বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

জয়ললিতার মৃত্যুতে ভারতজুড়ে শোক

আপডেট: December 7, 2016, 12:15 am

সোনার দেশ ডেস্ক



তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা জয়ারামের মৃত্যুতে ভারতজুড়ে চলছে শোকার্ত সমর্থকদের মাতম।
বর্ণাঢ্য এ রাজনীতিকের স্মরণে মঙ্গলবার ভারতজুড়ে ছুটি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার, তামিলনাড়ুতে ঘোষিত হয়েছে সাত দিনের শোক।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার সকালে হাসপাতাল থেকে চেন্নাইয়ের রাজাজি হলে ভারতের পতাকা জড়ানো জয়ললিতার মরদেহ আনা হলে লাখো সমর্থক তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে যান। হাজারো নারী-পুরুষকে প্রকাশ্যে উচ্চস্বরে কাঁদতে দেখা যায় এ সময়। কেউ কেউ বুক আর মাথা চাপড়ে স্মরণ করছেন প্রিয় ‘আম্মা’কে।
জয়ললিতার দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাগাম (এআইএডিএমকে) ‘আম্মা’র স্মরণে তাদের সব অফিসে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখেছে। লাস্যময়ী অভিনেত্রী থেকে প্রভাবশালী রাজনীতিকে পরিণত হওয়া জয়ললিতার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে বিজেপি, কংগ্রেসসহ বিভিন্ন দল।
তামিলনাড়ুর চারবারের মুখ্যমন্ত্রীর অন্ত্যষ্টিক্রিয়া পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। মঙ্গলবার বিকালে চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচে এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও অংশ নেবেন বলে হিন্দুর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নানা জটিলতায় বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ জয় ললিতার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে রোববার রাতে তাকে চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে লাইফ সাপোর্টে রাখার পর সোমবার গভীর রাতে মুখ্যমন্ত্রীর মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে।
বিবিসি লিখেছে, জনপ্রিয় এ নেত্রীর মৃত্যুর খবরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় দক্ষিণাঞ্চলের এ রাজ্যে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
অবশ্য চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত অক্টোবরেই উপ-মুখ্যমন্ত্রী ওপি পান্নিরসেলভামের কাছে যাবতীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তর করে গেছেন জয়ললিতা। তার আস্থাভাজন পান্নিরসেলভাম আরও দুই দফা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
জয়ললিতার মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা পর এআইডিএমকে তাদের টুইটার অ্যাকাউন্টে ওপি পান্নিরসেলভামকেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছে।
২০০১ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জয়ললিতাকে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনে বাধা দিলে একবছর পান্নিরসেলভাম ওই দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৪ সালে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগে জয়াললিতা দোষী সাব্যস্ত হলে আবারও তামিল নাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন ‘আম্মা’র ঘনিষ্ঠ পারিষদ পান্নিরসেলভাম। ২০১৫ সালের মে মাসে কর্নাটক হাই কোর্ট জয়ললিতাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দিলে পান্নিরসেলভাম নেত্রীর জন্য ওই পদ থেকে সরে যান।
সোমবার রাতে অ্যাপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জয়ললিতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করার পরপরই রাজনীতিবিদ, অভিনেতা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণ নানাভাবে তাদের শোকের কথা প্রকাশ করেছেন। কংগ্রেসের মুখপাত্র সাবেক অভিনেত্রী খুশবু সুন্দর বলেন, “আমার জন্য এটা প্রচ- বেদনার খবর। রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও আমি তাকে শ্রদ্ধা করতাম। কেউই আমরা চাইনি, এ লড়াইয়ে তিনি হেরে যান।” জয়ললিতাকে ‘নারীর ক্ষমতায়নের’ প্রতীক হিসেবেও বর্ণনা করেন এই কংগ্রেস নেত্রী।
“তিনি অনেক কিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং রাজনীতির মত পুরুষ আধিপত্যের একটি ক্ষেত্রেও নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। আমরা একজন অসাধারণ রাজনীতিককে হারিয়েছি, হারিয়েছি নারীর অধিকার আদায়ে চ্যাম্পিয়ন একজনকে।”
টুইটারে ‘আরআইপি জয়ললিতা’ হ্যাশট্যাগ এখন ট্রেন্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফেইসবুকেও অনেক ব্যবহারকারী পুরুষপ্রধান তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ‘লৌহমানবী’ হয়ে ওঠা এ নারীর মৃত্যুতে শোক জানাচ্ছেন।
জয়ললিতার ক্যারিয়ারের শুরু ১৯৬১ সালে তামিল ছবিতে, তখনও তিনি স্কুলছাত্রী। জনপ্রিয় অভিনেতা এম জি রামচন্দ্রনের হাত ধরে ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন ১০০-রও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা জয়ললিতা। ১৯৮৭ সালে রামাচন্দ্রন মারা যাওয়ার পর দলের কর্তৃত্ব নেন তিনি। তবে বাধা আসে রামাচন্দ্রনের স্ত্রী জানকি রামাচন্দ্রনের কাছ থেকে। তবে শেষমেষ জয় জয়ললিতারই হয়, দলের প্রতীক ‘জোড়া পাতা’ দখলে রাখতে পারেন তিনি। এরপর নির্বাচনে নামিলনাড়ুর রাজ্য বিধান সভায় প্রথম নারী হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হন জয়ললিতা। ১৯৯১ সালে বসেন তামিলনাড়ুর ক্ষমতায়, রাজনীতিতে দ্যুতি ছড়িয়ে সমর্থকদের মধ্যে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘আম্মা’ হিসেবে।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মেয়াদে দুর্নীতির অভিযোগে জয়ললিতার বিরুদ্ধে মামলা করেন বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা সুব্রামানিয়াম স্বামী। তার অভিযোগ ছিল, প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে জয়ললিতা মাত্র এক রুপি বেতন নিতেন। কিন্তু ওই সময়ে পাঁচ বছরে তিনি কমপক্ষে ৬৬ কোটি রুপির মালিক হয়েছেন।
২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ললিতার দল দ্বিতীয়বারের মতো তামিলনাডুর ক্ষমতায় এলে বিচার যাতে প্রভাবিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে বিরোধীপক্ষের দাবির মুখে মামলাটি তামিলনাড়ু থেকে ব্যাঙ্গালুরুর বিশেষ আদালতে আনা হয়।
মামলার ১৮ বছর পর ২০১৪-র সেপ্টেম্বরে ৫৪ কোটি রুপির অবৈধ সম্পদ রাখায় দায়ে মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতাকে চার বছরের কারাদ- দেওয়া হয়, করা হয় ১০০ কোটি রুপি জরিমানা। তিন সপ্তাহ জেলে থাকার পর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত থেকে শর্তসাপেক্ষে জামিন পান এআইএডিএমকে নেত্রী। আপিল করেন হাই কোর্টে।
২০১৫ সালের ১১ মে কর্ণাটকের হাই কোর্ট যে রায় দেয়, তাতে নির্দোষ ঘোষণা করা হয় জয়ললিতাকে। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যের ৩৯টি আসনের মধ্যে ৩৭টিতে জয়ী হয়ে চমক দেখায় এআইএডিএমকে। দুই বছর পর বিধানসভা নির্বাচনেও জয়ললিতার দলের প্রতিই আস্থা রাখে তামিলরা।- বিডিনিউজ