ছিন্ন বীণা

আপডেট: জুলাই ৭, ২০১৮, ১:১১ পূর্বাহ্ণ

শুভেন্দু চট্টরাজ


বিতানদের ফ্ল্যাটটা টবিন্ রোড থেকে একটু ভিতরের দিকে। থ্রি বেডরুম অ্যাপার্টমেন্ট। বুক করার সময় থেকেই অ্যাটাচ্ড্ বাথরুম আর ব্যালকনি সমেত ঘরটা বিতান দখল করেছিল। সেইমত আজ প্রায় দেড় বছর সে ওই ঘরেই থাকে। কিন্তু হঠাৎই একটা ঘটনা ঘটায় নিজের রাজ্যপাট ছেড়ে বিতানকে যেতে হচ্ছে পাশের ঘরে। বিতানের এক দাদু, মানে বিতানের বাবার নিজের মেজোকাকা এখানে এসে থাকবেন ঠিক হয়েছে। আসলে বিতানের কাকু, মানে সেই দাদুর একমাত্র ছেলে, তার বৌ আর মেয়েকে নিয়ে কর্মসূত্রে আমেরিকা চলে যাচ্ছেন আগামী পরশু দিন। দাদু বিপতœীক, দেখাশোনা করার মত আর কেউ না থাকায় বিতানের কাকু তার জ্যাঠতুতো দাদা, মানে বিতানের বাবাকে অনুরোধ করে দাদুর এখানে থাকার ব্যবস্থা কর্নে। বিতানের বাবা সেই অনুরোধ ফেলতে পারেননি। এমনিতে কোম্পানির কাজে প্রত্যেক মাসের প্রায় অর্ধেক দিন বিতানের বাবা ট্যুরেই থাকেন। বিতানের মাও চাকরি করেন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে। ফ্ল্যাটটা সারাদিন মোটামুটি খালিই থাকে। দাদু নিজের মত ভালোই থাকবেন ভেবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দাদুকে তার আগে সবাই মিলে বোঝানোর চেষ্টা করেছে কাকুদের সাথে আমেরিকা যেতে। দাদু একদম রাজী হননি। বারবার বলেছেন ওনাকে কোন একটা বৃদ্ধাশ্রমে ব্যবস্থা করে দিতে। শেষমেশ ঠিক হয়েছে, এখানেই কিছুদিন থাকুন, তারপর অসুবিধা হলে, দাদুর কথামতই ব্যবস্থা করা হবে।
সপ্তাহের যে যে দিনগুলোতে স্কুল থেকে ফিরে বিতানের পড়তে যাওয়া থাকে না, মায়ের অফিস থেকে ফিরে না আসা অবধি, তার মানে প্রায় সন্ধ্যা আটটা সাড়ে আটটা পর্যন্ত ওর খুব বোরিং কাটে। বিতান লেখাপড়ায় বরাবর ভালো। শ্যামবাজারের কাছে একটা নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে, প্রত্যেক বছর এক থেকে তিনের ভিতর র‌্যাংক করে। স্যার, ম্যাডামদের খুব প্রিয় ছাত্র। পাড়ায় ভালো কোন খেলার মাঠ না থাকায় বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কখনো টিভি দেখে, কখনও কম্পিউটার গেমস্ খেলে ওর সময় কাটে। কোনো কোনো দিন আবার স্কুলে পড়ার চাপ থাকলে বাড়ি ফিরেই পড়তে বসে যায়।
বিতান প্রথমে ভেবেছিলো দাদু আসাতে তার ভালোই লাগবে, স্পেয়ার টাইম গুলো দাদুর সাথে গল্প করা যাবে। কিন্তু ভাবনাটা ভুল প্রমাণ হতে এক সপ্তাহও লাগল না। দাদুর বয়স সত্তরের ওপর, পুরোন দিনের মানুষ, আজকের যুগের সঙ্গে ঠিক খাপ খান না। তার ওপর ঠাকুমা মারা যাবার এক বছরের মধ্যে শরীর স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে গেছে। ভীষণ কম কথা বলেন, প্রায় সবসময় নিজের ঘরের মধ্যে চুপচাপ শুয়ে বসে কাটান। কানে ভীষণ কম শোনেন, আর চোখে তো প্রায় দেখেন না বললেই চলে। কানের জন্য হিয়ারিং এইড থাকলেও, দৃষ্টি ফিরে পাবার আর কোন উপায় নেই। কাজেই টিভি দেখে সময় কাটানোরও উপায় নেই। দাদুর একমাত্র সঙ্গী বহুদিনের পুরান একটা বেহালা। রাত্রিবেলা সবাই শুয়ে পরার পর দাদু বেহালা নিয়ে বসেন। প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত বেহালা বাজতে থাকে। মন উদাস করে দেওয়া সেই সুর শুনে বিতানের প্রথম প্রথম খুব ভয় হত, পাড়া থেকে কেউ না এর বিরুদ্ধে কথা বলতে আসে। মায়ের সাথে কথা বলে বিতান বুঝেছে, মা’ও এই ব্যাপারে চিন্তিত। শেষপর্যন্ত অবশ্য কেউ কিছু বিরোধ করেননি, বরং দু একজন জানতে চেয়েছে, বিতান বেহালা শিখছে কিনা। নাহলে, কে এত ভাল বেহালা বাজায়?
মাস দুয়েকের মাথায়, এক রবিবার, বিতানের মাকে একটা জরুরী কাজে সকাল সকাল বেরোতে হল, ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে। এমনিতে রোজ দাদুকে বিতানের মা-ই অফিস বেরোবার আগে খেতে দিয়ে যান। কিন্তু আজ রবিবার বলে রান্নার মাসি বিকেলে আসবে। তাই বিতানের ওপর ভার পরল, দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ মাইক্রোওভেনে খাবার গরম করে দাদুকে খেতে দেবার, আর নিজেও খেয়ে নেবার। দাদুর খাবার ওনার ঘরেই দিয়ে আসা হয় দুবেলা। বেলা দেড়টা নাগাদ বিতান নিজের ঘরে বসে টিভিতে স্প্যানিশ লীগের রিয়্যাল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনার ম্যাচটার রি-টেলিকাস্ট দেখতে দেখতে নিজে খেয়ে নিলেও, দাদুকে খেতে দেবার কথা কিন্তু বেমালুম ভুলে গেল। বিতান ফুটবলের পোকা, রোনাল্ডোর মস্ত বড় ফ্যান। পড়ার চাপ থাকায় এই ম্যাচটা লাইভ দেখতে পারেনি, নাহলে রোনাল্ডোর কোনোও ম্যাচ না দেখা হয় না। ইদানীং দাদুর অস্তিত্ব বিতান মাঝে মাঝেই ভুলে যায়। আজও তাই হল। তার ফলস্বরূপ মা ফিরে আসার পর বিতানের ভাগ্যে জুটল বকুনি। বকাঝকা বিতান একটু কমই খায়। তাই নিজের ভুল মেনে নিলেও, বকা খাবার দুঃখটা বিতানের থেকেই গেল।
খানিকক্ষণ নিজের ঘরে বসে থেকে বকুনিটা হজম করে নিয়ে দাদুর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইল বিতান। উত্তরে দাদু বললেন,
‘ঠিক আছে দাদুভাই, আমি কিছু মনে করিনি। আর ভুল তো আমারও হয়েছে, তোমাকে গিয়ে বললেই তো হত। আসলে আমি ভেবেছি, তোমরা দুজনেই বেরিয়ে গেছ। তোমার ঠাকুমা চলে যাবার পর আজকাল আর বার তারিখ কিছুই মনে থাকে না দাদুভাই।’
একটুখানি দম নিয়ে প্রায় ফোকলা হয়ে যাওয়া মুখে একটা হাসি টেনে দাদু আবার বলতে শুরু করলেন, ‘ক্ষমা পরম ধর্ম, বুঝলে দাদুভাই, ওর চাইতে বড় আর কিছু নেই। আর আমার জন্য এই যে তোমাকে মা’র কাছে বকুনি খেতে হল, সেই জন্য তুমিও আমায় ক্ষমা করে দিও।’
শেষ করার আগেই দাদু বেহালা টেনে নিয়েছে, তাই আর কথা বেশি এগোল না। কিন্তু দাদুও উল্টে স্যরি চাওয়ায় বিতানের খারাপ লাগাটা আর অতটাও মনে থাকল না।
মাসখানেক যেতে না যেতেই বিতান আর ওর মা বাবা, তিনজনেই বুঝলেন যে, এভাবে চলবে না। দাদু এখানে একদম ভাল থাকছে না। এই বয়সে ওনার যেরকম সঙ্গী দরকার, বিতান বা ওর বাবা, মা, কেউই সেই ধরনের নয়। হয়ত বা যতটা সময় ওনাকে দেওয়া দরকার ততটা ওরা ওনাকে দিতেও পারছে না। আজকের এই প্রতিযোগিতার যুগে অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ার ভয়ে যে যার নিজের কাজে এতটাই ব্যস্ত যে, দাদুর মত কারোর জন্য আলাদা করে সময় বের করা কঠিন। বিতানের কাকুকে ফোন করায় উনি জানিয়াছেন যে, ঠাকুমা মারা যাবার পর নাকি দাদু নিজেকে এভাবেই গুটিয়ে নিয়েছেন। কাকুদের সাথে থাকার সময়ও এরকমই থাকতেন। সঙ্গী বলতে শুধু ওই বেহালা। বৃদ্ধাশ্রমের কথাতে এবার সবাই একমত হল।
বিতান একদিন দাদুর ঘরে গিয়ে কৌতূহলের বসে জিজ্ঞেস করল, ‘দাদু, তুমি এরকম একা একা থাকো কেন? ঘরের বাইরে আসতে পারো তো? আমাদের সঙ্গে গল্পও তো করতে পারো? তাতে ভালোই তো লাগবে! নাকি আমাদেরকে তোমার একেবারেই ভাল লাগে না?’
আগে এইরকম প্রশ্নের উত্তরে একবার দাদু বিতানের বাবাকে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘এই তো বেশ আছি, তোমরা কত যতœ করছ, খুব ভাল আছি।’
বিতানের প্রশ্নের উত্তরে হাসতে হাসতেই বললেন, ‘কী জানো দাদুভাই, আমি বুড়ো মানুষ। আজ আছি, কাল নেই। তোমাদের সামনে পুরো ভবিষ্যৎ পরে আছে। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তোমরা যে আমার জন্য এতটা করছ এই ঢের। আর কে বলেছে আমি একা? এই দেখছ না আমার বেহালা। এটাই তো আমার সবচেয়ে বড় সঙ্গী। এটা যখন রাত্রিবেলায় বাজাই, তোমার ঠাকুমা স্বর্গ থেকে নেমে এসে আমার পাশে বসে। তারপর সারা রাত ধরে ওই জানালাটার ধারে বসে বসে আমরা দুজন কত গল্প করি।’
দাদুর কথায় ভীষণ অবাক হয় বিতান। কথাগুলো বলতে বলতে দাদু যেন কিরকম সিরিয়াস হয়ে গেছিলেন। মনে হচ্ছিল বোধহয় সত্যি সত্যিই দাদুর বেহালা শুনে ঠাকুমা রোজ রাতে দাদুর সাথে এসে গল্প করে যায়। ঘর ছেড়ে বারিয়ে আসার মুখে দাদু হাসতে হাসতে বিতানকে বললেন, “তবে দাদুভাই, এটা কিন্তু টপ্ সিক্রেট। কাউকে বলবে না। আসলে ওই বেহালাটা শখ করে তোমার ঠাকুমায় আমাকে কিনে দিয়েছিল। রাত্রিবেলায় আমি বাজাতাম আর ও শুনত। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ত। একদিন এভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর উঠল না।” বলতে বলতে দাদুর গলাটা একটু কেঁপে উঠল।
বিতান বেশ ভালই বুঝতে পেরেছিল যে, দাদু এখনও ঠাকুমাকে কতটা মিস করেন। জীবনের এই সময়টাতেই বোধহয় দুজনের দুজনকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল। সে যাই হোক, চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে কথাটা শেষ করলেন বিতানের দাদু, “আমি চলে গেলে তুমি ওটা নিয়ে বাজনাটা শিখে নিও দাদুভাই। দেখো, ওতে জাদু আছে। কাউকে একলা থাকতে দেয় না।”
বৃদ্ধাশ্রমের ব্যাপারটা দাদুকে কেউ বলে উঠতে পারেনি। ঠিক হয়েছে, বিতানের বাবা দিন সাতেক বাদে ট্যুর থেকে ফিরে এলে, তখন জানান হবে। বিতানের স্কুলে এখন ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। শেষ হতে আর সাতদিনও বাকি নেই। এইরকম সময় এক রবিবার সকালে জলখাবার খেতে খেতে বিতান শুনল, দাদু তাকে খুঁজতে খুঁজতে দরজা হাতড়ে নিজের ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। কারণ হল, গতকাল রাত্রে দাদুর বেহালার ছড়টা ছিঁড়ে গেছে। বিতানের সারা পেয়ে দাদু তাকে কাতরভাবে অনুরোধ করলেন, ‘দাদুভাই, ওটাকে একটু সারিয়ে এনে দাও ভাই। ওটা ছাড়া আমি বোধহয় বাঁচতে পারব না।’
ছড়টা নিয়ে বিকেলবেলা বেরোল বিতান। বি.টি রোডের ওপর অনেক দিনের পুরানো একটা বাদ্যযন্ত্রের দোকানে ছড়টা দেখাতে ওরা জানাল, দোকানে এই তার এখন নেই। কাল মার্কেট থেকে নিয়ে এসে লাগানো হবে, পরশু ডেলিভারি দেবে। সেই শর্তেই রাজি হয়ে ফেরার পথে বিতানের মাথায় একটা চালাকি খেলে গেল। ওর পরীক্ষা শেষ হবে আগামী শুক্রবার। মানে হাতে আরো পাঁচ দিন। এই কদিনে ওর তিনটে পরীক্ষা বাকি, হিস্ট্রী, জিওগ্রাফি আর লাইফসায়েন্স। তিনটে পেপারই ওকে মুখস্ত করতে হয় খুব। যদিও দাদুর বেহালার সুর ইদানিং ওর ভালোই লাগে, তবু রাত জেগে পড়ার সময় ও দেখেছে বেহালার মন উদাস করা সুরে পড়ায় মন বসাতে সমস্যা হয়। দাদুকে নিজেও কিছু বলতে পারেনি, মাকে দিয়ে বলাবে ভাবলেও মা রাজী হননি। বলেছিলেন প্রথম রাত্রিটা ঘুমিয়ে নিয়ে মাঝরাতে উঠে পড়তে। মুখস্ত করার বিষয়গুলো নিয়েই বিতানের বেশি চিন্তা। এইগুলোর জন্যই র‌্যাঙ্কিং এর হেরফের হয়ে যেতে পারে। এইবার বাকি সাবজেক্ট গুলোতে ওর যা প্রিপারেশান, তাতে সবাইকে টপকে ওরই ফার্স্ট হবার কথা। এই বাকি তিনটে সাবজেক্টেরও খুব সুন্দর নোট তৈরি করেছে ওর নতুন স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ঘেঁটে। শেষ মুহুর্তে একটু ঝালিয়ে নিতে পারলেই হয়ে যায়। বিতান ভেবে নিল, মাত্র কদিনের জন্য দাদুর বেহালা বন্ধ থাকলে কারোর কিছু ক্ষতি তো হবেই না, বরং লাভের মধ্যে ওর র‌্যাঙ্কটা ফার্স্ট আসতে পারে।
বাড়ি ফিরে দাদু আর মা’কে বিতান দোকানদারের কথাটা জানিয়ে দিল। শুধু দেরীর কথাটা দুদিনের বদলে পাঁচদিন হবে বলল। মায়ের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে থাকায় বিতান কিন্তু দেখতে পেল না, দাদু ওর কথাটাতে কতটা কষ্ট পেলেন। হিস্ট্রী আর জিওগ্রাফি পরীক্ষা ফাটাফাটি হয়েছে বিতানের। একটা পয়েন্টও ও মিস করেনি লিখে আসতে। গত তিন রাত্রির পড়াটা ওর ভীষণ কাজে এসেছে। আজ পরীক্ষা নেই। কাল লাইফসায়েন্স হলেই শেষ। সকালে পড়া তৈরির মধ্যেই মা ওকে বারদুয়েক বেহালার ছড়টা নিয়ে আসার কথা বলেছেন। কারণ জিজ্ঞেস করাতে মা বলেছিলেন দাদু নাকি ভাল করে খাচ্ছেন না। মন খারাপ করে বসে আছেন। চোখে মুখে কয়েকদিনের না ঘুমানোর ছাপ ফুটে উঠেছে। বিতান যদি দোকানে গিয়ে কথা বলে একটু আগে নিয়ে আসতে পারে তো ভাল হয়। দাদুর ঘরে একবার উঁকি দিয়ে বিতান দেখল, শুয়ে আছে। দাদু বলে ডেকে কথা বলতে গিয়ে বুঝল, সত্যিই দাদু দু-তিন রাত্রি ঘুমোননি। ওর একটু খারাপই লাগল। ছড়টা নিয়ে আসার জন্য দোকানে গিয়ে দেখল, বৃহস্পতিবার বলে দোকান বন্ধ। হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে কথাটা জানাতে একটু ম্লান হেসে দাদু বলল, ‘ঠিক আছে দাদুভাই।’
শেষ পর্যন্ত কিন্তু বিতান বেহালার ছড়টা দাদুর হাতে তুলে দিতে পারেনি। শুক্রবার লাস্ট পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথেই দোকান থেকে ওটা নিয়ে বাড়িতে এসে শুনল, দাদু হসপিটালে। অফিস যাবার আগে দাদুর ঘরে গিয়ে বিতানের মা দেখেন, দাদু ঘরের জানালার নীচে চেয়ার থেকে পড়ে গেছেন। শরীরে জ্ঞান নেই। পাড়ার ডাক্তার এসে দেখেই হসপিটালে দিতে বলেন। ব্যাগটা রেখেই ড্রেস চেঞ্জ করার কথা ভুলে তাড়াতাড়ি হসপিটালে ছোটে বিতান। দাদুর তখনও জ্ঞান না ফেরায় বাবাকে খবর দিয়ে ডেকে আনা হল সেই রাত্রেই। ভোর বেলায় ফোনটা এল হসপিটাল থেকে – দাদু আর নেই।
শ্রাদ্ধের কাজ মিটে গেছে। কাকুরাও ফিরে গেছেন আমেরিকা। বিতানের রেজাল্ট বেরোতে এখনও দিনকতক বাকি। স্কুল ছুটি। দুপুরবেলা মা ঘুমোচ্ছে মায়েদের ঘরে। বিতান এসে ঢুকল তার আগের ঘরে। এখানেই কয়েকদিন একা – কিংবা হয়ত একা নয়, একটা মানুষ কাটিয়ে গেছে নিঃশব্দে। ঘরের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে তাঁরই একটা মালা পরানো ছবি। একটু এদিক ওদিক তাকাতেই টেবিলের ওপর বিতান যা খুঁজছিল সেটা পেয়ে গেল। দাদুর সেই বেহালার ছড়টা। সেটা হাতে তুলে নিয়ে বেহালাটায় দুবার টান দিল বিতান। ঠিক যেভাবে দাদু বাজাতেন, সেইভাবে। বেসুরো আওয়াজ বেরোলো। বিতানের মনটা ভীষণ ভারী হয়ে গেল। একটা চরম অপরাধ বোধ কান্না হয়ে গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠল। ছলছল চোখে বিতান কোনমতে দেয়ালে টাঙানো ছবিটার তাকিয়ে বলে উঠল, ‘দাদু, স্যরি। আমায় তুমি ক্ষমা…।’ কথাটা শেষ করতে পারল না বিতান। জলভরা চোখে তাকিয়ে দেখল, দাদুর ছবিটা যেন হেসে উঠল সেই ভঙ্গিতে, যে ভাবে হাসতে হাসতে দাদু বিতানকে শিখিয়েছিল জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ-ক্ষমা পরম ধর্ম। নিজের জীবন দিয়েও বুঝি সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন দাদু। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না বিতান, ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল বেহালাটা বুকের মধ্যে নিয়ে।