চিকিৎসক ধর্মঘট : আদালতের মন্তব্য সেবা কেন অধর্ম হবে?

আপডেট: জুলাই ১৩, ২০১৮, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

‘ভুল চিকিৎসা’ নিয়ে একটি রিট আবেদনের শুনানিতে চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা বন্ধ রাখার প্রসঙ্গ ধরে হাই কোর্ট বলেছে, চিকিৎসকদের হরতাল ডাকা ‘অন্যায়’।
গত মার্চে চুয়াডাঙ্গায় ‘ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টার’র চক্ষু শিবিরে অস্ত্রোপচারে ‘চোখ হারানো’র ঘটনায় করা রিট আবেদনের উপর রুলের শুনানিতে সোমবার বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের হাই কোর্ট বেঞ্চের এই মন্তব্য আসে।
আদালত বলেছে, “ডাক্তার দেবতা নন। ভুল হবে সেটা স্বাভাবিক। ভুলটা অন্যায় নয়। কিন্তু ভুলটা জাস্টিফায়েড করার জন্য হরতাল ডাকা হলে সেটা অন্যায়।”
এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দৈনিক সোনার দেশসহ দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে।
দেশের উচ্চ আদালত দেশের অনেক অসঙ্গতি ও অন্যায় চোখে আঙুল দিয়ে জাতিকে দেখিয়ে দিচ্ছেন। আদালত প্রতিকার পাওয়ার উপায়ও দিচ্ছেন। অর্থাৎ বর্তমান দুঃসহ ক্রান্তিকালে বিবেকের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আদালত দায়িত্বশীলদের পরিস্কার করে বলেছেন যে, “মানুষ বিপদে পড়লে তিন পেশার মানুষের কাছে যায়। পুলিশ, আইনজীবী ও ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। কিছু দুর্বৃত্তের কারণে যদি এই তিন পেশার পেশাদারিত্ব ধ্বংস হয়, তাহলে মানুষ বিপদে পড়বে।”
উল্লেখ্য, গত মার্চে চুয়াডাঙ্গায় ‘ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টার’র চক্ষু শিবিরের অস্ত্রোপচারে ২০ জনের ‘চোখ হারানো’র ঘটনায় গত ১ এপ্রিল রুল জারি করেছিল আদালত।
চোখ হারানো ২০ জনের প্রত্যেককে এক কোটি করে মোট ২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ কেন দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে।
২৯ জুন চট্টগ্রামের ম্যাক্স হসপিটালে এক সাংবাদিক তার তিন বছরের এক শিশু সন্তানকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গিয়েছিল। ম্যাক্স এমন চিকিৎসা প্রদান করেছে যে শিশু বাচ্চাটার দাঁত পর্যন্ত পড়ে গেছে আর অবশেষে শিশুটা মারা গেছে। হাসপাতালটির বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ আনা হয়। এর সঙ্গে জড়িত চিকিৎসকদের বিচারের দাবিও জানানো হয়। এরপর, চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে এক সরকারি তদন্তে মেয়েটির চিকিৎসায় অবহেলার প্রমাণ পায়। মামলা হয়েছে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারতো। কিন্তু চট্টগ্রাম বিএমএ নেতারা যেন তা হতে দেবেন না পণ করেছেন। একটি শিশুকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে হত্যা করার পর সমবেদনা জানানোর পরিবর্তে সাংবাদিকদের দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। সাংবাদিকদের পরিবারকে চিকিৎসা না দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। কী ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত!
ডাক্তাররা জাতির মেধাবী সন্তান। ডাক্তারগণ মেধার অগ্রাধিকার অংশে থাকতেও চান। এই চাওয়াটা অযৌক্তিক কিছু নয়। চিকিৎসা পেশার মহত্ব সে দাবি করতেই পারে। কিন্তু একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে কেন? মানুষকে ছাপিয়ে কোনো কিছুই এই বিশ্ব সংসারে নেই। মানুষকে যে বা যারাই ছাপিয়ে উঠতে চায়- সেটা ঔদ্ধত্যের, সীমালঙ্ঘনের। চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ সেই সীমালঙ্ঘনই করে থাকেন। তারা অসহায় রোগিদের বারবার জিম্মি করেন। এটা তো মনুষ্য আচরণ হতে পারে না। মহান পেশার ‘অগ্রাধিকার’ মেধাবী মানুষের এ অভব্য আচরণ মানায় না। এটা চিকিৎসা পেশার চরম লঙ্ঘন। এটা তো বোধের ব্যাপার। মানবিক না হলে সভ্য হওয়া যায় কী?
ডাক্তারগণ নিজেরাই তাদের মনগড়া প্রতিপক্ষ তৈরি করছেন। ফলে তাদের যে ভুল হয়, তা মানতেই চায় না। ভুলহীন মানুষ তো মানুষ নয়। এটা মোটেও বাঞ্ছনীয় নয়। পেশাদারিত্বটাই মূল কথা। এ ক্ষেত্রে রাগ-অনুরোগ, ক্ষোভ- বিদ্বেষ থাকতে নেই। থাকলে পেশাদারিত্বের সুনাম ক্ষুণœ হয়। আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনটা খুবই জরুরি। যেটা মানবিক আচরণ ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ