বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

টিপু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড || রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি শহিদ পরিবারের

আপডেট: December 12, 2019, 1:19 am

নিজস্ব প্রতিবেদক


টিপু রাজাকারের নির্মম-নির্যাতনের স্মৃতিমন্থণ করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন শহিদ পরিবারের সদস্যরা-সোনার দেশ

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজশাহীর জামায়াত নেতা আবদুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতান ওরফে টিপু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল বুধবার বিচারপতি শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন। এই রায়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তারা রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।
টিপু রাজাকারের রায় ঘোষণার আগে তালাইমারি শহিদ মিনারে উপস্থিত হন শহিদ পরিবারের সদস্যরা।
রায় শুনে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন শহিদ শফিউদ্দীনের একমাত্র সন্তান জয়নব বেগম। তিনি বলেন, তার বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। বাবা শহিদ হওয়ার পর তাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। টিপু রাজাকারের রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় শহিদ বাবর আলীর ছেলে শাহ জামান বলেন, এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। রায় ঘোষণার পর আমরা এতই আনন্দিত যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আমরা যে বিচার চেয়েছিলাম ট্রাইব্যুনালের কাছে সে বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং আসামীর ফাঁসির রায় হয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এই বিচারের ব্যবস্থা করা জন্য।
তিনি বলেন, একাত্তরে আমি নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। আমার বাবা ছিলেন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার এবং আওয়ামী লীগের নেতা। একাত্তরের ২৬ সেপ্টেম্বর শহরের সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট থেকে টিপু রাজাকারের নেতৃত্বে আমার বাবাকে (বাবর আলী) ধরে নিয়ে গিয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের জোহা হলে রাখা হয়। সেখানে কয়েকদিন নির্যাতনের পরে হলের পিছনে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে সেখানে মরদেহ পুঁতে দেয়া হয়। ঘটনার পরে তালাইমারিতে আমাদের বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে আগুন দেয় টিপু রাজাকার ও তার সহযোগীরা।
একই প্রতিক্রিয়া শহিদ আফিল উদ্দিনের মেয়ে বিলকিস বানুর। আফিল উদ্দিন ব্যবসায়ী ছিলেন। তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা ও বাড়িতে লটপাট চালায় টিপু রাজাকার ও তার সহযোগীরা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানা এলাকায় হত্যা, নির্যাতন, আটক, অপহরণ ও লুণ্ঠনের অভিযোগে টিপু রাজাকারসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে উল্লিখিত অভিযোগের প্রমাণ পায় প্রসিকিউশন টিম। তবে ছয়জনের মধ্যে মজিবর রহমান, আব্দুর রশিদ সরকার, মুসা ও আবুল হোসেন আগেই মারা গেছেন। বেঁচে আছেন একমাত্র আসামি টিপু সুলতান।
রাজশাহীর বোয়ালিয়ায় ১০ জনকে হত্যা, দু’জনকে দীর্ঘদিন আটকে রেখে নির্যাতন, ১২ থেকে ১৩টি বাড়ির মালপত্র লুট করে আগুন দেয়ার অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালের ২৯ মে প্রসিকিউশনের দেয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ৮ আগস্ট অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে টিপুর বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
জানা গেছে, নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে অবসরে যাওয়া টিপু সুলতানকে একত্তরের ভূমিকার জন্য রাজশাহীর অনেকে চেনে ‘টিপু রাজাকার’ নামে। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বলছে, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে মিলে স্থানীয় যে রাজাকাররা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণহত্যা চালিয়েছিল, তাদের মধ্যে টিপু সুলতানই বেঁচে আছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় টিপু ছিলেন, জামায়াতে ইসলামী ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের স্থানীয় কর্মী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই ছাত্রসংঘ নাম বদলে হয় ইসলামী ছাত্রশিবির। টিপু শিবিরের রাজনীতিতেও যুক্ত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে মামলার অভিযোগপত্রে। সেখানে বলা হয়, ১৯৮৪ সালের পর টিপুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়ভাবে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে লেখাপড়া করা টিপু সুলতান ১৯৮৪ সালে নাটোরের গোপালপুর ডিগ্রি কলেজে যোগ দেন সহকারী অধ্যাপক হিসেবে। ২০১১ সালে সেখান থেকেই তিনি অবসরে যান। ১৯৭৪ সালের ১০ অগাস্ট টিপু সুলতানকে গ্রেফতার করা হলেও পরে তিনি ছাড়া পেয়ে যান। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি বিস্ফোরক আইনের এক মামলায় মতিহার থানার পুলিশ তাকে ফের গ্রেফতার করে। পরে তাকে যুদ্ধাপরাধ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
টিপু রাজাকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ-
অভিযোগ-১ একাত্তরের ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর দেড়টা থেকে পরদিন মধ্যরাত পর্যন্ত আসামি মো. আব্দুস সাত্তার ওরফে টিপু সুলতান ওরফে টিপু রাজাকার স্থানীয় অন্যান্য রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা বোয়ালিয়া থানার সাহেববাজারের এক নম্বর গদিতে (বর্তমানে জিরোপয়েন্ট) হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা বাবর মণ্ডলকে আটক করে। তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুজ্জোহা হলে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে দিনভর নির্যাতন করার পর গুলি করে হত্যা করে লাশ মাটিচাপা দেয়া হয়।
অভিযোগ-২ একাত্তরের ২ নভেম্বর রাত আনুমানিক ২টায় আসামি টিপু সুলতান, স্থানীয় রাজাকার এবং ৪০ থেকে ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা বোয়ালিয়া থানার তালাইমারী এলাকায় হামলা চালায়। সেখান থেকে আওয়ামী লীগ নেতা চাঁদ মিয়া, আজহার আলী শেখসহ ১১ জনকে আটক করে নির্যাতন চালানো হয়। তালাইমারী এলাকার ১২ থেকে ১৩টি বাড়িতে লুটপাটও চালানো হয়।
পরে আটক ১১ জনকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে বসানো অস্থায়ী ক্যাম্প ও টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ৪ নভেম্বর মাঝরাতে ৯ জনকে গুলি করে হত্যার পর লাশ মাটিচাপা দেয়া হয়। সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া বাকি দুই জনের মধ্যে একজন এখনও জীবিত আছেন। তিনিও এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এর কমান্ডার রাজশাহী মহানগর ইউনিট কমান্ড ডা. আবদুল মান্নান বলেন, ‘টিপু চিহ্নিত রাজাকার ছিলেন। তিনি জামায়াতের রাজনীতি করতেন। টিপু বাবরসহ বেশ কিছু আওয়ামী লীগের নেতাকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলো। আমরা টিপু রাজাকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করে। অভিযোগের পরে সেখান থেকে দল এসে তদন্ত করে যায।
তিনি আরো বলেন, তার অংশ হিসেবে আজ এই রায়। টিপু রাজাকারের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় তালাইমারী এলাকার মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তাদের প্রিয়জনকে হত্যার বিচার দেখতে পেলো।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনেকে দেশই বিভিন্ন কথা বলেছে। কিন্তু প্রথানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাথা নতো করেননি। এভাবে দেশের সকল যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি কার্যকরের দাবি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ