চলে গেলেন মমতাজউদ্দীন আহমদ

আপডেট: জুন ১৪, ২০১৯, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


দোসরা জুন আমার অকৃতার্থ জীবনে কখনো সুখের বারতা বয়ে আনেনি। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পালা এবারের (২০১৯) দোসরা জুন আবার নতুন করে আমার চেতনাকে বেদনায় নীল করে দিয়ে গেল। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে রাজশাহী কলেজের তরুণ শিক্ষার্থী, কলেজ ছাত্রাবাসে তখনকার পূর্ববাংলার প্রথম শহিদ মিনার গড়া ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলির ভয়াল ২৫শের রাতের পূর্বাহ্নে চট্টগ্রামে স্বাধীনতাকামী লাখো জনতার সামনে ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ নাটকের সর্বময় কুশীলব মমতাজউদ্দীন আহমদ চলে গেলেন অনেকটা অনাদরে অবহেলায়।
১৯৫১ সালে মমতাজউদ্দীন উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। (জনান্তিকে বলে রাখি, শ্লাঘনীয় এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৯৭১-১৯৮১ একদশক শিক্ষকতার কিঞ্চিৎ অভিজ্ঞতার দায় এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিত থাকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার ঋণ শোধের অভিপ্রায়ে অকিঞ্চনের এই নিবেদন।) মেধাবী ছাত্র মমতাজউদ্দীন এই কলেজ থেকেই কৃতিত্বের সাথে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে বি.এ.অনার্স পাস করেন। একই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষকতায় প্রবেশ করে দীর্ঘসময় চট্টগ্রাম কলেজে অবস্থান করে নিজের অসামান্য যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানে দুটি সমৃদ্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেকে অধিকতর সমৃদ্ধ করেছিলেন।
সর্বনাশা দেশভাগ, গৌড়সংস্কৃতির শেকড়ের সন্তান, মমতাজউদ্দীনকে মহানন্দার উত্তরপার থেকে দক্ষিণপারে আসতে বাধ্য করে। সেই দুঃসহ স্মৃতি তিনি ৮০ বছর বয়স অতিক্রম করলেও ভোলেন নি। ২০১৬ সালের চাঁপাই উৎসব ডাইরেক্টরিতে স্মৃতি ঝাঁপি উন্মোচন করে বলেছেন : ‘মাত্র ষাট পয়ষট্টি বছর আগে ছিলাম দক্ষিণে। বাগান ছিলো, খেত-খামার ছিলো, বাড়ি ছিলো আর আমগাছ ছিলো। সব ফেলে এসে গেছি উত্তরের পারে ভোলাহাটে। বড় দুঃখ কান্না এসে যায়। জন্মভূমির জন্য কার না কাঁদে।” (সবার সেরা চাঁপাই, পৃষ্ঠা, ৫৩)
খাঁটি দেশপ্রেমিক এই মানুষটির হৃদয় আমৃত্যু দেশের মাটি আর সংস্কৃতির জন্য রোরুদ্যমান ছিলো। দেশ তাঁর কাছে কী পরিমাণ একমেবদ্বিতীয়ম ছিলো, তার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমার ঝুলিতে আছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে আমাকে টেলিফোন করেছেন, বলেছেন- আমি হাঁপিয়ে উঠছি। কখন দুঃখতাপদগ্ধ বাংলার মাটিতে ফিরে আসবো, তার দিন গুনছি।” এ যেন স্বর্গের অমৃত উপেক্ষা করে ‘মধুময় পৃথিবীর ধূলি’র প্রতি নিবিড় আকর্ষণ। অথচ দেশ তাঁকে এমন কিছু দেয়নি। অবশ্য সে সবের জন্য তিনি উষ্মা প্রকাশ করেন নি। হয়তো দীর্ঘশ্বাস ছিলো। কারণ কৃত্রিম কথাবাজরা স্বাধীনতা পদক পেয়ে যায়। তিনি তালিকাভুক্ত হলেন না।
একসময়ে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সুবাদে তিনি বহুল পরিচিত মুখ। তার ওপর মাধ্যমিক পর্যন্ত বাংলা পাঠ্য বইএ তাঁর লেখা সকল শিক্ষার্থীর কাছে তাঁকে পরিচিত করেছে। উপরন্তু তাঁর রচিত ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থখানি কৌতূহলী পাঠককে সঠিক ইতিহাসের পথে চালিত করবে। এই নিরাসক্ত দেশপ্রেমিক মানুষটি এ্যাপোলো হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। বড়ো মানুষদের আনাগোনার দৃশ্য মিডিয়ায় দেখা গেল না। সেই দুঃখের পাষাণভার লাঘবের জন্য অকৃতার্থের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। তিনি চলে গেলেন, আমার দোসরা জুনের তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোর সাথে আর একটি বেদনার অভিজ্ঞতা সংযোজন করে।
‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাও’Ñ আপ্তবাক্যটি তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেলেন। বাঙালি সংস্কৃতি আর স্বাধীনতার মূলনীতি থেকে তিনি বিচ্যুত হন নি। সরকারি চাকরি করার ঠুনকো সুবাদে তিনি বিরুদ্ধ শক্তি আর বিশ্বাসের কাছে মাথা নোয়ান নি। নিজের রক্তকণিকায় বাঙালির চেতনা ধারণ করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, বাঙালির বিশ্বাসকে সৃজনশীলতার মাধ্যমে হাতে কলমে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। তাঁর রচিত ও অভিনীত নাটকগুলো যাঁরা দেখেছেন, তারা অবশ্যই সহমত হবেন।
একাত্তরের নয়মাসের নিষিদ্ধনিঃশ্বাসের অবরুদ্ধ বংলাদেশ ছাড়তে তাঁকে বাধ্য করেছে। পঁচাত্তরের জাতীয় ট্রাজেডির পর দ্বিতীয় পর্যায়ে অবরুদ্ধচেতনার বাংলাদেশে তিনি অবস্থান করেছেন। সরকারি চাকরি তাঁকে করতে হয়েছে; কিন্তু পদ-পদবির লোভে তিনি বাতিলের সাথে হাত মেলাতে পারেন নি। ৩৪ বছর কর্মরত থাকার পর ১৯৯২ সালের অবসর নিয়েছেন সরকারি চাকরি থেকে- তবে তাঁর সৃজনশীল ধারা থেমে থাকে নি। অবসরের ফাঁকে তিনি বিজ্ঞানওয়ালাদের ফাঁদে পা রেখেছিলেন, মুক্তচিন্তা প্রকাশের জন্য। কারণ ছাত্রজীবন থেকে তিনি বাম ঘরাণার মানসিকতা ধারণ করতেন। তাদের হঠকারিতা উপলব্ধি করে অচিরেই বেরিয়ে এসেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু প্রদর্শিত মূলধারায় সম্পৃক্ত ছিলেন। দোসরা জুন তাঁর জীবনাবসান হলো প্রায় শূন্য হাতে। শেষ হয়ে গেল রসধারা। জনক-জননীর অনন্ত শয্যার পাশে এখন তিনি শায়িত।
আজ পেছনের পানে ফিরে দেখলে আফসোস হয়, হয়তো উপেক্ষা করতে না পেরে তাঁকে একুশের পদক দেয়া হয়েছিলো, তাই স্বাধীনতা পদকের ব্যাপারে স্তাবকরা তাঁর অবদানের কথা স্মরণে আনে নি। এমনকি উন্নত চিকিৎসার ব্যাপারে নড়ে চড়ে বসেনি। তারা না করুক ইতিহাস গোপনে গোপনে কাজ করে যাবে। অনাগত দিনের কালের পৃষ্ঠায় অঙ্কিত থাকবে বাঙালির মাতৃভাষার স্বাধিকার আদায় ও স্বাধীনতা এবং মুক্তির সংগ্রামে অকুতভয় সৈনিক হিসেবে তাঁর নাম। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা ছাড়া আর কী করতে পারি?
ইতিহাস মিথ্যা বলে না, খলেরা চিরকালই ক্ষমতার স্তাবকতায় আখের গুছিয়ে নেয় আর পদ-পদবিকে কলঙ্কিত করে। মমতাজউদ্দীন ছিলেন নির্ভেজাল মুক্তিকামী, তাই সে পথে ধাবিত হননি। রক্ষা করে গেছেন শুদ্ধাচারী বিবেককে।
এসেছিলেন ১৯৩৫ সালের আঠারোই জানুয়ারি মাসের কুয়াসার চাদর উন্মোচিত করে আলো হাতে। চলে গেলেন ২০১৯ এর দোসরা জুন শেষ জৈষ্ঠের অগ্নি¯œাত দিগন্তে। তার শূন্য হাতের কর্মধারা বেদনার বুকচিরে সান্ত¦নার দীপ শিখা হয়ে জ্বলতে থাকবে এবং জনকণ্ঠের পাতায় মুদ্রিত ‘হায়! উহারাও স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করিতেছে’ বাক্যটি সহসা সচকিত করে দিয়ে যাবে মুক্তিকামী বাঙালিকে।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ