জাতীয় বাজেট ২০১৯ – ২০ : একটি সংক্ষিপ্ত সমীক্ষা

আপডেট: জুন ১৭, ২০১৯, ১২:১০ পূর্বাহ্ণ

মো. নূরল আলম


১৩ জুন, ২০১৯ বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী জনাব আ.হ.ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ সরকারের ২০১৮-১৯ সালের সম্পূরক বাজেট ও ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর চলতি মেয়াদের প্রথম ও টানা ১১তম বাজেট এবং সবমিলিয়ে এটি ১৯তম বাজেট। আর বাংলাদেশের এটি ৪৮তম বাজেট। উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে জনাব তাজউদ্দীন আহমেদ ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন।
‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’ শিরোনামে রচিত এ প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে মোট ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা যা জিডিপির ১৮.১ শতাংশ। চলতি বছরের মূল বাজেটে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা থাকলেও তা কমিয়ে করা হয় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা যার মধ্যে পরিচালন খাতে ব্যয় হবে ৩ লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত রাজস্ব আয়ের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব ব্যুরোর (এনবিআর) কর থেকে আসবে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, এনবিআর বহির্ভূত কর থেকে ১৪ হাাজার ৫০০ কোটি টাকা, কর ছাড়া প্রাপ্তি ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক অনুদান থেকে সম্ভাব্য প্রাপ্তি ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। চলতি বছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী বছরে তা বৃদ্ধি হলো ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। অনুদান ছাড়া বাজেটের প্রস্তাবিত ঘাটতি দাড়াবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫ শতাংশ। চলতি বছরে এ ঘাটতি ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।
বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা যা ইতোমধ্যেই অনুমোদিত। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮.২০ শতাংশ – যা চলতি বছরে ছিল ৮.১৩ শতাংশ এবং যা ২০৩০ সালে হতে পারে ১০ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতির সম্ভাব্য হার ৫.৫ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য ধরা হয়েছে অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। চলতি বছরে এটা ছিল ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র মুনাফা থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক উৎস থেকে ধরা হয়েছে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ চলতি বছরে ধরা ছিল ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা যা সংশোধিত বাজেটে বৃদ্ধি করে করা হয় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। নতুন বছরের জন্য জিডিপির আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। চলতি বছরের জন্য এটা ছিল ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল ও ক্রমপ্রসারিত অর্থনীতির জন্য বাজেটের আকার (জিডিপির প্রায় ১৮%) যথাযথ হয়েছে বলে মনে হয়। কিন্তু প্রধান সমস্যা হতে পারে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে। যাই হোক – এ প্রস্তাবিত বাজেটের প্রধান কয়েকটি ভাল দিক রয়েছে। সেগুলো হলো – নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি না পাওয়ার আশ্বাস প্রদান। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এ আশ্বাস সত্য হলে তাকে জনগণ সাধুবাদ জানাবে। বাজেটের আর কয়েকটি ভাল দিক হলো- দেশের জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের বিদ্যমান হার ২৩.৪ শতাংশ থেকে বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা, বাজেটে পুঁজি বাজার উন্নয়নে একগুচ্ছ প্রণোদনা দানের প্রস্তাব, তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে ৫ শতাংশ রপ্তানি প্রণোদনার প্রস্তাব, বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনতে ২ শতাংশ প্রণোদনা, প্রবাসীদের পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য বিমা সুবিধা এবং কৃষকদের জন্য শস্য বিমার কথা বলা হয়েছে বাজেটে। স্কুল কলেজ এমপিও ভুক্তির কথাও বলা হয়েছে বাজেটে।
২০১২ সালের পাঁচ স্তরের ভ্যাট আইন নতুন বাজেট থেকে শুরু করা হবে যদিও এ বিষয়ে ব্যবসায়ী মহলে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। কর অবকাশ বৃদ্ধি করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রস্তাব করা হয়েছে। কিছু কিছু শিল্পের উপকরণ আমদানির উপর আরোপিত শুল্ক হার বৃদ্ধি করে সেই সব দেশি শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা ও উৎসাহ দানের কথা বলা হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নতুন ১৩ লক্ষ মানুষকে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে মোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা দাড়াবে ৮৯ লাখ- যা চলতি বাজেটে আছে প্রায় ৭৬ লাখ। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এটা হবে একটি ভাল পদক্ষেপ। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান ও সব ধরনের ব্যবসা উদ্যোগ সৃষ্টির জন্য আগামী বাজেটে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নদী ভাঙ্গন ও অন্যান্য দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। দুর্যোগ কবলিত জনমানুষের জন্য এটি একটি উপযোগী প্রস্তাব।
আবাসন খাতের চলমান স্থবিরতা কাটাতে আগামী বাজেটে ফ্ল্যাট ও প্লটের নিবন্ধন ফি হ্রাসের প্রস্তাব করা হয়েছ। এ সিদ্ধান্তের ফলে আবাসন খাতের উন্নয়ন ঘটবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। বয়স্কভাতার সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪০ লাখ থেকে বৃদ্ধি করে ৪৪ লাখ করার প্রস্তাব রয়েছে।
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে বাজেটে। এর ফলে গ্রামঅঞ্চলে অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হবে এবং গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য হ্রাস পাবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে যোগাযোগ ও মানব সম্পদ খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ১১.৬৮ শতাংশ। চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৫৩ হাজার ৫৪ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ১১.৫৩ শতাংশ। শিক্ষা খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, এমপিও ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ, শিক্ষক- কর্মচারীদের বেতন ভাতা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও সর্বোপরি শিক্ষার মান উন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির যৌক্তিক দাবি রয়েছে। এছাড়া কৃষি খাতে ২৮ হাজার ৩৫৩ কোটি, জনশৃংখলা ও নিরাপত্তা খাতে ২৭ হাজার ৬৩৭ কোটি, স্বাস্থ্য খাতে ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি এবং পরিবহণ ও যোগাযোগ খাতে ৬৪ হাজার ৮২০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশে আপামর জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুবিধা বৃদ্ধির স্বার্থে স্বাস্থ্য ও মাতৃকল্যাণ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। সুদ পরিশোধ খাতে বাজেটের ১০.৯ শতাংশ এবং জন প্রশাসন খাতে বাজেটের ১৮.৫ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে যে বড় অংকের রাজস্ব আহরণের কথা বলা হয়েছে তা এনবিআর এর নিজস্ব সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে বাস্তবায়ন করা নিয়ে সংশয় রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন।
বাজেটে ঘাটতির আকার বড় হওয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের ওপর নির্ভরতা বেশি থাকবে। এর ফলে ব্যাংকিং খাত থেকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যেতে পারে এবং এজন্য ব্যাংকের সুদহারও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞ মহলে ধারণা। বেসরকারি খাতে ঋণের স্বল্পতা দেখা দিলে বিনিয়োগ সংকুচিত ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাংক ব্যবস্থার তারল্য ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান এবং সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা সম্প্রতি বিভিন্ন মহলে বলা হলেও প্রস্তাবিত বাজেটে এ সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ঘোষণা নেই। উপরšু‘ ঋণ খেলাপিদের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বাজেটে বলা হয়নি। ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কী ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি।
এ বাজেট নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের জন্য অস্বস্তিকর সংবাদ নিয়ে এসেছে। এ খাতে সুদহার না কমলেও উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাব গৃহিত হলে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অর্থনীতিবিদগণও সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক বলে মত দিয়েছেন। এ বাজেটে কৃষকদের অবস্থা উন্নয়নের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তাদের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা প্রতিকারের বিষয়ে বাজেটে কোনো দিক নির্দেশনা নেই।
প্রস্তাবিত বাজেটে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্য হ্রাসের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা দেখা যায় না । পাশাপাশি দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব লাঘবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের কোনো দিক নির্দেশনা বাজেটে নেই। ভ্যাট আইন কার্যকরে সরকারকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে ও নজরদারি বাড়াতে হবে। তা না হলে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। অসাধু উপায়ে পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে তা ক্রেতাদের প্রকৃত আয় হ্রাস করবে।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৯- ২০ সালের প্রস্তাবিত বাজেট যথাযথ ও পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হলে এবং এ লক্ষ্যে দুনীতি প্রতিরোধ ও সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা হলে দেশের জনগণ এ বাজেট দ্বারা কম বেশি উপকৃত হতে পারে মর্মে প্রত্যাশা করা যায়।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি (অব) ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড