এমন কোন অভিযোগ আসে সে বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ