জাতিসংঘ ও বিশ্ব ব্যাংক প্রধানের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বই সমুন্নত মানবাধিকার

আপডেট: জুলাই ৪, ২০১৮, ১:১৩ পূর্বাহ্ণ

নাগরিক অধিকার ছাড়া মিয়ানমারে ফিরতে নারাজ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসে ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের নেতৃত্বে আসা শীর্ষ দলকে এ কথা জানিয়েছেন সে দেশের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা।
সোমবার বালুখালি ট্রানজিট পয়েন্টের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন বিশ্বের শীর্ষ দুই প্রতিষ্ঠান প্রধান। ওইসময় তারা রাখাইন সেনাদের নিপীড়ন, নির্যাতন কথাও তুলে ধরেন। রাখাইনের ঘটনা বলার পর আন্তর্জাতিক শীর্ষ দু’সংস্থার প্রধানের কাছে তাদের (রোহিঙ্গাদের) এ আকাক্সক্ষার কথা তুলে ধরেন জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতরা।
জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের এই সফর বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বের শীর্ষ দুই প্রতিষ্ঠানের এই সফর রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনে ফলপ্রসু ভূমিকা রাখতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। জাতিসংঘ প্রধান যে মুহূর্তে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করছেন, তখন জাতিসংঘোর একটি সিদ্ধান্তের ব্যাপরেও বেশ সমালোচনা হচ্ছে বিশ্ব জুড়েই। হয়ত এই সমালোচনার রেশ ধরেই জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসে ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্টসহ একটি শীর্ষ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করছেন।
রয়টার্স পরিবেশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে পারলেও সেখানকার নাগরিকত্ব কিংবা দেশজুড়ে অবাধ চলাচলের সুযোগ পাবেন কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা ছাড়াই দেশটির সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ‘গোপন চুক্তি’ করেছে জাতিসংঘ।
মে-র শেষ দিকে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তির রূপরেখায় দুই পক্ষই বাংলাদেশের আশ্রয়ে থাকা লাখ লাখ রোহিঙ্গার নিরাপদে ও নিজেদের পছন্দ অনুসারে ফেরত যাওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। জাতিসংঘ কিংবা মিয়ানমার সরকারের কেউই চুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। যদিও দুই পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) একটি অনুলিপি হাতে পেয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ফাঁস হওয়া অনুলিপিটি অনলাইনেও ছড়িয়ে পড়েছে।
পর্যবেক্ষরা বলছেন, সমঝোতা স্মারকে যে ‘বিদ্যমান আইন ও বিধানের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে রাখাইন রাজ্যেই অবাধ চলাচলের সুযোগ পান না রোহিঙ্গারা। যে কারণে নিজভূমে ফিরতে পারলেও তাদের দুর্দশা লাঘব হবে না বলেও শঙ্কা তাদের।
মানবাধিকারের প্রথম গুরুত্বটি হলো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠির নাগরিকত্ব। নাগরিকত্বের মধ্যেই ব্যক্তি-মানুষের আত্মমর্যাদা, সম্মান ও সম্ভ্রমবোধ এবং তার সহজ অভিগম্যতা ও চিন্তার স্বাধীনতা নির্ভর করে। রোহিঙ্গাদের এই অধিকারটিই অগ্রাধিকার প্রাসঙ্গিলতার বিষয়। মায়ানমার সেনাবাহিনির যে বর্বরতা তা ছিল রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। এর চেয়ে ঘৃণ্য ও নির্মম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আর কিছু হতে পারে না। আর এই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে মেনে না নেয়া দুরভিসন্ধিমূলক অভিপ্রায় থেকে। এবং এটিই মূল সমস্যা। এটার মিমাংসাটাই এই মুহুর্তের সবচেয়ে জরুরি মানবিক কাজ। যে জনগোষ্ঠি কয়েকশ বছর ধরে একটি ভূখ-ে বসবাস করছেÑ ইচ্ছে করলেই তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার যায় না। মাইগ্রেশন মানবজাতির সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। এটাকে অস্বীকার করা মানবসভ্যতার বিকাশ ও সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা। ফলস্বরূপ হিংসা-বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতারই জন্ম দিয়ে থাকে। মায়ানমার সেটাই করেছে।
বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা যথার্থই দাবি করেছে যে তারা নাগরিক অধিকার ছাড়া স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন না। কেননা নাগরিকত্ব ছাড়া স্বদেশে ফেরৎ গেলে তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হবে না। বরং তারা আরো নিষ্ঠুর ও নির্মম প্রতিশোধস্পৃহার মুখে পড়তে পারে। রোহিঙ্গাদের নাগরিক মর্যাদা নিয়েই স্বদেশে ফেরৎ পাঠানো সমীচীন হবে। জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন শেষে নিশ্চয় সেই সত্য-অনুধাবনে সমর্থ হয়েছেন এবং তাঁরা সেটাই করবেন যাতে রোহিঙ্গাদের আত্মমর্যাদা মানবাধিকার সম্পূর্ণরূপে সমুন্নত থাকবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ