টুজি-ফোরজি নেটওয়ার্ক প্রযুক্তিগত ভিন্নতায় ভয়েস কলে জটিলতা

আপডেট: মে ২৮, ২০১৮, ১২:২৮ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


দেশে সেলফোন সেবার নতুন প্রযুক্তি ফোরজি চালু হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। পাশাপাশি টুজি ও থ্রিজি প্রযুক্তিতেও সেবা দিচ্ছে অপারেটররা। এখন পর্যন্ত শুধু ডাটাভিত্তিক সেবার জন্য ফোরজি ব্যবহার করছে তারা। আর ভয়েস কলের জন্য আগের টুজি ও থ্রিজি প্রযুক্তিই ব্যবহার হচ্ছে। তবে ফোরজি নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা হ্যান্ডসেট থেকে ভয়েস কলের ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটছে, যা কল ডিলে হিসেবে পরিচিত। আবার নতুন প্রযুক্তি চালু হওয়ায় অপারেটরদের নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের প্রভাবেও কলড্রপ বেড়েছে।
প্রাথমিকভাবে শুধু ভয়েসনির্ভর সেবার জন্যই টুজি নেটওয়ার্কের প্রচলন হয়। মূলত সার্কিট সুইচড প্রযুক্তি ব্যবহার হয় টুজিতে। পরবর্তী সময়ে জেনারেল প্যাকেট রেডিও সার্ভিস (জিপিআরএস) বা এনহ্যান্সড ডাটা রেটস ফর জিএসএম ইভল্যুশনের (ইডিজিই) মতো ডাটা আদান-প্রদান সেবা দিতে টুজি নেটওয়ার্কে প্যাকেট সুইচড প্রযুক্তি নিয়ে আসা হয়। থ্রিজি প্রযুক্তি মূলত সার্কিট সুইচড ও প্যাকেট সুইচড প্রযুক্তির নেটওয়ার্কের হাইব্রিড সংস্করণ। এতেও ভয়েসের জন্য সার্কিট সুইচড ও ডাটার জন্য প্যাকেট সুইচড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। আর ফোরজি পুরোপুরি প্যাকেট সুইচড প্রযুক্তিনির্ভর। এতে ভয়েস ও ডাটা দুই ধরনের সেবার জন্যই আইপি প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপারেটররা। ফোরজিতে ভয়েস সেবা দেয়া হয় ভয়েস ওভার এলটিইর (ভিওএলটিই) মাধ্যমে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সেলফোন অপারেটররা এখনো ভিওএলটিই চালু করেনি। ফলে ফোরজি প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে শুধু ডাটাভিত্তিক সেবা দিতে। থ্রিজি চালুর পর থেকে ক্রমান্বয়ে ডাটাভিত্তিক সেবার গ্রাহক বাড়ছে। তবে গ্রাহকের সিংহভাগেরই এখনো ভয়েস কল সেবার ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে ফোরজি থেকে ভয়েস কল করা হলে তা টুজি বা থ্রিজির মাধ্যমে সংযুক্ত করতে হচ্ছে। আইপিভিত্তিক ফোরজি থেকে সার্কিট সুইচডভিত্তিক নেটওয়ার্কে ভয়েস কল স্থানান্তর করতে গিয়ে বেশকিছু সময় লাগছে। এতে সংযোগ পেতেও সময় লাগছে গ্রাহকের।
গ্রামীণফোন লিমিটেডের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা সৈয়দ তালাত কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ফোরজি প্রযুক্তি দিয়ে আমরা উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছি। ফলে গ্রাহক যখন ফোরজি নেটওয়ার্ক থেকে ভয়েস কল করে, তখন সেটি টুজি বা থ্রিজি নেটওয়ার্কের (যখন যেখানে যেটি বিদ্যমান) মাধ্যমে হয়ে থাকে। যে কারণে কল সেটআপ স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ২-৩ সেকেন্ড বেশি লাগতে পারে। প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি স্বাভাবিক এবং এর সঙ্গে কলড্রপের কোনো সম্পর্ক নেই।
দেশে ১৯৯৭ সালে জিএসএম প্রযুক্তির সেলফোন সেবা চালু হয়। এর পরের দুই দশকে সেবাটিতে বিপুল গ্রাহক যুক্ত করেছে অপারেটররা। ভয়েস কলের ট্যারিফ ব্যাপক হারে কমানোর পাশাপাশি হ্যান্ডসেটের দাম কমে আসায় টুজি প্রযুক্তির সেবা ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সফলতা পেয়েছে অপারেটররা। এর মধ্যে সিংহভাগই ভয়েস কলভিত্তিক সেবার গ্রাহক।

টেলিযোগাযোগ সেবার ব্যাপ্তির পাশাপাশি বেড়েছে এর মান নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগও। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দেয়া অভিযোগের সিংহভাগই মূলত নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্নতা, মানসম্পন্ন ভয়েস সেবার অভাব, কল ও এসএমএস আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বিলম্ব, সময়ক্ষেপণ এবং কলড্রপকেন্দ্রিক।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাশেদুল হক জানান, কয়েক মাস ধরে সংযোগ পেতে বিলম্বের পাশাপাশি কলড্রপের ঘটনা বেড়েছে। কারণ হিসেবে গ্রাহকসেবা কেন্দ্র থেকে অপারেটরের নেটওয়ার্ক উন্নয়ন কার্যক্রম চলার কথা বলা হয়েছে।
রবি আজিয়াটার ভাইস প্রেসিডেন্ট (কমিউনিকেশন অ্যান্ড করপোরেট রেসপনসিবিলিটি) বলেন, আমরা মাঝে মধ্যে লক্ষ করেছি, যখন কোনো গ্রাহক ফোরজি থেকে থ্রিজি বা টুজি নেটওয়ার্কে যায়, তখন কল সেটআপে একটু বেশি সময় লেগে যায়। টেকনোলজি পরিবর্তনের সময় সাময়িকভাবে গ্রাহকের এমন অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে এর কারণে কলড্রপ হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
এদিকে ডাটাভিত্তিক সেবা হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে থ্রিজি প্রযুক্তি চালু হয় ২০১৩ সালের অক্টোবরে। অথচ ওই সময়ের আগেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থ্রিজি-পরবর্তী প্রযুক্তি হিসেবে লং-টার্ম ইভল্যুশন (এলটিই) বা ফোরজি প্রযুক্তি চালু করা হয়। অন্যদিকে, থ্রিজি চালুর পর ফোরজি চালুর অনুমোদন দেয়া হবে, এমন আশ্বাসের ভিত্তিতে মূলত দেশে থ্রিজিতে বিপুল বিনিয়োগ করে লাইসেন্স পাওয়া বেসরকারি খাতের চার সেলফোন অপারেটর। টুজি সেবার ক্ষেত্রে একই ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্বের অন্য দেশগুলোর উদাহরণ বিবেচনায় থ্রিজি থেকে অপারেটরদের ব্যবসায়িক সাফল্য আসেনি। থ্রিজিতে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করে অপারেটররা তুলতে পেরেছে ৬ হাজার কোটি টাকার মতো। ফোরজি সেবা চালুতে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর আবেদন আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত আবেদন গ্রহণ করা হয়। এ
সময় পাঁচ সেলফোন অপারেটর আবেদন করে। রাষ্ট্রায়ত্ত সেলফোন অপারেটর টেলিটক ছাড়াও বেসরকারি চার অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা, বাংলালিংক ও সিটিসেল লাইসেন্স পেতে আবেদন করে। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি তিন সেলফোন অপারেটরকে যোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নেয় আবেদন মূল্যায়ন কমিটি। বাদ পড়ে সিটিসেল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টেলিটকসহ চার সেলফোন অপারেটরকে লাইসেন্স দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পাশাপাশি গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তরঙ্গ নিলামের আয়োজন করে বিটিআরসি। নিলামে অংশ নিতে চার অপারেটর আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত নিলামে অংশ নেয় গ্রামীণফোন ও বাংলালিংক। এর মধ্যে গ্রামীণফোন শুধু ১ হাজার ৮০০ এবং বাংলালিংক ২ হাজার ১০০ ও ১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামে অংশ নেয়। নিলামে গ্রামীণফোন ৫ ও বাংলালিংক ১০ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ কেনে। সব মিলিয়ে নিলামে বিক্রি হওয়া মোট ১৫ দশমিক ৬ মেগাহার্টজের জন্য সরকারের আয় হয় ৪৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলার বা ৩ হাজার ৮৪৩ কোটি ২৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, থ্রিজিতে ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে পারেনি অপারেটরগুলো। অথচ বাধ্যবাধকতা ও প্রতিযোগিতার কারণে সব প্রযুক্তির সেবাই চালু রাখতে হচ্ছে তাদের। এতে কাঙ্ক্ষিত গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব না-ও হতে পারে। সব সেবা একই সঙ্গে চালু রাখতে গিয়ে ব্যবসায়িকভাবে চাপ তৈরি হবে অপারেটরদের ওপরও। তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা