ছয় দফা ছিল মূলত বাঙালি মুক্তির ম্যাগনাকার্টা

আপডেট: ডিসেম্বর ৬, ২০১৮, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হলেও পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিলই ছিল বেশি। ১৯৪৭-এর দেশভাগে শুধু ধর্মকেই দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু জাতীয়তাবাদের অন্য উপাদানগুলোকে দেশভাগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়নি। বিবেচনা করা হয়নি ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, লোকাচারসহ আরও অনেক কিছুই। সে সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় হয়তো তা সম্ভবও ছিল না।
কিন্তু বাঙালির পরিচয়বাহী এই ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিই আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করতে শুরু করলো। একের পর এক তারা আমাদের সংস্কৃতিমূলে আঘাত করতে লাগলো। সে আঘাত পরবর্তীকালে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের রূপ ধারণ করলো।
পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ছিল হাজার মাইলের ব্যবধান। মাঝখানে বিশাল ভারতীয় ভূখ- দ্বারা বিভক্ত দুই পাকিস্তান। সেই সাথে অন্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যবধানতো ছিলই।
আয়তনের ক্ষেত্রেও দুই পাকিস্তানের মধ্যে পার্থক্য ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় ছয়গুণ বড়। ভূ-বৈচিত্র্যগত পার্থক্যও ছিল লক্ষণীয়। ছিল জনসংখ্যার ঘনত্বের পার্থক্যও। ১৯৬১ সালের আদমশুমারির হিসেবে পশ্চিমের জনসংখ্যা ছিল চার কোটি তিরিশ লাখ আর পূর্বের লোক সংখ্যা ছিল পাঁচ কোটি দশ লাখ।
তার মানে পূর্ব পাকিস্তান একদিকে যেমন আয়তনে ছোট, তেমনি তার জনসংখ্যা বেশি। তদুপরি অর্থনৈতিক দিক দিয়েও সে দুর্বল। তার ওপর রাষ্ট্রীয় বৈষম্যযোগে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের নাভিশ্বাস অবস্থা। সার্বিক বৈষম্যদৃষ্টে এটাই স্পষ্ট যে পশ্চিমারা আমাদের ওপর এক ধরনের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ চাপিয়ে দিয়েছে। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্রায় একই রকম বর্ণনা পাই লে. জেনারেল জে এফ আর জেকবের লেখা ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা-একটি জাতির জন্ম’ বইটিতে।
জেনারেল জেকবের ভাষ্যমতে, ‘১৯৬০ সালে প্রবৃদ্ধির উচ্চতর বার্ষিক হার ছাড়াও পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি’। অর্থাৎ, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের কোনো লক্ষ্যণীয় উদ্যোগই পাকিস্তান সরকার গ্রহণ করেনি। ফলে মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রেও দেখা দেয় বৈষম্য। অর্থনীতির অপরাপর সূচক বিবেচনায় নিলে বৈষম্যের এ তালিকা পাহাড় সমান।
এরকম হাজারো বৈষম্য ও নিপীড়নমূলক কর্মকা-ের প্রেক্ষিতেই বাঙালি তার ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে। জাতির পক্ষে আওয়ামীল লীগ সেই ছয় দফা দাবি পেশ করে। ছয় দফা ছিল মূলত বাঙালি মুক্তির ম্যাগনাকার্টা।
(চলবে)