ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম ১১ শিল্পের ৩১৩ কারখানায় ৮৫৬ শিশু শ্রমিক শনাক্ত

আপডেট: জানুয়ারি ৮, ২০১৮, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


নরসিংদীতে জজ ভূইয়া গ্রুপের জজ স্পিনিং মিলস লিমিটেডে কাজ করছে ১১ বছরের রেজিয়া। তার সহকর্মী মিম ও কল্পনার বয়স যথাক্রমে ১২ ও ১৪ বছর। রেজিয়া ও মিমের বাড়ি রংপুর, কল্পনার কিশোরগঞ্জে। বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার বয়স তাদের। কিন্তু দারিদ্র্যের কবলে পড়ে কাজ করছে শিল্প-কারখানায়।
শুধু স্পিনিং নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় শিশুদের জন্য ভয়াবহ অ্যালুমিনিয়াম কারখানাগুলোতেও রয়েছে আইনত নিষিদ্ধ শিশুশ্রমের চর্চা। এ খাতের এমনই একটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামে অ্যালুমিনিয়াম গলি হিসেবে পরিচিত মুরাদপুরের পাটোয়ারী অ্যালুমিনিয়াম। এ প্রতিষ্ঠানের কারখানায় কাজ করছে ১০ বছরের ফজলুল করিম। অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে কোনো ধারণা না রেখেই কাজ করে যাচ্ছে শিশুটি।
স্পিনিং, অ্যালুমিনিয়ামসহ দেশের ১১টি শিল্প খাতের ৩১৩টি কারখানায় কাজ করছে ৮৫৬ শিশু শ্রমিক। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) সাম্প্রতিক পরিদর্শন কর্মসূচিতে এ ধরনের শিশুশ্রমের প্রমাণ মিলেছে। অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ খাতকে শিশুশ্রমমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্য পূরণে শিল্প-কারখানায় শিশুশ্রম শনাক্তের জন্য গত আগস্টে বিভিন্ন জেলার পরিদর্শকদের নির্দেশনা দেয় ডিআইএফই। নির্দেশনা মোতাবেক নভেম্বর পর্যন্ত ১১টি খাতের ৩১৩টি কারখানায় মোট ৮৫৬ শিশু শ্রমিক শনাক্ত করেছে ডিআইএফই।
অধিদপ্তরের সূত্রমতে, উল্লিখিত ১১টি খাত হলো অ্যালুমিনিয়াম, তামাক/বিড়ি, সাবান, প্লাস্টিক, কাচ, স্টোন ক্রাশিং, স্পিনিং, সিল্ক, ট্যানারি, শিপ ব্রেকিং ও তাঁত। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোয় কর্মরত শিশু শ্রমিকদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় অ্যালুমিনিয়াম, তামাক/বিড়ি, প্লাস্টিক ও স্টোন ক্রাশিংয়ের মতো খাতগুলোয় সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার পাবে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিশুশ্রম নিরসনের জন্য আমরা নতুনভাবে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এসডিজি অনুযায়ী সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন ও ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম নিরসনের অঙ্গীকার করেছে। অঙ্গীকার অনুযায়ী শিশুশ্রম নিরসনে বিদ্যমান জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণের কাজ শুরু হয়েছে। ডিআইএফই শনাক্তকৃত শিশুশ্রম রয়েছে, এমন খাতগুলোতেও এ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
ডিআইএফইর শনাক্ত করা ১১টি খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু শ্রমিক কাজ করছে তামাক/বিড়ি খাতের কারখানাগুলোয়। এ খাতে ১৪৫টি কারখানায় শিশু শ্রমিক শনাক্ত হয়েছে ৪৪৫ জন। এরপর সবচেয়ে বেশি শিশু শ্রমিক রয়েছে স্পিনিং খাতে। এ খাতের মোট ৩৩টি কারখানায় শনাক্ত হওয়া শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ১৬৫। সংখ্যার বিচারে তৃতীয় সর্বোচ্চ শিশু শ্রমিক রয়েছে অ্যালুমিনিয়াম খাতে; ৮১টি কারখানায় ১৩৯ জন।
প্লাস্টিক খাতের ১২টি কারখানায় শিশু শ্রমিক শনাক্ত হয়েছে ৪৬ জন। এছাড়া তাঁত খাতে ১৯টি কারখানায় ৩৭, শিপ ব্রেকিং খাতে ২০, স্টোন ক্রাশিং খাতে দুই, সাবান খাতে এক ও সিল্ক খাতে একজন শিশু শ্রমিক শনাক্ত করেছে ডিআইএফই। চলমান এ প্রক্রিয়ায় আরো অনেক শিশু শ্রমিক শনাক্ত হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ডিআইএফই জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ খাত শিশুশ্রমমুক্ত করার লক্ষ্যে কার্যক্রমের শুরুতেই পরিদর্শন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এর পরের ধাপে কারখানা মালিকদের সঙ্গে উদ্বুদ্ধকরণ সভায় বসবে ডিআইএফই। তৃতীয় ধাপে মতবিনিময় সভার পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে সভা-সেমিনার আয়োজন করা হবে। সব ধাপই বাস্তবায়ন হবে পুনর্বাসনের মাধ্যমে শিশুশ্রম কমিয়ে আনার লক্ষ্যে।
চতুর্থ ধাপ থেকে শিশুশ্রম কমিয়ে আনার বিষয়ে কারখানা মালিকদের নোটিস দেয়া শুরু করবে ডিআইএফই। ধাপটি বাস্তবায়নের আগে মালিকদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করবে সরকার। শিশু শ্রমিকদের মা-বাবা বা পরিবারের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। সেসব আলোচনায় পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুশ্রম দেয়া থেকে শ্রমিক ও তার পরিবারকে উদ্বুদ্ধ করা হবে। সর্বশেষ ধাপে শিশুশ্রম নিরসনে মালিকদের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এ বিষয়ে ডিআইএফইর মহাপরিদর্শক সামছুজ্জামান ভুইয়া বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোকে শিশুশ্রমমুক্ত করার লক্ষ্যে আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি। আমরা মাঠ কার্যালয় থেকে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কর্মরত শিশু শ্রমিক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছি।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, শিশুশ্রম নিরসনে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কমিটিগুলোকে আরো সক্রিয় করার লক্ষ্যে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ডিআইএফইর জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যেসব জেলায় ডিআইএফইর অফিস নেই, সেসব জেলায় শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন।