ছোট শিশুদের নিয়ে ‘বড় আতঙ্ক’ !

আপডেট: অক্টোবর ৭, ২০১৯, ১:২৪ পূর্বাহ্ণ

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি


পদ্মার বাঁধে শিশুদের নিয়ে আতঙ্ক থাকেন অভিভাবকরা সোনার দেশ

হেলেনা খাতুনের বাড়ি পদ্মা নদীর শহর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে। আর বাঁধের কয়েকহাত নিচ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে প্রমত্তা পদ্মার তীব্র ¯্রােত। হেলেনা খাতুন তার চার বছরের নাতি আলিফকে নিয়ে খুব আতঙ্কে থাকেন। সে কেবল হাঁটতে শিখেছে। একটু অন্যমনস্কতা বা অন্য কোনো কাজের জন্য না নদীর দিকে চলে যায়। রাজশাহী মহানগরীর কেশবপুর শহর রক্ষা বাঁধ ঘেঁষে অন্তত দেড় হাজার পরিবারের বসবাস। এখানকার শুধু হেলেনা খাতুনই নয়, শিশুদের নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন লতিফা, হাবিবা, শারমিন, নাহিদাসহ আরও অনেক শিশুর মা। তাদের একটাই ভয়, একটু অসাবধনতার কারণে কখন না তাদের ছেলেমেয়েরা নদীর দিকে চলে যায়। গত শনিবার সকালে হেলেনা খাতুন বলেন, ঘরের দরজায় পানি। শিশু আলিফকে নিয়ে বড় আতঙ্কের মধ্যে থাকি। নিশ্চিতে রান্না করতে পারি না। অন্য কোনো কাজও মনোযোগ দিয়ে করতে পারি না। সুযোগ পেলেই আলিফ বাড়ির বাইরে চলে যায়। আর ঘর থেকে বের হলেই পদ্মা নদী। খুব আতঙ্কে থাকি। এলাকার বাসিন্দা কোহিনুর বেগম (৪২) জানান, তিনিও তার নাতনিকে নিয়ে ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে আছেন। পাঁচ বছর বয়স তার নাতনি মারুফার। সে-ও সারাক্ষণ ছোটাছুটি করে। তাই বাড়ির দরজা বন্ধ করে রাখতে হয়। কোহিনুর জানান, তিনি রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না এই ভেবে যে, ঘুমালেই মনে হয় ঘরের মধ্যে পানি ঢুকে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
শিল্পি খাতুন (৩০) নামের আরেক গৃহবধূ বলেন, তার দুই সন্তান। বড় মেয়ে নুপুর (৯) আর ছোট ছেলে ইমরান আলী (২)। শিল্পি বলেন, ছেলেমেয়ের চিন্তার জন্য তিনি কাজে মনোযোগ দিতে পারেন না। সব সময় মনের মধ্যে ভয় কাজ করে, এই বুঝি তার ছেলে মেয়ে পানিতে ভেসে গেলো!
শিল্পি জানালেন, আগের বছর এলাকার এক মায়ের কোল খালি হয়েছে পদ্মা নদীর এই পানিতে। তারপর থেকেই তিনি আতঙ্কে থাকেন। এবার পানি এতো বেশি বেড়েছে যে আতঙ্কের মাত্রাও অনেক বেড়েছে।
নদীর পানির ধারেই বাঁধে বসে খেলছিলো শিশু রোজা খাতুন (৯)। সে বলে, নদীতে পানি বাড়লে তার ভয় করে। বাড়ির পাশেই নদী এমন অবস্থার কারণে তারা ঠিকমতো দৌড়াদৌড়ি করে খেলতে পারে না। নদীতে পানি কমে গেলে তার ভালো লাগে।
রোজার মা ডলি খাতুন (৩২) বলেন, নদীতে পানি বাড়ার জন্য তিনি তার মেয়েকে ঘর থেকে বের হতে দিতে ভয় পান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত সপ্তাহে হঠাৎ করেই নদীতে দ্রুত পানি বাড়তে শুরু করে। তারপর রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ১৯ মিটার পর্যন্ত উঠে পানির উচ্চতা। তবে এরপর থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় পানির উচ্চতা ছিলো ১৮ দশমিক ১২ মিটার। তারপরেও নদীতে রয়েছে প্রবল ¯্রােত।
কেশবপুরের বাসিন্দারা জানান, নদীতে যে ¯্রােত তাতে পড়ে গেলে সাঁতার জানা থাকলেও ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে বাঁচানো সম্ভব না। তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে স্রোত। তাই উত্তাল নদী থেকে তাদের বাড়িঘর হারানোর ভয় যতখানি তার চেয়েও বেশি ভয় সন্তান হারানোর।
এলাকার বাসিন্দা পারভিন বেগম (২৩) জানান, তার ছেলে তাসলিমুল হাসানের বয়স দুই বছর। কেবল হাঁটতে শিখেছে। কোল থেকে নামালেই ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। তার জন্য ঘরের দরজা সব সময় লাগিয়ে রাখতে হয়। তাছাড়াও পানি কমলেই বাঁধের ব্লক খুলে যাবার আশঙ্কা থাকে। সে জন্য সন্তানকে নিয়ে তিনি সব সময় সতর্ক থাকেন।
রানী বেগম (৪৫) নামে আরেক নারী জানান, তার বাড়িতে কোনো ছোট ছেলেমেয়ে নেই। কিন্তু তাতে কী! আশেপাশের বাড়িতে ছোট ছোট বাচ্চা আছে, তাদের জন্য তিনিও ভীষণ ভয়ে থাকেন। ছোট বাচ্চাদের পানির কাছে দেখলেই তার ভয় করে। নিজেও পানির কাছে যেতে ভয় পান।
বৃষ্টি নামে ১২ বছরের এক কিশোরী জানালো, তার মা তাকে বেশিরভাগ সময় বাড়ির দরজায় তালা দিয়ে রাখেন। যেনো সে বের হতে না পারে আর নদীতে গোসল করতে যেতে না পারে। বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে তার মা আনোয়ারা খাতুন বললেন, মাঝে মাঝে দোকানে যাই। তখন দরজায় তালা দিয়ে যাই। তা না হলে চোখের আড়ালে কখন কী হয় তা কে জানে!

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ