বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আ’লীগের তীব্র কোন্দল : দ্রুত কাউন্সিল দাবি

আপডেট: December 6, 2019, 1:09 am

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি


চাঁপাইনবাবগঞ্জে আলোচিত আওয়ামী লীগের জেলা ও উপজেলার ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন না হওয়ার জন্য তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এমনকি বর্তমান সরকারের আমলে চাঁপাইনবাবগঞ্জে চোখে পড়ার মতো উন্নয়ন হলেও শুধুমাত্র নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে গত সংসদ নির্বাচনের পর এবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও আ’লীগের ভরাডুবি ঘটেছে। আ’লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ঘোষণায় এবারের সম্মেলনে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হবে, এ আশায় বুক বেঁধেছিল দলীয় কর্মীরা কিন্ত শেষ পর্যন্ত তিন ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আ’লীগের ত্রি-বার্ষিক সম¥েলন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় তারা হতাশায় ভুগছেন।
জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৫টি উপজেলা নিয়ে ৩টি সংসদীয় আসন। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শুধু মাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ শিবগঞ্জ আসনে আ’লীগের প্রার্থী বিজয়ী হয় কিন্ত বাকি ২ টি আসনে দলীয় কোন্দলের কারণে আসন ২টি হারায়। এছাড়া শিবগঞ্জে উপজেলায় নির্বাচিত আ’লীগ মনোনিত প্রার্থী সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে স্থানীয় সাংসদ ডা. সামিল উদ্দীন আহমেদ শিমুলের প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায় এতে দলীয় কর্মীরা দ্বিধাভক্ত হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় পক্ষের সঙ্গে হরহামেশাই মারামারির ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। উভয় পক্ষই পালটাপালটি শো-ডাউনও করছে। এমনকি চাঁপাইনবাবগঞ্জে কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনে দ্বিতীয় পক্ষ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।
ছাত্রাজিতপুর ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি গোলাম রাব্বানী ছবি বলেন, সর্বশেষ শিবগঞ্জ উপজেলা আ’লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের শেষের দিকে। এতে গোলাম রাব্বানী এমপি সভাপতি ও অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
উজিরপর ইউনিয়ন আ’লীগ সভাপতি দুরুল হোদা অভিযোগ করেন গোলাম রাব্বানী ও আতাউর রহমান প্রায় ৩০জন বিভিন্ন দল থেকে আসা কর্মীদের বিভিন্ন পদে অন্তর্ভুক্ত করেছিলো, পরে প্রকৃত দলীয় কর্মীদের নিয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা আ’লীগ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় জেলা আ’লীগ। এ নির্দেশ অমান্য করে অধ্যাপক আতাউর রহমান আর কোনো কমিটি জমা দেননি বরং গোলাম রাব্বানী ও আতাউর রহমান তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শিবগঞ্জ উপজেলার শক্তিশালী আ’লীগকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দেয়। এছাড়া অধ্যাপক আতাউর রহমান গত ইউপি নির্বাচনে পাঁকা ইউনিয়নে তার ছেলেকে নির্বাচন করিয়ে নৌকার প্রার্থীকে পরাজিত করেন।
শিবগঞ্জ পৌর আ’লীগের সভাপতি আতিকুল ইসলাম টুটুল খান বলেন, দীর্ঘদিন আ’লীগের সম্মেলন না হওয়ায় শিবগঞ্জ উপজেলা আ’লীগ দিন দিন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
গত সংসদ নির্বাচনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ ও ৩ আসনে একক প্রার্থী থাকলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে দলীয় প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য মুহা. জিয়াউর রহমান এবং বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য মুহা. গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রার্থীতা প্রত্যাহার করলেও কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। নির্বাচনী ফলাফলে ধানের শীষের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। এ ব্যাপারে সাবেক এমপি মুহা. জিয়াউর রহমান বলেন, সাবেক সাংসদ মুহা. গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের পকেট কমিটির নেতৃবৃন্দ নৌকাকে পরাজিত করার জন্য এমন কোনো কাজ নেই যা করেনি। পরে দলের হাইকমান্ডের কাছে মুহা. গোলাম মোস্তফা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। এরপর গত ২৪মার্চ গোমস্তাপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী হিসেবে জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি মো. হুমায়ুন রেজাকে মনোনয়ন দেয়া হয়। অন্যদিকে সাবেক এমপি মুহা. গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ইউনিয়ন আ’লীগ নেতা আফসার আলী খানকে দাঁড় করিয়ে তার পক্ষে কাজ করেন। যদিও সেই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মো. হুমায়ুন রেজা বিজয়ী হন। এরপর থেকে খোদ আওয়ামী লীগের তৃণমূলের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠে। এব্যাপারে প্রবীণ আ’লীগ নেতা ডা. মুহা. ইয়াসিন আলী বলেন, মুহা. গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস পুনরায় পকেট কমিটি করার লক্ষে চুপিচুপি প্রকৃত কর্মীদের বাদ দিয়ে পকেটের লোকদের সদস্য পদ নবায়ন ও নতুন সদস্য সংগ্রহের রশিদ প্রদান করছেন। তিনি আ’লীগের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী বিএনপি-জামায়াতের চরদের ব্যাপারে সজাগ থাকার জন্য সকল নেতা-কর্মীদের আহবান জানিয়েছেন। অবশ্য এব্যাপারে সাবেক সংসদ সদস্য মুহা. গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে দলীয় নেতা কর্মীরা জীবনবাজি রেখে কাজ করেছেন। তবে প্রার্থী পরিকল্পনা মাফিক কাজ না করায় তার পরাজয়।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনেও নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মো. হারুনুর রশিদ, নৌকার প্রার্থী আবদুল ওদুদকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। অন্যদিকে গত ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও আ’ লীগের নৌকার প্রার্থী মো. নজরুল ইসলামের ভরাডুবি ঘটেছে। এই নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী মো. তসিকুল ইসলাম তোসি ৯৭ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এবং আ’লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী জিয়াউর রহমান তোতা ৩৯ হাজার ৫৬৬ ভোট এবং আ’লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম ৩২ হাজার ১১৪টি ভোট পেয়ে ৩য় হন। এমনকি এ উপজেলা নির্বাচনে আ’লীগের প্রভাবশালী কোনো নেতার ভোট কেন্দ্রে নৌকার প্রার্থী ১ম স্থান অধিকার করতে পারেনি।
ভোলাহাট উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ডা. আশরাফুল হক চুনু বলেন, ভোলাহাটে আ’লীগের কোনো গ্রুপিং লবিং নেই। কাউন্সিল হচ্ছে এমন খবরে নেতার্কীদের প্রাণ ফিরে পেলেও হঠাৎ কাউন্সিল না হওয়ায় তারা কিছুটা হলেও হতাশ। সেই সাথে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দেন প্রবীণ এই নেতা। তিনি মনে করেন, দলীয় শৃঙ্খলা ফিরতে আওয়ামীলীগ সব সময়ই জেলায় ভাল অবস্থানে থাকবে।
এ বিষয়ে নারী সংসদ সদস্য ফেসদৌসি ইসলাম জেসি বলেন, দলকে আরো গতিশীল করতে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্মেলন না হওয়ার জন্য তিনি জেলা আ’লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়ী করে বলেন, তারা সময় পেলেও সম্মেলন আয়োজন করতে পারেন নি। সেই সঙ্গে এ বিষয়ে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট কারণও দলীয় কর্মীদের বলেন নি।
সম্মেলন না হওয়া প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওদুদ বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তে আপতত সম্মেলন হচ্ছে না। এখানে ৪৫টি ইউনিয়ন একদিন করে প্রতিটি ইউনিয়নে ঘুরলেও ৪৫ দিন সময় লাগত। সময় স্বল্পতার কারণেই সবকিছু করা সম্ভব হয়নি। তবে দলীয় কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ