জঙ্গি-ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

আপডেট: মার্চ ১৩, ২০১৮, ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


‘জাফর ইকবালের ওপর হামলা রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সম্ভব নয়’ (৬ মার্চ, দৈনিক সংবাদ) বলেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কুদ্দুস রিজভী। তিনি বলেছেন, ‘লেখক জাফর ইকবালকে হামলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিপ্রসূত কাজ। গুম-খুনের কারিগর আওয়ামী লীগ। তাদের আমলেই জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।’ রিজভীর এ কথা বলার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এক কালের মহা বিপ্লবী যারা ‘চিনের প্রেসিডেন্ট আমাদের প্রেসিডেন্ট’ বলতেই বেশি সাচ্ছন্দবোধ করতেন, তাদেরই অন্যতম আতাউর রহমান ঢালী-যিনি ‘বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। জননেতা ফজলে হোসেন বাদশার এমপি’র পর ‘বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী’র সভাপতি হয়েছিলেন জহিরউদ্দিন স্বপন। তিনিও বিএনপিতে যোগ দিয়ে বরিশালের কোনো এক আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে জনাব স্বপনের কোনো উচ্চবাচ্য শোনা যায় না। আতাউর রহমান ঢালি বিএনপিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পদে আছেন বলে জানা নেই। তবে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যারাই চিনাপন্থি ছিলেন এবং ভাসানি ন্যাপের নেতা-কর্মী, তাদের অধিকাংশই বিএনপিতে যোগ দিয়ে সামরিক স্বৈরশাসনকে বৈধতা দিয়েছিলেন। জাসদও সে কাজটি করেছিলো। জাসদের সভাপতি মেজর (অব.) জলিল, থিঙ্কট্যাঙ্ক কর্নেল আবু তাহের প্রমুখ ছিলেন জিয়াউর রহমানকে প্রতিষ্ঠার সোপান। সেই তাহের ভবিষ্যতে জিয়ার যাত্রা পথের কাঁটা হবেন ভয়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে স্তব্ধ করা হয়। আর মেজর জলিল হাফেজি হুজুরের দলে যোগ দিয়ে ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে বটগাছ মার্কা নিয়ে ভোট করেছিলেন। তাদের উত্তরসূরীরা যদি অধ্যাপক জাফর ইকবালের আহত হওয়ার দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপাতে চেষ্টা করেন, সেটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ তারা ‘বাংলা ভাই’ প্রতিষ্ঠা করে সে অভিজ্ঞতা পূর্বেই অর্জন করেছেন। সে অভিজ্ঞতার আলোকে রিজভীর উপরের বক্তব্য রেখেছেন বলে অভিজ্ঞমহলের ধারণা। আতাউর রহমান ঢালি হয়েছেন তার স্তাবক। ছাত্রমৈত্রী প্রতিষ্ঠার সময় এই আতাউর রহমানেরা নানা বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যক সমর্থক না পাওয়ায় তারা ফজলে হোসেন বাদশার মতামত মেনে নিয়ে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। জননেতা ফজলে হোসেন বাদশা বরাবরই ছিলেন সামরিক স্বৈরশাসন এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী এক আপোসহীন নেতা। ফলে তার ধর্মান্ধতা ও দুঃশাসন বিরোধী দৃঢ় অবস্থানের কারণে ঢালি-স্বপনরা তাদের সুবিধা মতো দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী নানা দুষ্কর্মের সঙ্গে যুক্ত হন। বাগমারা-রানীনগর-আত্রাই-তানোর থানায় বাংলা ভাইয়ের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফজলে হোসেন বাদশার উদ্যোগে ১৪ দল প্রতিরোধী ভূমিকা গড়ে তোলে। বাংলা ভাই রাজশাহী এসে ডিসি-এসপি’র সঙ্গে মিটিং করে বাদশার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়। সেখানে বিএনপি ও জামাতের নেতাদেরও উপস্থিতি রাজশাহীবাসী পর্যবেক্ষণ করেছে। আজকে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন। রিজভী সাহেব হয়তো আওয়ামী লীগকে নিজেদের দলের মতো সন্ত্রাসী-জঙ্গি লালনের দল ভেবে নিজেদের গণবিরোধী দুষ্কর্ম আড়াল করতে চান। কিন্তু দেশবাসী তো তাদের পেট্রোল বোমায় নিরস্ত্র-নিরীহ মানুষকে হত্যা এবং ঝলসে দেয়ার স্মৃতি ভোলেনি। ভোলেনি ২০০১ ও ২০১৪ সালে একাত্তরের কায়দায় খুন-যখন আর লুটপাটের ঘটনা। পিতার কোলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে শিশু সন্তান নিহত হলে যাদের স্বরাষ্ট্র মন্তব্য করেছিলেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ্ নিয়ে গেছে’ তাদের মুখেই ‘উদোর পি- বুদোর ঘাড়ে’ দেয়ার একটা চতুর কৌশল ব্যক্ত হয়। তারা ক্ষমতা দখল করে, জনগণ তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে। এ যাবৎ কালের ইতিহাস সে চিত্রই পরিবেশন করে।
দেশবাসী কোথাও দেখেনি, বিএনপি ও তাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী জামাত ইসলাম জাফর ইকবালের ওপর হামলার প্রতিবাদে একটি কর্মসূচি পালন করেছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আরবি-ইসলামিক স্টাডিস-ইসলামের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র-শিক্ষকেরা ইসলামকে ভাঙিয়ে যারা মানবতা বিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তারাও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কর্মসূচি পালন করতে দেখেনি। তাদেরই দায়িত্ব এই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আয়োজন করা। কেনো না তারা ইসলামকে বেশি সমর্থন ও পছন্দ করেন। তাদের সমর্থিত বিশ্বাসকে ভাঙিয়ে যে সব জঙ্গি এবং সন্ত্রাসী খুন-যখমে মেতে উঠেছে, তাতে ইসলামেরই অপবাদ ছড়াচ্ছে। এটা তাদের স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যে করতে দেয়া যায় না। দিলে একটি ধর্মের অপযশ হয়। কেউ নবী বা কোরআনের বিরুদ্ধে কিছু বললে বা লিখলে যদি সেটার সত্যতা যাচাই না করে লাঠি-দা আর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়, তাহলে যারা সরাসরি ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষ খুন, ধর্ষণে লিপ্ত হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে তো এই সব বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রিদেরই অবস্থান নেয়ার কথা। না হলে ইসলামের বিরুদ্ধে কে কি লিখলো, বললো সেদিকে না তাকিয়ে নিজেদেরই এই ধর্মব্যবসায়ী খুনিদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়ার দায়িত্ব এই সব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। নতুবা কেউ ভাবলে বোধ হয় ভুল করবে না যে তারাও জঙ্গিবাদের বিশ্বাসী। মন্ত্রণাদাতা। আশ্রয়দাতা ও অর্থ যোগানদাতা। এ বিষয়ে তাদের বিবেকই বা কি বলে জানি না! তবে ধর্মের সদুদ্দেশ্য ও মানবতার দিক নির্দেশনাতে যারা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে ধর্মকে বিতর্কিত করছে, তাদের প্রতিরোধে ভূমিকা নিতে হবে। রিজভীদের মতো ছদ্মদেশপ্রেমীরা গোয়েবলসের মতো মিথ্যেচার করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার সুযোগ পাবেন।
সামনে জাতীয় নির্বাচন। উপরন্তু এই সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে। এই সময় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে যারা দেশে-বিদেশে নানামুখী ষড়যন্ত্র করছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা জরুরি। ১৪ দল সে দায়িত্ব এড়াতে পারে না। জাফর ইকবাল এবং দেশের মুক্তচিন্তার অধিকারীদের কারা আক্রমাণ এবং খুন করেছে সেটি জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট করা দরকার। একাত্তরে যারা ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার শ্লোগান দিয়ে নির্বিচারে হত্যা-ধর্ষণ আর লুটপাট করে জনমানসে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলো, তারা চিহ্নিত আজকে। তাদের বিচারও চলছে। অনেকেরই বিচার শেষে রায় কার্যকরও হয়েছে। এখনো সেই ধর্মান্ধ-সাম্প্রদায়িকদের অনুসারীরা দেশে তাদের দুষ্কর্ম নির্বিবাদের করছে। বলছে নানা অপকথা। দেশ বিরোধী, দেশের অর্জনবিরোধী কথা। রিজভীরা তাদেরই অন্যতম। তাদের নেত্রী জনসভায় ত্রিশ লক্ষ শহিদের অঙ্ক নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, নেত্রীর মূর্খ পুত্র বিলেতে আত্মগোপনকারী বলেছে, তার পিতা জিয়াই নাকি দেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট। এই যে লাগামহীন মিথ্যেচার, ইতিহাস বিকৃতি, তার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা ১৪ দলের রাজনীতিক কার্যক্রমের মধ্যে পড়ে।
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুশীলন নাট্যদলের এক কর্মী মাইনুলের ওপর চড়াও হয় সরকার দলীয় এক কর্মী। তাকে ইতোপূর্বে সংগঠন থেকে বহিস্কারও করা হয়। এদের রাজনীতিক পরিচয় কি? এরা হাইব্রিড, অন্য সংগঠন থেকে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনে পুনর্বাসিত হয়েছে। সংগঠনের ভাবমূর্তী এবং গৌরবময় অতীতকে ম্লান করতে তারা এসে জুটেছে সরকারি সংগঠনে। এসেই নানা ধরনের অপকর্ম আর দু নম্বরী করে সংগঠনের কার্যক্রম ব্যহত করছে সেই সঙ্গে দলকে করছে প্রশ্নবিদ্ধ। এরা কি সংগঠনে অনিবার্য? যদি তা-ই হয়, তাহলে এদের নিয়েই দল করুন, নয়তো এদের বিতারণ করে দলের শুদ্ধি অভিযান চালানো আবশ্যিক। সামনে সিটি নির্বাচনও। সেখানে এই সব কর্মী আর নেতা যদি নির্বাচনের প্রচারে অবতীর্ণ হয়, তাহলে শুভ কিছু প্রত্যাশা করা যাবে না। ইতোমধ্যে দলে অনেক স্বাধীনতা বিরোধী আর তাদের সন্তান এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা শক্ত জায়গা করে নিয়েছে। এরা যে কার্যক্রমে যুক্ত তা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। বরং এরাই দলের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রচ্ছন্নভাবে এরা সাম্প্রদায়িক, বাংলাদেশ বিরোধী কনসেপ্ট অন্তরে পোষণ করে। রোহিঙ্গাদের মায়ানমার থেকে তাড়িয়ে দেয়াকে এরা মুসলিম বিতারণ মনে করে। মনে করে না জাতিগত বিদ্বেষের কথা। একটি ভাষ-গোষ্ঠির ওপর আক্রমণ। সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শত্রুতা। ভূমি দখল এবং ভূমির নিচের সম্পদ দখলের আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। তাই এদের বক্তব্য অনেকটাই ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক স্বার্থকে সংরক্ষণ করে। এদের সঙ্গে ভেতরে ভেতরে রিজভীর বক্তব্য মিলে যায়। এদের রুখতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের। আজকের প্রজন্মকে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল দল ও সংগঠনকে। কারণ এরাও কোনো না কোনো ভাবে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী। এরা দেশের সমুদয় অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। করছে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ। আগামী নির্বাচনী প্রচার হবে এদের ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দেয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করার মধ্যে দিয়ে।