চড়ুই পাখির স্নান

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

তাপস চক্রবর্ত্তী


অন্তু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের বাসাটা একটু বেশ পুরনো। তাই বাসাটার দরজার ওপরে ভাঙা ভেন্টিলেটরের মধ্যে চড়ুই পাখির জোড়া বাসা বেঁধেছে। অন্তু পড়ার টেবিলে বসে চড়ুই পাখি দুটিকে লক্ষ্য করছিল। চড়–ই পাখি দুটি দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসে। তারা ভোর বেলা থেকে কিচির মিচির করে ডাকা ডাকি শুরু করে। সেই সুমিষ্ট ধ্বনি অন্তুর কানে এসে পৌঁছায়। সেই পাখির ডাকে অন্তুর ভোরে ঘুম ভেঙে যায়। অন্তু টেবিলে এসে বসে। খানিকক্ষণ গালে হাত দিয়ে চড়–ই পাখিকে দু‘চোখ ভরে দেখে। কী সুন্দর পাখি দুটি দেখতে! তারা দুজনে তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে, আর কিচির মিচির করে ডাকছে। অন্তু ঘরে গিয়ে কিছু চাল নিয়ে এসে চড়–ই পাখি দুটিকে খাওয়ানোর জন্য উঠানে ছড়িয়ে দিল। চড়–ই পাখি দুটি উড়ে এসে উঠানের মধ্যে বসল। একটি, দুটি করে চাল খেতে লাগলো। অন্তু ভাবল আমরা যখন খিদে পাই তখন আমরা ক্ষুধা দূর করার জন্য খাবার খাই। পাখি দুটিকেও খুবই খিদে লেগেছিল। তারা সব চালটুকু একটি, দুটি করে খেয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ পর অন্তু দেখলো পাখি দুটি কোথায় যেন উড়ে গেল। অন্তু ঘরের ভেতরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে সকালের নাস্তা সেরে আবার পড়ার টেবিলে গিয়ে বসল। চড়–ই পাখির বাসা একেবারে নিঃশব্দ। কোন সাড়া নেই। মনে হচ্ছে এখানে কোন পাখি থাকে না। অন্তু পড়ার টেবিলে বই বের করে একটি কবিতা পড়ছিল। কবিতাটির নাম স্বাধীনতার সুখ, লিখেছেন রজনীকান্ত সেন। স্বাধীনতার সুখ
বাব্ইু পাখিরে ডাকিয়া বলিছে চড়াই,
কুঁড়ে ঘর থেকে কর শিল্পের বড়াই!
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকার পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে।
বাব্ইু হাসিয়া কহে;সন্দেহ কি তায় !
কষ্ট পাই তবু থাকি নিজেরও বাসায়।
পাকা হোক তবু ভাই পরেরও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।
এই কবিতাটি পড়তে পড়তে অন্তুর বাবা এসে ঘরের ঝুল ঝাড়তে শুরু করল। ঝুল ঝাড়তে ঝাড়তে অন্তুর বাবা দরজার ওপরে ভেন্টিলেটরে কিছু খড় দেখতে পেলেন। অন্তুর বাবা সেগুলো বের করার চেষ্টা করতেই অন্তু কান্না শুরু করল এবং বলতে লাগল, “বাবু, তুমি ঐ চড়–ই পাখির বাসাটি ভেঙে দেবে না।” অন্তুর বাবা বলছেন, “দেখ অন্তু, এ রকম জায়গায় অনেক সময় পোকা-মাকড় বা সাপের আগমন ঘটতে পারে। তাই এটা রাখা নিরাপদ হবে না। আমি এই পাখির বাসাটা বরং ভেঙে ফেলি। অন্তু দৌঁড়ে গিয়ে তার বাবার পা চেপে ধরল এবং কাঁদতে কাঁদতে বলছে “বাবু, তুমি যদি ঐ চড়–ই পাখির বাসাটা ভেঙে ফেল তাহলে কিন্তু আমি তোমার সাথে কোন দিন কথা বলব না, এমনকি আমি কোন কিছু খাব না এবং লেখাপড়াও করব না। আমি জানি স্যার বলেছেন জীবের প্রতি দয়া করাও ধর্ম। অবলা জীবকে নাকি দয়া করতে হয়।” অন্তুর মুখে এমন কথা শুনে অন্তুর বাবার মনে দয়ার ভাব জাগ্রত হলো। তিনি মনে মনে ভাবছেন অন্তু তো ঠিক কথাই বলেছে। পাখির বাসা যদি আমরা ভেঙে ফেলি তাহলে তারা কোথায় বাসা বাধবে, কোথায় থাকবে? তাদেরও তো বাঁচার অধিকার বা ঠাঁই করে দিতে হবে। তারা অবলা জীব। তাদের সাথে এমন আচরন সত্যি একটা অমানবিক কাজ। তাই অন্তুর বাবা বলল, অন্তু ঠিক আছে তোমার চড়–ই পাখির বাসা আমি কোন দিন ভেঙে দেব না। জানি তোমার পাখি ও জীব-জন্তুর প্রতি খুবই ভালোবাসা আছে। আসলে সবকিছুই তো সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। তাই সৃষ্টিকে ভালোবাসলে তবে সৃষ্টিকর্তাকে ভালোবাসা হয়। অন্তু বলল,“বাবু, তুমি আমার খুবই পছন্দের চড়–ই পাখির বাসাটা ভেঙে না দিয়ে রেখে দিলে তার জন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। এ বলে অন্তু তার বাবাকে জড়িয়ে ধরল। অন্তুর বাবা অন্তুর পাখি প্রেমের পরিচয় পেয়ে অতি আনন্দিত হলো। অন্তুর বাবা কিছুক্ষণ পর অন্তুকে নিয়ে বাজারে গেল। পাখির জন্য নানা রকম খাবার কিনল। যেমনঃ গম, ধান, চালের গুড়া, সরিষা ইত্যাদি। অন্তু সেই খাবারগুলো নিয়ে বাবার হাত ধরে খুশি মনে বাড়িতে আসল। অন্তুর বাবা আর অন্তু দু’জনে মিলে সেই খাবারগুলোর মধ্যে থেকে কিছুটা খাবার উঠানের মধ্যে ছিটিয়ে দিল। চড়–ই পাখি দুটি তা দেখতে পেয়ে উড়ে এসে উঠানের উপর বসল এবং চারিদিকে একটু একটু করে দেখছিল। পাখি দুটি দেখছিল যে কোন বিপদ আছে নাকি। যখন দেখল যে কোন বিপদ নেই তখন পাখি দুটি মনের আনন্দে সেই চাল, সরিষা, গমের দানাগুলো খেতে শুরু করল। অন্তু চড়–ই পাখিদের জন্য বাজার থেকে খাবার নিয়ে এসে তা পাখিদের খাওয়াতে পেরে খুবই আনন্দিত হলো। অন্তুর মা পাখিদের জন্য একটা ছোট প্লেটে করে কিছু পরিষ্কার জল এনে উঠানে রাখল। চড়–ই পাখি খাবার খেয়ে ঐ পরিষ্কার জল পান করে এতে তাদের পেট ভরে যায়, তারপর পাখি দুটি তাদের বাসায় ফিরে আসে। অন্তু তার মাকে পাখিদের জল দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ দিল। অন্তু দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। মা অন্তুর পাশে ঘুমিয়ে আছে, বাবাও শুয়ে আছে। তারা সবাই দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছে। অন্তু কিছুক্ষণ পর উঠে এসে দেখে পাখির বাসায় কোন সাড়া শব্দ নেই। মনে হচ্ছে চড়–ই পাখি দুটিও বিশ্রাম নিচ্ছে তাদের ঐ ছোট পাখির বাসায়। অন্তু তাদের কোন বিরক্ত না করে সেও গিয়ে বিছানায় ঘুমোতে গেল। পাখির কথা চিন্তা করতে করতে অন্তুর ঘুম চলে এলো। সে মাকে জড়িয়ে ধরে কখন যে ঘুমিয়ে গেছে তা অন্তু বলতে পারে না। বিকেল বেলা অন্তুর ঘুম ভেঙে গেল। সে বিছানা থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে খেলতে যাবে বলে প্রস্তুত হচ্ছিল। অন্তুর বাবা আজ নাকি অন্তুকে পাশের মাঠে ক্রিকেট খেলতে নিয়ে যাবে। কারণ অন্তু ক্রিকেট খেলতে খুবই ভালোবাসে। সে ব্যাট, বল অন্যান্য খেলার সামগ্রী নিয়ে বাবার সাথে মাঠে খেলতে রওনা দেবে। এমন সময় অন্তু দেখতে পেল চড়–ই পাখিদের মধ্যে একটি পাখি মুখের মধ্যে করে দুই/একটি খড় কোথা থেকে যেন নিয়ে এসে বাসার মধ্যে ঢুকাচ্ছে। অন্তু বলছে বাবু দেখ দেখ চড়–ই পাখি কোথা থেকে খড় নিয়ে এসে বাসার মধ্যে ঢুকাচ্ছে। অন্তুর বাবা দেখে খুবই খুশি হলেন। অন্তু বলছে, “বাবু, ওরা খড় দিয়ে কি করবে?” অন্তুর বাবা বলছেন, “ওরা, খড় দিয়ে সুন্দর বাসা তৈরি করবে। কারণ ওদের সুন্দর ছোট ছোট বাচ্চা পাখি হবে তাই। ছোট ছোট বাচ্চা পাখি হবে! বাহ! কী মজা, কী মজা! আমি বাচ্চা পাখিদের খুব আদর করব। অন্তুর বাবা অন্তুকে বলছেন, “অন্তুু, তাড়াতাড়ি চল, ঐ দেখ বেলা যে প্রায় শেষ হয়ে এলো, কখন খেলবে? রাতের বেলা তো বল দেখাই যাবে না। আর বল দেখতে না পেলে তো বল হারিয়ে যাবে আর অন্ধকারে তো খেলাই যাবে না।” অন্তু বলছে ও তাই তো চল, চল আমরা তাড়াতাড়ি খেলতে যাই। অন্তু ও অন্তুর বাবা পাশের মাঠে ক্রিকেট খেলতে গেল। অন্তু পাড়ার ছেলেদের সাথে তার বাবাকে নিয়ে মজার খেলা ক্রিকেট খেলা খেলতে লাগল। যখন সন্ধ্যা নেমে এলো তখন অন্তু তার বাবার সাথে হাত ধরে বাড়িতে ফিরে এলো। বাড়িতে ঢুকতেই অন্তু দেখলো চড়–ই পাখি দুটো চুপচাপ বসে আছে। সে হাত, পা, মুখ ধুয়ে বাবার সাথে পড়তে বসল। অন্তুর বাবা অন্তুকে বলছেন, অন্তু তুমি পড়ালেখায় খুবই ভালো। গত বার্ষিক পরীক্ষায় তুমি প্রথম হয়েছো। এছাড়া স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় দেশগান, ছড়াগান, রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত এবং নাট্যাভিনয়েও তুমি শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিয়েছো। আমি তোমাকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখি। একদিন তুমি অনেক বড় হবে। দেশ ও জাতির কল্যাণ ও আমার মুখ উজ্জ্বল করবে। দেশের আদর্শ নাগরিক হিসেবে বড় হয়ে দেশ ও দশের সেবা করবে এ কামনা করি। সামনে তোমার পি. এস. সি পরীক্ষা। তাই লেখাপড়ায় তোমাকে অনেক সময় ব্যয় করতে হবে। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন পড়তে হবে। যদি তুমি আজকের পড়া কালকের জন্য ফেলে রাখ তাহলে তোমার পড়ালেখায় অনেক চাপ পড়বে। তাই আগামীকালের জন্য পড়া ফেলে না রেখে আজকের পড়া আজকেই করে রাখবে। যে কোন কাজ যতদ্রুত সম্ভব করে রাখবে তাহলে তুমি কাজে আনন্দ পাবে এবং অতিদ্রুত সফল হবে। অন্তু বাবার কাছে পড়ার বিষয়ে অনেক ভাল উপদেশ পেয়ে তা সঠিকভাবে পালন করবে বলে বাবার কাছে শপথ করল এবং অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশুনা করল। রাত যখন ৯ টা বাজে অন্তুর মা অন্তুকে ও তার বাবাকে ভাত খেতে ডাকছেন। অন্তু পড়ার টেবিলে বইগুলো সুন্দরভাবে গুছিয়ে বাবার সাথে টেবিলে ভাত খেতে গেল। ভাত খেয়ে অন্তু বাবা ও মায়ের সাথে ঘুমানোর জন্য বিছানায় গেল। অন্তুর মা অন্তুকে অনেক ভূতের গল্প শোনালেন। অন্তু ভূতের গল্প শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে গেছে তা আর বলতে পারে না। পরের দিন ভোর বেলা অন্তু চড়–ই পাখির কিচির মিচির ডাক শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠে। চড়–ই পাখি অন্তুর খুবই কাছের বন্ধু। কারণ প্রতিদিন চড়–ই পাখি কিচির মিচির করে ডেকে অন্তুর ঘুম ভেঙে দেয়। আজ সকালে অন্তুর ইচ্ছে হলো পাখি দুটোকে কাছে নিয়ে একটু আদর করবে। তাই অন্তু তার মাকে ডাকছে। ও মা, মা একটু কাছে আস না। অন্তুর মা তার ডাক শুনে অন্তুর কাছে আসলেন। অন্তু বলছে, “মা, আমাকে তুমি একটা জিনিস হাতে দেবে? মা বলছেন, কী জিনিস? অন্তু বলছে বল আগে দেবে তো? মা বলছেন, ঠিক আছে দেবো। অন্তু এবার বলল, মা, আমাকে ঐ পাখির বাসা থেকে চড়–ই পাখি দুটোকে ধরে নিয়ে এসে আমার হাতে দেবে? আমি প্রাণ খুলে তাদের কাছে পেয়ে একটু আদর করব। তারপর তাদের আবার ঐ পাখির বাসায় ছেড়ে দেব। মা বলছেন, অন্তু, পাখিরা তো ভয় করে। আমি যদি তাদের ধরতে যাই ওরা যদি ভয় পেয়ে বাসা থেকে চলে যায়? অন্তু বলছে, না ওরা উড়ে যাবে না। তুমি আমাকে ঐ চড়–ই পাখি হাতে এনে দাও। আমি একটু আদর করে আবার তোমায় দিয়ে দেব। তুমি আবার তাদের ঐ পাখির বাসায় রেখে দেবে। অন্তুর এমন চাওয়া ও আবদার শুনে মা আর থাকতে পারলেন না। অন্তুর মা পাখির বাসা থেকে চড়–ই পাখিদের ধরার জন্য একটা উচু টেবিল কাছে টেনে নিয়ে এলেন। সেই টেবিলে অন্তুর মা উঠে পাখির বাসার দিকে চোখ দিতেই চড়–ই পাখি দুটো ভয়ে উড়ে গেল। উড়ে গিয়ে গাছের ডালে বসল। পাখি দুটি কিচির মিচির করে জোড়ে জোড়ে ডাকছে। তারা মনে করছে তাদের বাসাটা বুঝি ভেঙে দেবে। চড়–ই পাখি দুটোর কিছুই করার নেই তারা শুধু দূর থেকে দেখেই যাচ্ছে। এদিকে অন্তুর মা পাখির বাসায় দেখলো সুন্দর দুটি চড়–ই পাখির বাচ্চা হয়েছে। সেই বাচ্চাগুলো ডানা ঝটপট করছে। অন্তুর মা পাখির বাচ্চাগুলোকে দেখে খুবই আনন্দিত হলো। আনন্দের সাথে বলল, “অন্তু, চড়–ই পাখির দুটো বাচ্চা হয়েছে! দেখতে কত সুন্দর! তারা উড়তে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। চড়–ই পাখির বাচ্চা হয়েছে শুনে অন্তুর আনন্দ রাখার জায়গা নেই। চড়–ই পাখির বাচ্চাগুলোকে দেখার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে পড়ল। অন্তু বলছে, মা, আমাকে ঐ পাখির বাচ্চাগুলোকে একটিবার দেখাও না মা। বাচ্চাগুলোকে দেখার আমার বড়ই শখ। অন্তুর মা সেই পাখির বাচ্চাগুলো হাতে করে নিয়ে নিচে নেমে এলেন। বাচ্চা দুটো অন্তুর হাতে দিলেন কিছুক্ষণের জন্য। অন্তু সেই বাচ্চাগুলোকে কতই না আদর করল। কোথায় রাখবে আর কোথায় না রাখবে তার জায়গা খুঁজে পায় না। মা বলছেন, অন্তু এগুলো ছোট বাচ্চা বেশি নাড়াচাড়া করা যাবে না। তাহলে ওদের ক্ষতি হতে পারে। আর এখন তো শীতকাল যদি ওদের কোন ভাবে ঠা-া লেগে যায় তাহলে বাচ্চাগুলো মরে যেতে পারে। তাই তুমি বাচ্চাগুলো আমাকে দিয়ে দাও। আমি ওদের বাসায় রেখে আসি। ওদের মা-বাবারা কতই না কষ্ট পাচ্ছে। অন্তু বাচ্চাদুটোকে তার মায়ের হাতে দিয়ে দিল। অন্তুর মা বাচ্চা দুটোকে আবার আগের মত ঐ চড়–ই পাখির বাসার মধ্যে রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ পর মা ও বাবা পাখিটা উড়ে এসে সেই পাখির বাসায় বসল। তখন পাখিদুটো তাদের বাচ্চাদের খাওয়াতে লাগল। অন্তু দেখলো চড়–ই পাখি দুটো তাদের ঠোঁট দিয়ে বাচ্চাদের ঠোঁটে নিজের ভেতরের খাবার বের করে দিচ্ছে। অন্তু দেখলো চড়–ই মা-বাবার তাদের বাচ্চাদের প্রতি কত ভালোবাসা। অন্তু বুঝতে পারল পাখিরা যেমন তার বাচ্চাদের খাইয়ে দিচ্ছে ঠিক তেমনি আমার মাও আমাকে খেয়ে দেয়, কত যতœ করে। সে বুঝতে পারল মা-বাবারা তার সন্তানের জন্য অবশ্যই ভালো কিছু করে। যেমন চড়–ই পাখি দুটো তাদের বাচ্চাদের জন্য কি রকম কষ্ট করে খাবার নিয়ে এসে সেই খাবার নিজের গলার ভেতর থেকে বের করে সেগুলো তাদের ছোট আদরের বাচ্চাদেরকে খাওয়াচেছ। তা দেখে অন্তুর মাতৃ ও পিতৃভক্তির ভাব জাগ্রত হয়। যা হোক আজ শুক্রবার স্কুল বন্ধ। অন্তুর বাবা একজন স্কুল শিক্ষক, মা গৃহিণী। আজ শুক্রবার তাই অন্তুর বাবা অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছেন। আর কার না ঘুমোতে ইচ্ছে করে এমন শীতের সকালে। চারিদিকে ঘন কুয়াশা। কতই না ঠা-া পড়েছে। তবে শুনেছি এবার নাকি প্রচ- ঠা-া যাচ্ছে। এতো ঠা-ায় পাখিরা কতই না কষ্ট পাচ্ছে। আমরা তো কত কাপড় পড়েছি, তবু যেন আমাদের ঠা-া যায় না। আর ঐ পাখি দুটো এবং তাদের বাচ্চাগুলো কিভাবে ঠা-া থেকে রক্ষা পাচ্ছে? মা বলছেন, অন্তু জানো পাখিরা কিভাবে ঠা-া থেকে রক্ষা পায়? অন্তু বলছে, মা এর উত্তর আমার জানা নেই। মা বলছেন, “শোন, ওদের গায়ে অসংখ্য পালক আছে । তা দিয়ে ওরা ঠা-া থেকে রক্ষা পায়। এভাবে কথা বলতে বলতে সকাল ১০টা বেজে গেল। মা বলছেন, অন্তু, ১০ টা বেজে গেল চল তোমাকে ¯œান করিয়ে দেই। আজ খ্বু ঠা-া পড়েছে। তাই তোমার জন্য চুলায় জল বসিয়ে দিয়েছি। সেই গরম জল দিয়ে তোমাকে ¯œান করিয়ে দেব। অন্তু বলছে , মা আমি ¯œান করব না। আমাকে কী ভীষণ ঠা-া লাগছে। অন্তু আজ ¯œান করবে না তাই মায়ের কাছে ছড়ার মাধ্যমে তা প্রকাশ করছে।

কী ভীষণ শীত !

চারিদিকে কী ভীষণ শীত! কনকনে ঠা-া,
গায়ে গুণে দেখি পরেছি কাপড় এক গ-া,
তবু যেন না যায় আমার শীতের ঠা-া।

তীব্র শীতে কাঁপছে সবাই যেন জবুথুবু,
গরিবের ঘরে ঐ খোকাটা একেবারে কাবু।

তীব্র শীতে গাছের পাখিরা আজ জড়সড়,
এবার শীত যাচ্ছে নাকি বড়।

বহিছে মৃদু মৃদু শৈত্য প্রবাহ,
জন জীবন যেন আজ দুর্বহ।

ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পথ, ঘাট, প্রান্তর,
রোগে, শোকে, দারিদ্রে কাঁদিছে সবার অন্তর।

কুয়াশার চাদরে চারিদিক ঢাকা,
চায়ের দোকানে লোক নেই একদম ফাঁকা।

ব্রঙ্কাইটিস, এ্যাজমা, হাঁপানি, ডায়রিয়া,
জ্বর, সর্দি, কাশি, আমাশয়,নিউমোনিয়া,
নানা রোগে কাবু আজিকার শিশুরা,
কত কষ্ট পায় শীতে ঐ বাড়ির বুড়ি-বুড়া।

আগুন জ্বালিয়ে সবাই বসে তাড়াতাড়ি,
আগুনে তাপায় হাত বসে গোল করে সারি।

সাবধানে থেকো এই বার্তা জানাই,
ছোট-বড়,বুড়ো-বুড়ি, খোকা-খুকি সবাই।

অন্তু তুমি খুব ভালো ছড়া বলতে পার। কিন্তু বাবা নিয়মিত ¯œান না করলে যে শরীর খারাপ হবে। আর শরীর খারাপ হলে যে তুমি অসুস্থ হবে। তখন পড়াশুনা এবং কোন কাজে মন বসবে না। অন্তু মায়ের কথা শুনে বলছে , ঠিক আছে মা তাহলে রোদ না উঠলে আমি ¯œান করব না। মা বলছেন , কবে রোদ উঠবে সেই অপেক্ষায় থাকবে? যদি তিন দিন ধরে রোদ না উঠে তাহলে কি তুমি তিন দিন ধরে ¯œান করবে না? অন্তু বলছে , আমি তাই করব। তিন দিনই ¯œান করব না। মা বলছেন, না বাবা, এরকম বলতে হয় না। এভাবে থাকলে শরীর খারাপ করবে। শরীর সুস্থ রাখতে হলে প্রতিদিন ¯œান করতে হয়। যদি ঠা-া বা শীত পড়ে তাহলে গরম জল দিয়ে হলেও ¯œান করতে হবে। ¯œান না করলে শরীর নানাভাবে খারাপ হবে। যা হোক অন্তুর মা অন্তুকে একরকম জোড় করেই গরম জল দিয়ে ¯œান করালেন। কিন্তু অন্তুর মা অন্তুকে ¯œান করানোর সময় মাথা ঠা-া জল দিয়ে ধুয়ে দিয়েছেন আর সম্পূর্ণ শরীর হালকা গরম জল দিয়ে ¯œান করিয়ে দিলেন। এদিকে অন্তুর বাবাও ¯œান সেরে ভজনালয়ে প্রভুর আরাধনায় ধ্যান-মগ্ন হয়ে আছেন। অন্তুর মা রান্না সেরে নিলেন খুব তাড়াতাড়ি। অন্তু বিরিয়ানী খুব পছন্দ করত। তাই অন্তুর মা অন্তুর জন্য আজ বিরিয়ানী রান্না করেছেন। বাসায় খাওয়ার জল নেই তাই অন্তুর মা অন্তুকে ও বালতি নিয়ে বাড়ির পাশের সাপ্লাই কলে জল আনতে গেলেন। তখন দুপুর একটা বাজে। বাইরে বের হয়েই দেখা গেল সূর্যের মুখ। কী সুন্দর মিষ্টি রোদ। এমন মিষ্টি রোদ গায়ে লাগাতে কার না মন চায়? এমন রোদ ছেড়ে বাসায় ঢুকতে ইচ্ছে করে না। অন্তু তার মাকে বলছে মা এমন রোদে একটু বসে গা গরম করে নেই। অন্তুর মা হাতে বালতি নিয়ে অন্তু সহ পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন সময় অন্তু দেখতে পেল তাদের বাসার ঐ চড়–ই পাখির জোড়া সাপ্লাই কলের পরিষ্কার জলে ¯œান করছে। সাপ্লাই কলের পরিষ্কার জল নিচে পড়ত। ইটের পাকা বাঁধাই করা জায়গায় ইটের ফাঁকে জমে থাকা পরিষ্কার জলে খুব আনন্দে চড়–ই পাখির ¯œান করার দৃশ্য দেখে অন্তু তার মাকে বলল, মা দেখ দেখ ঐ সাপ্লাই কলের নিচে চড়–ই পাখি দুটো ¯œান করছে। অন্তুর মা ও অন্তু চড়–ই পাখির এমন পরিষ্কার জলে ¯œান করতে দেখে বিস্মিত হয়ে গেল। পাখিরাও তাহলে পরিষ্কার জল পান করে এবং ¯œান করতে ভালোবাসে। অন্তুর মা বললেন, অন্তু দেখ তুমি তখন ¯œান করতে চাচ্ছ না, কিন্তু এখন তুমি নিজেই দেখ চড়–ই পাখিরাও ¯œান করে। কারণ তারাও শরীরকে ভালো রাখার জন্য, সুস্থ থাকার জন্য পরিষ্কার জল পান ও ¯œান করতে পছন্দ করে। চড়–ই পাখি দুটো ¯œান সেরে উড়ে গিয়ে পাশের গাছের ডালে গিয়ে বসল। তারা সেই ডালে বসে গায়ের যত জল ছিল তা অতি তাড়াতাড়ি গা ঝাড়া দিয়ে সেই জল ঝেড়ে ফেলল এবং রোদে নিজ শরীরকে শুকিয়ে নিল। অন্তু বলছে মা , আমরাও তো ¯œান সেরে নিজের শরীরকে রোদে শুকাচ্ছি। পাখিরাও তাই করছে। মানুষ ও পশু পাখির মধ্যে কত মিল দেখছি। কিছুক্ষণ পর চড়–ই পাখি দুটো উড়ে তার নিজ বাসায় চলে গেল। অন্তুও তার মায়ের সাথে সাপ্লাই কলের পরিষ্কার জল বালতিতে করে বাসায় নিয়ে এলো। চড়–ই পাখির পরিষ্কার জলে ¯œান করা দেখে অন্তু মনে করল তারাও মানুষের মত পরিষ্কার জলে ¯œান করে, খাবার গ্রহণ করে, বাচ্চাদের লালন-পালন করে, নিজ পরিবারকে নিয়ে স্বপ্নের বাসা বাঁধে। কিন্তু তাদের ভাষা আমরা বুঝতে পারি না কিন্তু তাদের কার্যাবলী আমরা বুঝতে পারি। অন্তুর মা অন্তুকে বলছেন, “বাবা অন্তু, আজকে তো দেখলে চড়–ই পাখির ¯œান? অন্তু বলল, হ্যাঁ, মা আমাকে খুব ভালো লেগেছে। মা বলছেন, “তাহলে কি তুমি আজ থেকে ঠিক সময় মত প্রতিদিন ¯œান করবে? অন্তু বলল, ‘হ্যাঁ মা, আমি আজ থেকে প্রতিদিন ঠিক সময় মত ¯œান ও খাবার খাব। তুমি আমার লক্ষ্মী মা। তুমি আমার শ্রেষ্ঠ মা। আমি তোমাকে ছেড়ে কোন দিন কোথাও যাব না। এখন থেকে আমি তোমার সব কথা শুনবো।