জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ || নিয়ামতপুরের পাঁচ জয়িতা

আপডেট: February 19, 2020, 12:45 am

নিয়ামতপুর প্রতিনিধি


নিয়ামতপুরের পাঁচ জয়িতা (বাম থেকে) সিতলী রানী, বিলকিস পারভিন, নাদিরা বেগম, সাহেরা খাতুন ও সাথী খাতুন-সোনার দেশ

জয়িতা অন্বেষনে বাংলাদেশ এর আওতায় বিভিন্ন ক্যাটাগরীতে নির্বাচিত ৫ জয়িতা সমস্ত বাধা অতিক্রম করে নতুন উদ্যোমে এগিয়ে চলেছে। নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু, নিজে অশিক্ষিত হয়েও এবং অর্থনৈতিক সমস্যাসহ সব রকমের বাধা অতিক্রম করে তার সন্তানদের সফলভাবে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা, সমাজে বিভিন্ন মানবতার কাজ করে সমাজে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে যে নারী, অতি দরিদ্র হয়েও নিজের উদ্যোগে কাজ করে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হয়ে অর্থনৈতিকভাবে সফলতা অর্জন করে যে নারী, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে নিয়ামতপুর উপজেলার জয়িতা অšে¦ষনে বাংলাদেশের জয়িতা নির্বাচন কমিটির কাছে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের ভালাইনঘাটি গ্রামের আবুল কাশেম ও রেহেনা বিবির মেয়ে সাথী খাতুন, সফল জননী নারী হিসেবে উপজেলার শ্রীমন্তপুর ইউনিয়নের ভাদরন্ড গ্রামের গ্রামের রাজেন্দ্র সরদার ও আলতী রানীর মেয়ে সীতলী রানী, অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে সদর ইউনিয়নের বালাহৈর গ্রামের মো. খোরশেদ আলম ও সফিরুন নেছার মেয়ে মোসা. সাহেরা খাতুন, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য শ্রীমন্তপুর ইউনিয়নের ভাদরন্ড গ্রামের আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী ও বর্তমান উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নাদিরা বেগম এবং শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী শ্রীমন্তপুর ইউনিয়নের ঝাঁজিরা গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মোসা. বিলকিস পারভীন। এরা পাঁচ জয়িতা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন।
সাথী খাতুন জানান, এসএসসি পাস করার পর তার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। কিছুদিন পর স্বামীর আচরণ পাল্টাতে থাকে। প্রতিনিয়ত সে আমাকে শারীরিক ও মানুষিক নির্যাতন করতে থাকে। আমাকে তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আমার গর্ভে ৪ মাসের সন্তান থাকার কারণে আমাকে তালাক দিতে পারে নি। আমি বাবার বাড়িতে চলে আসি। বাবার উৎসাহে আমি আবার লেখাপড়া শুরু করি। এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হই। আমার স্বামী আমার গর্ভের সন্তানকে নষ্ট করার জন্য আমার পেটে লাথি মারে। কিন্তু তাতেও সন্তান নষ্ট করতে না পারায় সন্তান জন্মের ৪ মাসের মাথায় আমাকে তালাক দেয়। আমি ৪ মাসের সন্তান নিয়ে বিপাকে পড়ি। আমার স্বামী আমার ও আমার সন্তানের কোন খরচ দেয় না এমনকি কোন খোঁজ খবর পর্যন্ত নেয় নি। আমার বাবার উৎসাহে আমি রাজশাহী নিউ ডিগ্রী গভঃ কলেজে অনার্থ এ ভর্তি হই। পাশাপাশি বাড়িতে সেলাই ্এর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমি বর্তমানে ভাল রয়েছি।
সিতলী রানী জানান, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমি ৪০ দিনের কর্মসূচিতে মাটি কেটে চার সন্তানের লেখাপড়া চালিয়েছি। আমার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে লেখাপড়া শেষ করে বর্তমানে সোনালী ব্যাংকে কর্মরত আছেন। দ্বিতীয় ছেলে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধ্যায়নরত আছে। বড় মেয়ে কলেজ পড়া অবস্থায় বিয়ে দেই এবং ছোট মেয়ে বর্তমানে নিয়ামতপুর সরকারি কলেজে বিএ পড়ছে। ৫১ বছর বয়সেও ৪ সন্তানকে উচ্চ শিক্ষিত করে তুলেছি। ৪ সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালিয়েও শুধু মাত্র নিজের পরিশ্রমের কারণে সাংসারের অবস্থাও আগের চেয়ে অনেক ভালো। সব কুসংস্কার ভেঙে কন্যা সন্তাদের পড়ালেখা চালিয়ে গেছি। নিজে অশিক্ষিত হয়েও সন্তানদের উচ্চ শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করেছি।
মোসা. সাহেরা খাতুন জানান, অল্প বয়সে বিধবা হয়ে অর্থনৈতিকভাবে একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েন। স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নারী হিসেবে নিয়ামতপুর উপজেলা সদরে গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার করে বর্তমানে নিজস্ব ডিজিটাল সেন্টার, স্টেশনারী, স্ট্যাম্প ভান্ডারের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক সামাজিক প্রতিন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও জীবন সংগ্রাম করে তিনি আর্থিকভাবে সফল হয়েছেন।
বিলকিস পারভীন জানান, অদম্য মেধাবী ও কেরাত হামদ-নাত এ বার বার উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন। বিলকিস পারভীনের পিতা একজন আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এইচএসসিতে লেখাপড়াকালীন আমার বাবা দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাখিল মাদ্রাসায় কর্মরত বিএসসি শিক্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেয়। বিয়ের কিছুদিন দিন পর আমার বাবা মারা যায়। আমার স্বপ্ন ছিল বাবার মত লেখাপড়া শেষ করে আদর্শ শিক্ষক হবো। বিয়ের পর আমার চেষ্টা ও স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় লেখাপড়া চালিয়ে যাই। বয়স যখন ১৮ বছর ১৪ দিন তখন আমি পিইডিপি-২ এর আওতায় প্রকল্পে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির জন্য আবেদন করি এবং চাকরি হয়। এর কিছুদিন পর রাজস্ব খাতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে সেখানেও আবেদন করে চূড়ান্তভাবে টিকে যাই। তখন প্রকল্পের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে রাজস্ব খাতে যোগদান করি। পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যাই। নওগাঁ সরকারি কলেজ থেকে বিএ এবং এমএ সফলতার সহিত উত্তীর্ণ হই। এছাড়া নওগাঁ পিটিআই হতে সি-ইন-এড, রাজশাহী টিটি কলেজ থেকে বিএড এবং এমএড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই।
নাদিরা বেগম বেগম জানান, আমি দরিদ্র কৃষক আজিজুর রহমানের চার কন্যার একজন। ১৯৯০ সালে দারিদ্রতার কারণে বাল্যবিয়ের শিকার হই। বিয়ের পর ১৯৯১ সালে এসএসসি পাশ করি। কিন্ত সংসারের অভাব ও সন্তান জন্মানের কারণে কলেজে ভর্তি হতে পারি নাই। পরবর্তীতে স্বামীর অনুপ্রেরণায় ১৯৯৬ সালে নিয়ামতপুর ডিগ্রী কলেজ হতে এইচএসসি পাশ করি এবং একই বছরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে শ্রীমন্তপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য হিসেবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করি এবং জয় লাভ করি। আমি আরো চারজন নারীকে লেখাপড়ায় উৎসহিত করি। সে সময় নারী সমাজের কল্যাণ ও সমাজে নারীর অধিকার নিয়ে ওই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আলোচনা ও সমাবেশ করে সমাজের অবহেলিত নারীদের উৎসাহ দিতাম। ২০০৩-২০০৪ সালে একটি বেসরকারি সংস্থা তিলোত্তমার হয়ে ভাবিচা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে নিরাপদ মাতৃত্ব, স্বাস্থ্য সেবা ও স্যানিটেশন সম্পর্কে সমাজের অবহেলিত ও অজ্ঞ নারীদের সচেতন করে তুলেন। ২০০৮ সালে সিডিএস হতে শতভাগ পায়খানা, নিরাপদ পানি, ও হতদরিদ্রদের মাঝে সাহায্যার্থে কাজ করেন। ২০১০ সাল হতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নারীর ক্ষমতায়ন, যৌতুক ও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে ও নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করি। ২০১৩ সালে স্নাতক পাশ করি বর্তমানে মাস্টার্স প্রথম বর্ষে অধ্যায়নরত। ২০১৭ সালে নিয়ামতপুর উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হই। ২০১৯ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নারী ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হই। বর্তমানে আমার তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মাস্টার্স শেষ করেছে, মেজ ছেলে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে এবং ছোট ছেলে এইচএসসিতে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যায়নরত। আমি সমাজে পিছিয়ে পড়া নারী গোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি।