চাকা ঘুরে ভাগ্য ফেরে

আপডেট: মার্চ ২, ২০১৯, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

তানজিমা আকতার


স্বধীনতা পূর্বকালে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী টমটম ছিল মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা। কালের বিবর্তনে গণমানুষের বাহন হিসেবে টমটম বিলুপ্ত-প্রায়। নগরীতে হাতেগোনা কয়েকটি টমটম চলেÑতবে সচারচর চোখে পড়ে না। নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা উৎসব-আয়োজনে শখের বসে টমটমে আরোহণ করে। দরিদ্রগোছের কিছু মানুষ টমটমে যাত্রী বেশে গন্তব্যে যায়। রাজশাহী টমটম এখন শুধুই ঐতিহ্য। তাই রাজশাহীর বাইপাস সড়কের মুখে রাজশাহী সিটি করপোরেশন একটি টমটমের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে। এখন ওই মোড়টির নামকরণ হয়েছে ‘টমটম চত্বর’ কথ্যরূপে ‘ ঘোড়া চত্বর’। তবে ভাস্কর্যে ফলকে চত্বর বানানটি ভুল করে চত্ত্বর লেখা রয়েছে।
রাজশাহীতে বর্তমানে ৫ / ৬টি টমটমের অস্তিত্ব আছেÑ টমটম চালকগণই এ তথ্য জানিয়েছেন। তাদেরই একজন মোহাম্মদ আব্দুল সাত্তার (৫৫)। তিনি ৩০ বছর ধরে টমটম চালান। বাবা জনডেস চৌধুরীর কাছেই তার টমটম চালনা শেখা। প্রথম দিকে শখের বসে টমটম চালাতেন । বাবা মারা যাওয়ার পর সেই শখকে পেশায় পরিণত করেন সাত্তার। অভাবের সংসারে পড়াশোনা করতে পারেন নি। কিন্তু ৫ ছেলেমেয়ের প্রত্যেককেই তিনি পড়ালেখা করিয়েছেন টমটম চালিয়েই। বড় ছেলে অসিম (২০) চট্টগ্রামে একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। পেশায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। ছেলে আর্থিক সহযোগিতা করেন বাবাকে। ছোট ছেলে জসিম (১৬) উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা করছে।
আব্দুল সাত্তারের তিন মেয়েÑ সাথী, কামেলা ও বিথী। তারা সকলেই বিএ পাস করেছে। সব মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। দ্ইু জামাই সরকারি চাকুরে, অন্যজন কৃষিকাজ করেন ।
আব্দুল সাত্তার ২৮ বছর বয়সে বিয়ে করেন। স্ত্রী মনোয়ারা বেগম। তিনি দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। সাত্তার জানান, ‘ও (মনোয়ারা বেগম) সবই করে, না হলে তো ছেলেপেলেকে মানুষ করা যেত না। ও-ই ছেলেপেলেকে বাসাতে পড়িয়েছে, স্কুলে কেমন পড়লÑ দেকভাল করেছে।’
ছেলেমেয়েদের মানুষ করবেন ভেবেই তাঁরা দুজনে সিদ্ধান্ত নেন যে, তাঁদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে হবে। তাঁর পেশা নিয়ে ছেলেমেয়েরা অস্বস্তিবোধ করে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেউই করে না, সবাই তাকে সহযোগিতা করে।’
রাজশাহীর নিউ কসবায় সাত্তার পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। দু’বিঘা জমিÑ একপাশে আধাপাকা বাড়ি। বাকি জমিতে ধান চাষ করেন। ফসল বেশি হলে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্তটুকু বিক্রি করেন। সাত্তার জানান, টমটম চালায়ে দিনে ১২শ’ টাকা আয় হয়, কোনো দিন ৪শ’ টাকা। আবার কোনোদিন কিছুই আয় হয় না।
আগের ঘোড়াটি মারা যাওয়ায়, নতুন বাদামি রঙের ঘোড়াটি সাত্তার দুবছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট থেকে ছাব্বিশ হাজার টাকায় কেনেন। প্রতিদিন ঘোড়ার পেছনে খরচ হয় ৩০০ টাকা। ঘোড়াকে খাওয়ানো, গোসল করানো সবই নিজ হাতে করেন। অটোরিক্সার ফলে ঘোড়াগাড়ির চাহিদা খুবই কমে গেছে। সাত্তার বলেন, ‘ ঘোড়াগাড়িতে যাত্রীরা শখ করে উঠে, না হলে না। বছর দশেক আগেও এই গাড়ির চাহিদা ছিল ।’
আব্দুল সাত্তার প্রতিদিন সকালে ৮টার দিকে গাড়ি নিয়ে বের হন, বাড়ি ফেরেন সন্ধ্যা ৬/৭ টার দিকে। সাধারণত শিমলা পার্ক এর আশেপাশেই তিনি যাত্রীর জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করেন ।
এই গাড়ির বদৌলতে স্বচ্ছলভাবে সবই করেছেন, তাই পেশা বদলের কথা ভাবেন নি তিনি। তবে তাঁর পরে গাড়ি চালানোর কেউ নেই, এটা তার জন্য কষ্টেরও।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ