জীবন থেকে নেয়া প্রতিবন্ধকতা জয় করে জীবনের জয়গান

আপডেট: মার্চ ৩, ২০১৯, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

তাসনিয়া তারান্নুম


সামর্থের মধ্যে কর্ম করে জীবনের কঠিন বাস্তবতার লড়ছেন অনেকে, আবার কেউবা ভিক্ষা করে সংসার চালাচ্ছেন। প্রতিবন্ধিতা সম্বল করে কেউ ভিক্ষা করে, আবার কেউ প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে জীবনকে অর্থবহ করে তোলে, জীবনকে মহিয়ান করে; অন্যের জন্য জীবন সংগ্রামের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত তৈরি করে। তেমনি এক তরুণ দম্পত্তি মনসুর আলী ও খাদিজা বেগম। স্বামী-স্ত্রী মিলেই জীবন-জীবিকার সংগ্রাম। নগরীর উপশহর মোড়ে, ফুটপাত ঘেঁষে ছোট ছাউনিতে চা-বিস্কুটের দোকান। মনসুর (৩৭) কানে শুনতে পান না। স্ত্রী খাদিজা (৩০) সার্বক্ষণিক সহযোগিতায়। মনসুরের প্রতিবন্ধকতা মোটেও জীবনের ছন্দপতন ঘটাতে পারে নি। বরং জীবন-নদী ছুটছে স্বপ্ন-অভীষ্ট লক্ষ্যে।
মনসুর আলি নিরক্ষর। মানুষের কথা বোঝেন না। সার্বক্ষণিক সহযোগিতায় স্ত্রী। চা বিক্রি করেই স্বপ্নের বুনন- সাত বছরের সুমাইয়া নিশ্চয় একদিন একজন বড় মানুষ হবে। সমাজে মাধা উঁচু করে বাঁচবে।
২০০৯ সালে মনসুর- খাদিজা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। খাদিজার ফুফাতো দুলাভাইয়ের মাধ্যমে বিয়ে ঠিক হয়েছিল। খাদিজা রাজশাহী বিসিক এলাকায় এক সিল্ক কারখানায় সুতো গিট দেয়ার কাজ করতেন কিন্তু স্বামী শুনতে পায় না, অন্যকে বুঝতে পারে নাÑ এটা ভেবে কারখানার চাকরি ছেড়ে দেন। মনসুরকে চায়ের বিকিকিনিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। শুধু চা বিক্রি করেই চলে না, আরো অর্থের প্রয়োজন। স্বামীকে সহযোগিতার সাথে সাথে বাসাবাড়িতে কাজও করেন। সেখান থেকে মাসিক এক হাজার টাকা আয় হয়। চা দোকান থেকে দৈনিক ৪০০/৫০০ টাকা বিক্রি হয়। খরচ বাদে লাভ দিয়েই সংসার চলে। খাদিজাকে নিজ বাড়ির রান্না, কন্যা সামলানো, বাজার, দোকানে পানি আনা- সব কাজই করতে হয়। মনসুর চা বানান আর ক্রেতাদের দেন। বিয়ের আগে মনসুর এক হোটেলে কাজ করতেন। সেখানে চা সিঙ্গারা বানাতেন। বিয়ের পর খাদিজার উৎসাহে উপশহর মোড়ে দোকান দেন। দোকান করতে তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিলÑ জানালেন, খাদিজা। দোকান ভাড়া, চাঁদা, কর কিছু দেয়া লাগে না। দড়িখরবনায় এক রুমের ঘর নিয়ে বসবাস করেন মনসুর-খাদিজা দম্পত্তি, সাথে তাদের মেয়ে। বিদ্যুৎ বিলসহ ভাড়া লাগে মাসে দুই হাজার টাকা।
মনসুর আলীর আরো দুটো ভাই আছেন সেন্টু ও আনসু। তারা শারীরিকভাবে স্বাভাবিক। ভাইদের মধ্যে মনসুর ছোট। তারাও হোটেলে কাজ করেন, তাদের সংসারও আলাদা। মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই।
মনসুর-খাদিজার দোকানে লাল চা সহ পাউরুটি, বিস্কুট, সিগারেট পাওয়া যায়। সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। ফ্যাক্টরির কর্মচারী রিয়াজুল ইসলাম মাল শেষ হলে হিসাব অনুযায়ি ১০০Ñ২৫০ টাকার বিস্কুট ,পাউরুটি দোকানে দিয়ে যান, নগদ কিংবা বাকিতে।
মনসুর-খাদিজার ব্যবসা বড় করার ইচ্ছা থাকলেও অর্থাভারে কারণে তা সম্ভব হয় না। খাদিজা জানালেন, স্বামী-স্ত্র দুজনই নিরক্ষরÑ তবুও ৭ বছরের মেয়ে সুমাইয়া আক্তারকে স্কুলে ভর্তি করেছেন, স্বপ্ন দেখেন মেয়ে ডাক্তার হবে। সুমাইয়া উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। মেয়েরও ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে আছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ