ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি কতটা যৌক্তিক, না নেপথ্যে অন্য উদ্দেশ্য?

আপডেট: অক্টোবর ১১, ২০১৯, ১:৪১ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সারা দেশ জুড়ে প্রতিবাদ- নিন্দা অব্যাহত আছে। হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিও উঠেছে। ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি অনেকেই সমর্থন জানাচ্ছেন, আবার কেউবা ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়Ñ অন পরামর্শও দিচ্ছেন। অবশ্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিটি নতুন কিছু নয়। ছাত্রদের মধ্যে কোনো সংঘাত বা আবরারের মত কোনো শিক্ষার্থী হত্যার শিকার হলেও এই দাবিটি ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার মান সুরক্ষার জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করাই কি জরুরি? সমস্যাটা কি রাজনীতির মধ্যে না রাজনীতির নামে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ দুর্বৃৃত্তায়নের মধ্যে? সমস্যা সমাধানে সমন্বিত চিন্তার দৈন্যতাটা থেকেই যাচ্ছে।
কেউ কেউ একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতি বন্ধের কথা বলছেন। কিন্তু এতে করে কীভাবে সুফল পাওয়া যাবে, সেটা পরিষ্কার নয়। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের রাজনীতি তো বহাল থাকবে। ভ্রষ্ট শিক্ষক যারা তারা যে ছাত্রদের তাদের স্বার্থ হাসিলে ব্যবহার করবে নাÑ তারই বা কী নিশ্চয়তা আছে। যখন রাজনৈতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ প্রশাসনিক সব পদে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া হয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় ভাবাপন্ন প্রার্থীকেই নিয়োগে সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে দক্ষতা, যোগ্যতা কিংবা সক্ষমতার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব বহন করে না। ফলে যারা নিয়োগ পান তারা দলবাজি করেন কিংবা পরিস্থিতি তাদের দলবাজ হিসেবে চিহ্নিত করে। সে ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে সমস্যার কতটুকু সমাধান হবেÑ যারা ছাত্র রাজনীতি বন্ধকে সমর্থন জানাচ্ছেন তাদের ভেবে দেখা দরকার। কারণ দলীয় ব্যবস্থাপনাটা টিকে থাকলে স্বার্থ হাসিলের পদ্ধতি পরিবর্তন করা খুব কঠিন বিষয় হবে না। সে ক্ষেত্রে ওই ছাত্রদেরই অন্য উপায়ে ব্যবহার করা যাবে। বরং বর্তমানে যে ভারসাম্য টুকু আছে সেটাও ভেঙ্গে পড়বে। ইতোমধ্যেই দেশের ১৪ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয়ের দুর্নীতি-অনিয়মের বিষয়টি জাতির সামনে এসেছে। এটা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যবস্থাকেই দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ছাত্র রাজনীতি না থাকলে প্রশাসনিক ব্যবস্থপনায় যারা আছেন তাদের মধ্যেকার অনেকেই আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারেন।
আরেকটি বিষয় হলো- যদি ছাত্র রাজনীতি বন্ধই করা হয়, সেই রাজনীতিটা কতটুকু বন্ধ হবে বা আদৌ বন্ধ করা যাবে সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়। প্রশাসনে দলকানা লোক থাকলে নেপথ্যে ছাত্র রাজনীতি চালিয়ে যাওয়া খুব কঠিন কাজ হবে না। নেপথ্যে রাজনীতির সাংগঠনিক ধারা বন্ধ করা খুবই জটিল একটি বিষয়। যেমন- যে ধারায় ইসলামী ছাত্র শিবির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি করেই যাচ্ছে। বরং যারা ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছেন- তাদের এ বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। এ ক্ষেত্রে নেপথ্যের রাজনৈতিক সংগঠনিক ধারায় ছাত্র শিবিরের কাছে বাম-গণতান্ত্রিক ধারার ছাত্র সংগঠনগুলো খুব একটা পেরে উঠবে- সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়। এর ফলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুযোগ থেকে যায়। সেটা আরো ভয়ঙ্কর হবে।
বরং বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছেÑ ছাত্র রাজনীতি নয়, বরং ছাত্র রাজনীতির নামে যে সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতি শুরু হয়েছেÑ তা বন্ধ করতে হবে। এটি একটি উপায় হতে পারে কিংবা এই ধারণায় সমস্যাটির সূত্র-সমাধান খোঁজা যেতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলদারিত্বে রাজনীতিটা শুধু ছাত্র সংগঠনগুলোই করে না। এর নেপথ্যে প্রশাসনে যুক্ত ব্যক্তিরা দখলদারিত্বের রাজনীতিটা পাকাপোক্ত রাখতে চায়। একই সাথে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় যে দুর্বৃত্তায়ন সেটাকেও বিবেচনায় নিয়ে সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দুর্বৃৃত্তায়নের মনোভাব থাকলে সে ক্ষেত্রে ছাত্র বা ছাত্র সংগঠনের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি না থাকলেও সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের রাজনীতিটা বন্ধ হয়ে যাবে না। খণ্ডিতভাবে সমস্যা সমাধানের উপায় না খুঁজে বরং সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি উত্তরণের প্রয়াস চালানোই উত্তম হবে। এতে করে শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার মান সুরক্ষিত হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় উন্নত ধারাবাহিকতাও সৃষ্টি-সম্ভব হতে পারে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ