জাতীয় বাজেট ২০১৯-২০২০ সংক্রান্ত নাগরিক প্রস্তাবনা স্থায়ীত্বশীল উন্নয়ন অভিযাত্রায় কাউকে পেছনে রাখা যাবে না

আপডেট: জুন ১, ২০১৯, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

পর্যালোচনা প্রতিবেদন


জাতীয় বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আর্থিক দলিল যা গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, অধিকার ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের অঙ্গীকার সমৃদ্ধ বার্ষিক আয়-ব্যয় পরিকল্পনা। জনঅংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া নাগরিক সমাজের মতামত দিয়ে সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ হয়। সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান- সুপ্র তৃণমূল নাগরিক সমাজের সংগঠন সমূহের একটি জাতীয় জোট। সুপ্র স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বাজেট সংক্রান্ত পরামর্শ সভার মাধ্যমে নাগরিক অধিকার, প্রত্যাশাসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রস্তাবনা প্রস্তুত করে অধিপরামর্শের কাজ করছে বিগত দুই দশক ধরে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে দ্রুত অগ্রসরমান একটি দেশ। বাংলাদেশ দারিদ্র্য ও ক্ষুধা বিরোধী সংগ্রামে দক্ষিণ এশিয়ায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনকারী দেশ। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৮ সালে বাংলাদেশে দারিদ্রের হার ২১.৮ শতাংশ আর অতি দারিদ্রের হার ১১.৩ শতাংশ। এই সময়ে দারিদ্র্য তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেলেও বর্তমানে দেশে ৩ কোটি ৭৬ লক্ষ মানুষ (সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, অক্টোবর ২০১৮) দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে।
বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে ব্যাপক সাফল্য লাভ করছে। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১৭৩৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কর্মকা- জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের মূল চালিকাশক্তি, যার পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী মানুষের বিপুল অবদান। কিন্তু উন্নয়নের সুফল ও সুবিধার বাইরে থাকছে এসব প্রান্তিক মানুষ। অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য বেড়ে চলেছে প্রকটভাবে। আয় ও সম্পদ বাড়ছে অল্প কিছু মানুষের। ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও সমাজে বিদ্যমান জীবনযাত্রার বৈষম্য ক্রমশঃ উর্দ্ধমুখি। প্রান্তিক ও পিছিয়েপড়া মানুষের আয় ও জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা পেরোতে পারছে না জাতীয় অর্থনীতি। দুর্ভাগ্যবশত অসমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ঘাটতিও বেড়ে চলছে। একটি অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়ন প্রক্রিয়া স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের জাতীয় বাজেট সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জনকল্যাণের পথে কার্যকর, দায়বদ্ধ হবে এটাই সবার প্রত্যাশা।
ক্স সবার জন্য মানস্মত শিক্ষা ও ব্যায় বরাদ্ধ:
স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষার জন্য অধিক বিনিয়োগসমৃদ্ধ বাজেট প্রণয়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে শিক্ষার আধুনিকায়ন ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষায় বিনিয়োগ উন্নয়নের পথ তৈরি করে সবার জন্য সুফল বয়ে আনে। ২০১২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষাখাতে জিডিপি’র ৬% বরাদ্দ প্রদান করার প্রতিশ্রতি দিয়েছিলেন। বিগত বছরগুলোতে শিক্ষা বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫৩,৫০৪ কোটি টাকা বা মোট বাজেটের ১৪.২ % যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের বরাদ্দের তুলনায় শতকরা ৩০ শতাংশ বেশি। জিডিপি’র হারে বরাদ্দ ২.৯৪ % যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তুলনায় ০.৮৭% বেশি। এতদসত্ত্বেও প্রতিশ্রুত হারের তুলনায় এ বরাদ্দের হার এখনো ৩.০৬ % কম। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পেঁৗঁছানো যাচ্ছে না। সুতরাং শিক্ষা অধিকার নিশ্চিতকরণে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ নি¤œলিখিত দাবি জানাচ্ছি:
ক্স দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা অর্জনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি।
ক্স শিক্ষকের সংখ্যা বাড়িয়ে শিক্ষার্থী শিক্ষক অনুপাত ৩০-১ নিশ্চিত করার জন্য তহবিল নিশ্চিতকরণ।
ক্স সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের জন্য পুষ্টিমান সম্পন্ন দুপুরের খারার সরবরাহের জন্য বাড়তি বরাদ্ধ।
ক্স জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিক্ষাখাতে বাজেটের কমপক্ষে ২০% বা জিডিপি’র ৬% বরাদ্দ নিশ্চিতকরন
ক্স সবার জন্য স¦াস্থ্য:
এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা ’সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণে’ অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা একটি বড় চ্যলেঞ্জ। বিগত দুই অর্থবছরে বাজেট বরাদ্ধের পরিমাণ বাড়লেও তুলনামুলকভাবে বাড়েনি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ২০ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ২৩ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ৫.২% এবং জিডিপির ০.৯২%। যদিও এটা মোট বরাদ্দ আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে, মোট বাজেট এবং জিডিপি’র অনুপাত অনুযায়ী হ্রাস পেয়েছে। সবার জন্য স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রয়োজন।
অপরদিকে তামাক ব্যবহারজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে (সূত্র : বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, ২০১৮)। সম্প্রতি এক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা (সূত্র : ‘ইকনোমিক কস্ট অব টোবাকো ইউজ ইন বাংলাদেশ : এ হেলথ কস্ট অ্যাপ্রোচ’ শীর্ষক)। অন্যদিকে আর্ন্তজাতিক ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের সাস্প্রতিক তথ্যানুযায়ী ব্রিটিশ অ্যামেরিকান টোবাকো (বিএটি) তাদের মুনাফার উপর স্থানীয় নির্দিষ্ট হারে কর ফাকি দিয়ে গত ২০১৪ হতে ২০১৬ এর মধ্যে ২ কোটি ১০ লাখ ডলার (১৭৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা) যুক্তরাজ্যে স্থানান্তর করে। এতে করে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ৫৮ লাখ ডলার কর হারিয়েছে যা দেশটির ২ লাখ মানুষের বার্ষিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বহন করা সম্ভব।
ক্স কমিউনিটি ক্লিনিকে ডাক্তারের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সহ সেবার মানোন্নয়নে অর্থায়ন করতে হবে।
ক্স ইউনিয়ন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স ও ওষুধ সরবরাহ করতে হবে।
ক্স ডাক্তার-রোগীর আনুপাতিক হার বৃদ্ধি করতে হবে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অত্যাধুনিক স্বাস্থ্য সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।
ক্স স্বাস্থ্যসেবার বানিজ্যিকিকরণ রোধ করে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ব্যয়ের পরিমাণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।
ক্স স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতে ক্ষতিকর তামাকপণ্যের উপর সুর্নিদিষ্ট উচ্চ-হারে কর বৃদ্ধি করতে হবে;
ক্স বিএটিসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানি কর্তৃক কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে;
ক্স উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিকরনে স্বাস্থ্যখাতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে কমপক্ষে জিডিপি-এর ৩% অথবা মোট বাজেটের ১০ % বরাদ্দ দেয়ার পাশাপাশি বাজেট ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে;
ক্স কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষা:
চলতি বাজেটে সরকার কৃষি গবেষণালদ্ধ ফলাফল, কৃষি তথ্য ও প্রযুক্তি এবং কৃষি সেবা কৃষকের দোড়গোড়ায় পৌঁছাতে সারাদেশে ২৩৫ টি কৃষক সেবা কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তুু সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কৃষক তার উৎপাদিত দ্রব্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। এমনকি কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যুনতম উৎপাদন মূল্যও ফেরত পাচ্ছে না। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কৃষিখাতে প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৬ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ৬.১% মাত্র। যা বিগত বছরের (২০১৬-২০১৭) তুলনায় ২২ শতাংশ বেশি। কিন্তু এই বরাদ্দ বিগত অর্থবছরের তুলনায় মোট বাজেটের ০.০৬% কম। অর্থাৎ কৃষি দেশের অন্যতম প্রধান খাত হওয়া সত্ত্বেও কৃষিতে বরাদ্দ না বেড়ে বরং কমেছে। প্রকৃতপক্ষে ক্ষুদ্র কৃষকের ন্বার্থ সংরক্ষণে স্থায়ীত্বশীল কৃষি উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া দরকার। তাই;
ক্স ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের স্বার্থে স্বায়ীত্বশীল কৃষি ব্যাবস্থার উন্নয়নে কৃষিখাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে;
ক্স কৃষকের উৎপাদিত ফসলের মূল্য নিশ্চিতকরণে সবকারি ক্রয়ব্যাবস্থায় আরো অর্থায়ন করতে হবে।
ক্স দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষক সেবা কেন্দ্র কার্যকরভাবে চালু করতে হবে;
ক্স বহুজাতিক কোম্পানিসমূহের হাত থেকে কৃষিকে বাচাতে জরুরি ব্যাবস্থা নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ বাংলাদেশ। ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট বাংলাদেশ গড়তে জলবায়ু পরিবর্তন কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনাসহ ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় “পরিবেশ, বন, জীববৈচিত্রের সংরক্ষণ” ও “জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা” কে গুরুত্ব প্রদান খুবই ইতিবাচক। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পরিবেশ দুষণকারী দেশসমূহের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে সরকারের উদ্যোগী ভূমিকার ঘাটতি রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে জলবায়ু সংক্রান্ত বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৯.২০% যা বিগত বছরের তুলনায় নি¤œমুখি। পরবর্তীতে ২০১৭-২০১৮তে এই খাতে বরাদ্দ ছিলো ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা যা সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ কমে এসে ৮৯১ কোটি টাকাতে দাড়ায়। পরবর্তী ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে এ খাতের বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয় ১ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। বর্তমান বছরে টেকসই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধিও আবশ্যক। এক্ষেত্রে;
ক্স জলবায়ু পরিবর্তন ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে বনভূমি ও সবুজ বেষ্টনী কার্যকর করতে হবে।
ক্স ক্ষতিগ্রস্ত কম্যুনিটি সমূহের ও বিশেষভাবে কৃষকদের জলবায়ূ মোকবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বরাদ্ধ বাড়াতে হবে।
ক্স ধনী দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
ক্স সামাজিক সুরক্ষা
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য সাফল্য সত্ত্বেও দারিদ্র, বৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের বিপদাপন্নতা মোকবেলার কর্মসূচি খুবই দুর্বল। সরকারের ২০১৬ সালের সামাজিক সুরক্ষার জাতীয় কৌশলপত্র একটি প্রগতিশীল সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে সংশোধিত বাজেটের পরিমাণ ছিলো ৪৮ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা যা বাজেটের ১৩.০৬ শতাংশ এবং জিডিপির ২.১৭ শতাংশ। চলতি অর্থ বছরে ২০১৮-২০১৯ এই খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিলো ৬৪ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা যা বাজেটের ১৩.৮১ শতাংশ এবং জিডিপির ২.৫৩ শতাংশ। এ বছরে ভাতার হার ও ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোসহ এই কার্যক্রমকে লক্ষ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সংস্কার জি-টু-পি (সরকার থেকে ব্যক্তি) পদ্ধতিটি ক্রমান্বয়ে চালুর কার্যক্রমটি প্রশংসনীয়। তবে আন্তর্জাতিক মানদ-ের বিচারে বাংলাদেশে এই কর্মসূচিটি অনেকখানি পিছিয়ে রয়েছে বিশেষ করে শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের তুলনায়। এক্ষেত্রে সুবিধাভোগীর হার ও সামাজিক নিরাপত্তায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
ক্স সামাজিক সুরক্ষার জাতীয় কৌশলপত্র অনুযায়ী জীবনচক্র ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কার্যকর করতে হবে।
ক্স সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগীর পরিমাণ ও বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে।
ক্স সকল নাগরিকের জন্য জাতীয় পেনশন ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
ক্স কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক এই কার্যক্রমটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
ক্স প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচনে, সম্পদ ও সুবিধা প্রদানে জনঅংশগ্রহণ এবং জবাবদিহিতা থাকতে হবে।
ক্স বর্ধিত অর্থায়ন, কর সুবিচার, অর্থ পাচার রোধ ও বৈশ্বিক সংহতি:
দেশে ধনী দরিদ্রেও আয় ও সম্পদ বৈষম্য ক্রমউর্দ্ধমুখি। দারিদ্র দূরীকরণ ও বৈষম্য কমাতে ব্যাপক অর্থায়নের জন্য প্রয়োজন প্রগতিশীল কর সংস্কার। বিশেষত কাক্সিক্ষত পরিমাণ আয়কর আহরণ, সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা সুষমকরণের দ্বারা সামাজিক সুবিচার নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও অঞ্চলগত উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণের জন্য জরুরি। বিগত বছরসমূহে এনবিআর কর বাড়ানোর বৃদ্ধিও অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু প্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়নি। আমাদের কর সংগ্রহ মূলত নির্ভর করে অপ্রত্যক্ষ করের উপর, যা ৬৪.৭৩%। বাকী ৩৫.২৭% প্রত্যক্ষ কর। অর্থ মস্ত্রণালয়ের জরিপ অনুযায়ী ৪৫-৬৫% করযোগ্য আয় থেকে কর সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আসন্ন বাজেটে করের হার না বাড়িায়ে এর আওতা কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ অর্থবছরে করদাতার সংখ্যা ২২ লাখ থেকে ১ কোটিতে উন্নীত করার কথাও বলেছেন। এটি সত্যি যে বাজেটের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে করের আওতা, পরিধি সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি রোধ করে দেশের আয়কর ব্যবস্থাপনার গ্রহণযোগ্যতা ও এর বাস্তবায়নযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা বর্তমানের সময়ে খুবই জরুরি।
আমাদের কর জিডিপি অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদ-ে অনেক পিছিয়ে। এটি মাত্র ১০% যা আমাদের প্রতিবেশী ভারত ও নেপালে ১৭% থেকে অনেক কম। প্রত্যক্ষ কর বাড়ছে না কারণ বিত্তবান ও ধনীরা কর মওকুফ পাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের উপর অপ্রত্যক্ষ করের বোঝা বাড়ছে। প্রত্যক্ষ কর ও অপ্রত্যক্ষ করের অনুপাত ঋণাত্মক, যেখানে দরকার প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর জন্য প্রগতিশীল কর সংস্কারের।
বিভিন্ন কর্পোরেট গোষ্ঠী, বহুজাতিক কোম্পানিসহ বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর নিয়মের বিভিন্ন ফাঁকফোঁকর গলিয়ে নিয়মিত কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে যার মাধ্যমে সরকার বড় অংকের কর রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যেকোনো ঘাটতি বাজেটের দেশে এরকম রাজস্ব বঞ্চনা নিঃসন্দেহে কর সুবিচার পরিপন্থী। ধনীক শ্রেণির অর্থ পাচার রোধ একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। গ্লোবাল ফাইনানশিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রতিবেদন বলছে; ২০১৫ সালে ৫৯০ কোটি ডলার প্রায় ৫০,০০০ কোটি টাকা শুধুমাত্র বাণিজ্যিক লেনদেনের মাধ্যমে পাচার হচ্ছে বিদেশে। এটি বিগত বছরসমূহের গড়ের কাছাকাছি। এর বাইরে নানান পন্থায় আন্তর্জাতিক করস্বর্গ সমূহে ও অফশোর কোম্পানিতে চলে যাচ্ছে হাজার কোটি টাকা। জনগণের টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে যাওয়া রোধ করতে পারলে আমাদের কাক্সিক্ষত স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। তাই কর ফাঁকি রোধে ও অর্থ পাচার রোধে সরকারকে আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ক্স প্রত্যক্ষ কর নির্ভর বাজেট প্রণয়ন করতে হবে, করের বিপরীতে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে
ক্স নিত্য প্রয়োজনীয় সেবা ও দ্রব্যের উপর মূসক বা ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে;
ক্স কর্পোরেট কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ও দৃঢ় পদেক্ষপ গ্রহণ করা সহ বহুজাতিক কোম্পানি কর রেয়াত সুবিধার পুনঃমূল্যায়ণ করতে হবে;
ক্স বাংলাদেশের বর্তমান তামাক কর কাঠামো অত্যন্ত জটিল। তাই তামাক কর কাঠামো যুগোপযোগী করাসহ ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন ২০১৩ এবং ধুমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০১৫ এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং তামাকপণ্যের উপর আরোপিত স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ২% উন্নীত করতে হবে;
ক্স উপসংহার:
ক্স আমাদদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে দারিদ্র নির্মূল ও বৈষম্য কমাতে বিত্তবান নাগরিক ও ধনিক শ্রেণির উপর করের চাপ বাড়াতে হবে, বাড়তি রাজস্ব দিয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষের জন্য কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। জিডিপি’র অনুপাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এছাড়াও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সৃষ্টি, উপকারভোগীর সেবা নিশ্চিত, সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করাসহ সময়পোযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ক্স সর্বোপরি জনসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শক্তি কাজে লাগিয়ে দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলা ও সামষ্টিক অর্থনীতির ধারাবাহিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে সেবা খাত, রফতানিমুখি খাতসমূহের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
ক্স অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থা, জনঅংশগ্রহণ স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।
ক্স কাউকে পেছনে রেখে নয় বরং সকলকে একসাথে নিয়ে এই স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন অভিযাত্রায় আমরা অংশগ্রহণ করতে পারি, আমাদের জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট সেদিকে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে প্রণীত হবে বলে আমরা আশা রাখি।