ছোটদের সঙ্গী করে বড়দের দেখার মতো ছবি

আপডেট: জুলাই ১১, ২০১৮, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের ‘সোনার পাহাড়’ শুধুমাত্র ছোটদের ছবি নয়। বরং বলা ভালো, ছোটদের সঙ্গী করে বড়দের দেখার মতো ছবি। সাধারণ বাঙালি, পর্দায় একটা নিটোল গল্প দেখতে পছন্দ করে। সেই ভাবেই পরিচালক এ ছবির কাহিনীকে আমজনতার কাছে বোধগম্য করে তোলার কাজটি বেশ সাবলীলতার সঙ্গেই করেছেন।
অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎÍ তিন সময়, তিন প্রজন্মের সম্পর্কের ভিত ধরে চেনা ছকের মধ্যেও অন্যরকম চিত্রনাট্য (পরমব্রত-পাভেল) ধরে এগিয়েছেন পরিচালক। মা-বাবার ভালোবাসাটা আমাদের কাছে ‘টেকেন ফর গ্র্যান্টেড’। যাই করি না কেন, আমরা জানি, তাঁরা ভালোবাসবেনই। কাজেই তাঁদের অবহেলা করাটা আমাদের স্বভাবজাত হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যখন অপর পক্ষ থেকে শক্ত প্রতিবাদ আসে, তখন সবকিছু গোলমাল হয়ে যায়। যেমন হয় উপমা (তনুজা) এবং তাঁর ছেলে পাপুনের (যিশু সেনগুপ্ত) ক্ষেত্রে। বুঝতে না চাওয়া, ছোট ছোট ভুলত্রুটি গুলো বড় হতে শুরু করে। দূরত্ব আরও বাড়ে, যখন তৃতীয় পক্ষ, অর্থাৎ ছেলের স্ত্রীর (অরুণিমা ঘোষ) আগমন ঘটে। চেনা সম্পর্কের সেই চিরাচরিত দোটানায় পড়ে বউকে নিয়ে আলাদা হয়ে যায় ছেলে। সাবেকি বাড়িতে কাজের লোকের নির্ভরতায় সময় কাটে (না কি কাটতে চায় না) বৃদ্ধা উপমার। হঠাৎই তাঁর জীবনের চেনা ছক পাল্টে যেতে থাকে বিটলুর (শ্রীজাত) আগমনে। নাতির বয়সী ছেলেটি ধীরে ধীরে তাঁর মন জুড়ে বসে। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব জমে ওঠে। যেমন ছিল ছেলের সঙ্গে। যখন তিনি সেই মা-ছেলের গল্প লিখতেন। যে ছেলে, মাকে নিয়ে ঠিক কবির বীরপুরুষের মতো সব বাধা অতিক্রম করে সোনার পাহাড় যেতে চায়। সেই স্বপ্নটা আবার উস্কে দেয় নাতিসম বিটলু। এতদিন বাদে সেই অসম্পূর্ণ গল্পটাকে শেষ করতে উপমা উপস্থিত হয় পাহাড় দেশে। সঙ্গী কিন্তু বদলে যায়। এবার আর ছেলে নয়, সাথী নাতিসম বিটলু। ছেলে যে এখন অনেক দূরের মানুষ। স্বপ্নেও তার প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু সোনার পাহাড়ের সোনার ছোঁয়ায় সব তিক্ততা ধুয়ে মুছে যায়। সোনার পাহাড়ের ছোঁয়ায় চিরন্তন সম্পর্কটা আবার আলোকিত হয়ে ওঠে।
দুই প্রজন্মের দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের দূরত্ব, পরস্পরকে বুঝতে না চাওয়া, এ ছবির অন্যতম বিষয়। তেমনই, সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া, পারস্পরিক সাহচর্য, মানিয়ে নেবার ইচ্ছে যে ছেঁড়া সম্পর্ককে জোড়া লাগাতে পারে, সে কথাই বলে এ ছবি। গ্লোবালাইজেশনের যুগেও চিরন্তন সম্পর্কগুলো একই থাকে, শুধু প্রকাশ ভঙ্গির বদল ঘটে। অতীতের হাত ধরেই তো বর্তমানের পরিচয়। তাকে নিয়েই তো তার চলা। তবেই তো এগবে ভবিষ্যৎ।
বহুদিন বাদে তনুজাকে বাংলা ছবিতে নিয়ে এলেন পরমব্রত। ধন্যবাদ তাঁকে। কী অনায়াস দক্ষতা, কী অসাধারণ সাবলীলতা তাঁর অভিনয়ে। পাশাপাশি পুঁচকে শ্রীজাত অবাক করেছে। অথচ এটাই তার প্রথম ছবি। তনুজার ছেলে অর্থাৎ পাপুনের চরিত্রে যিশু ভীষণ ভাবে উজ্জ্বল। একটি দৃশ্যের কথা না বললেই নয়। পাহাড় দেশের রঙিন গোধূলি। মাকে জড়িয়ে শিশুর মত কান্নায় ভেঙে পড়া। বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। আবেগের উপর কী অসামান্য নিয়ন্ত্রণ। এক চুলও বাড়াবাড়ি নেই। মা-ছেলের মিলনে সোনার পাহাড় উজাড় করে দেয় তার গুপ্তধন। যিশুর বন্ধুর চরিত্রে নিজেকেও সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়েছেন পরিচালক। বিশেষ একটি চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। একদা বহু হিট ছবির জুটি যখন বহুদিন বাদে জীবন সায়াহ্নে এসে আবার মুখোমুখি হন, তখন পর্দায় এক অন্যরকম নস্টালজিয়া তৈরি হতে বাধ্য। সাদাকালোর কত কত ছবি রঙিন হয়ে ওঠে মনের ক্যানভাসে। সেই লোভটা ছাড়তে পারেননি পরমব্রতও। আর তাই এ ছবির উপমার সামনে রজতশুভ্র (সৌমিত্র) যখন গেয়ে ওঠেন – ‘জীবনে কী পাব না’ গুটি গুটি মন পাড়ি দেয় ‘প্রথম কদম ফুল’এর ম্যাজিকে।
শুভঙ্কর ভড়ের গতিময় ক্যামেরা ছবিটিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। সুমিত চৌধুরীর সম্পাদনা, ছবির গতিকে মাঝে মাঝেই রুদ্ধ করেছে। ছবির দৈর্ঘ্য কিছু কম হলে আরও স্মার্ট হতে পারত। তথ্যসূত্র: বর্তমান