টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা

আপডেট: নভেম্বর ২০, ২০১৯, ১:০৬ পূর্বাহ্ণ

রেজাউল ইসলাম


বিশ্বকে আগের অবস্থা থেকে আরো বেশি উন্নত, সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল, বৈষম্যহীন ও দারিদ্র্যমুক্ত করে গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘ ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’ নামে যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সেটার চার নম্বর অভীষ্টটি হলো সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষার নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপি শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি। অর্থাৎ শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন ও সার্বজনীন প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতার গুরুত্বের প্রতিফলন ঘটেছে এই অভীষ্টটিতে। শিক্ষা যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক ও মানসম্মত হয় তার জন্য এখানে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন অভীষ্টের মতো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট’ও শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে যুগান্তকারী সফলতা লাভ করবে।
এই অভীষ্টটির আওতায় যে দশটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো : ৪.১; ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাসঙ্গিক, কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবৈতনিক, সমতাভিত্তিক ও গুণগত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে তা নিশ্চিত করা। ৪.২; ২০৩০ সালের মধ্যে সকল ছেলে ও মেয়ে যাতে প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে প্রাক- প্রাথমিক শিক্ষাসহ শৈশবের একেবারে গোড়া থেকে মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠে তার নিশ্চয়তা বিধান করা। ৪.৩; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষালাভের সুযোগসহ সাশ্রয়ী ও মানসম্মত কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও উচ্চ শিক্ষায় সকল নারী ও পুরুষের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। ৪.৫; অরক্ষিত (সংকটাপন্ন) জনগোষ্ঠীসহ প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও অরক্ষিত পরিস্থিতির মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সকল পর্যায়ে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং শিক্ষায় নারী-পুরুষ বৈষম্যের অবসান ঘটানো। ৪.৬; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যুবসমাজের সবাই এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে সাক্ষরতা ও গণ- দক্ষতা অর্জনে সফলকাম হয় তা নিশ্চিত করা। ৪.গ; শিক্ষক প্রশিক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ ও উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি করা।
জাতিসংঘ প্রণীত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের চার নম্বর এই অভীষ্ট ও তৎসংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যসমূহ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই যে, এগুলোর সাথে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদের অনেক মিল আছে। কারণ, চার নম্বর অভীষ্টের মতো বাংলাদেশ সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছে- ‘একই পদ্ধতির গণমুখি ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক- বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য, সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য আইন দ্বারা স্বীকৃত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতামুক্ত দেশ গঠনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের চার নম্বর অভীষ্ট বিশ্লেষণ করলে যে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বেরিয়ে আসে তা হলো: ক. অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক শিক্ষা; খ. প্রাসঙ্গিক, কার্যকর, ফলপ্রসূ ও মানসম্মত শিক্ষা; গ. অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক ( প্রাথমিক ও মাধ্যমিক অথবা আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত) শিক্ষা; ঘ. যোগ্যতাসম্পন্ন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ; ঙ. প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে শিশুর মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যা। বড় পরিসরে বিশ্লেষণ করে উভয় দলিল থেকে আমরা যে পাঁচটি বিষয় খুঁজে পেলাম তার প্রতিটিই আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক। উদাহরণ স্বরূপ, আমরা যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলি তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি পিছিয়ে আছে। বিশ্বের বহু দেশে যখন সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য শিক্ষা অর্জনের সমান সুযোগের নিশ্চয়তা আছে, বাংলাদেশে তখন শুধু একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ তা অর্জন করার সুযোগ পাচ্ছে। এখানে নারী-পুরুষ, ধনী- নির্ধন, সুস্থ- শারীরিক প্রতিবন্ধী এমনকি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগত পার্থক্যের কারণেও শিক্ষার সুযোগের হার ওঠানামা করে। অথচ পৃথিবীর এমন অনেক দেশ আছে যেখানে সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ আমরা ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ডের প্রসঙ্গ টানতে পারি। সেদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল কথা হলো- ” Equal opportunity for all citizens “। অর্থাৎ, শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে সবার সমান সুযোগ রয়েছে সেখানে। সেদেশে সকল স্তরের শিক্ষা সবার জন্য বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। অথচ বাংলাদেশে যার টাকা আছে সে শিক্ষালাভ করতে পারে, আর যার টাকা নেই সে যত মেধাবীই হোক না কেন শিক্ষাঙ্গনের সিঁড়ি পর্যন্ত মাড়াতে পারে না। বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার কিছুটা সবার জন্য উন্মুক্ত হলেও উচ্চ শিক্ষা অর্জনের অধিকারে পরিষ্কার বলা আছে ‘সামর্থ্য’, যার অর্থ দাঁড়ায়, অর্থনৈতিক সক্ষমতাই আগে, মেধা পরে।
প্রাসঙ্গিক, কার্যকর, ফলপ্রসূ ও মানসম্মত শিক্ষার বিষয়ে বলতে গেলে বাংলাদেশ একেবারেই পিছনের দিকে অবস্থান করছে। কারণ, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সেদেশের মানুষের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মোটেও প্রাসঙ্গিক নয়। এখানে মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে যেমন মধ্যপ্রাচ্যের ভাষা ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেয়া হয়, তেমন করে এখানকার ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্রিটিশদের ভাষা ও পাঠ্যসূচি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করা হয়। অন্যদিকে, আর একটি বড় অংশ মাতৃভাষা বাংলায় শিক্ষা অর্জন করে। এভাবে বিচ্ছিন্ন পন্থায় শিক্ষাদানের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকেই অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা হয়েছে। আর একটি দেশের অপ্রাসঙ্গিক শিক্ষাব্যবস্থা কখনো কার্যকর, ফলপ্রসূ ও মানসম্মত হতে পারে না। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে বিদ্যমান অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয় এটা একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। বাংলাদেশে মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য অবৈতনিক শিক্ষালাভের সুযোগ রয়েছে। তবে এখানেও শিক্ষার আসল স্লোগান অর্থের ঝনঝনানিতে ম্রিয়মান হয়ে যায়। যার বেতন প্রদানের সামর্থ্য নেই সে বিনা বেতনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে, আর যার টাকা আছে সে উচ্চ হারে মাসিক বেতন দিয়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন স্কুলে অপেক্ষাকৃত মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করতে পারে। তাই সমাজের সামর্থ্যহীন শ্রেণির জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করলেও তা দিয়ে দেশ ও জাতির কতটুকু উন্নয়ন সাধন হয় তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় গলদ যেখানে লুকিয়ে রয়েছে তা হলো সেদেশের শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বড় পরিসরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ এবং অর্থ লেনদেনের বৃত্তে আটকে আছে। একারণে সেখানে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হয়। একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এ ধরনের অনিয়ম যেন প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইদানিং, সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যায়ে বিসিএস (নন ক্যাডার) পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা এবং বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে এনটিআরসিএ পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হলেও তাদের জন্য বিশ্বমানের ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে খুবই অপ্রতুল। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে যেটা হলো প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে শিশুর মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যা। এখানে শিশুর মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যাকে স্পষ্টভাবে প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন শিশুর মানসম্মত বিকাশ ও পরিচর্যা বলতে আসলে আমরা কী বুঝি? এটার সম্ভাব্য অর্থ এমন হতে পারে যে, মানসম্মত উপায়ে শিশুর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতি সাধন ও তার দেখভাল করা। তো এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উন্নতি সাধন করা যাবে? তার উত্তর হলো, অবশ্যই উন্নত পরিবেশ, পুষ্টিকর খাবার ও সুচিকিৎসার মাধ্যমে। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক শিশুই এই সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারে। আর বেশিরভাগ শিশু উপরিউক্ত সুবিধাগুলো পায় না বলেই তাদের মানসম্মত বিকাশ ঘটে না। তাহলে তারা কোন উপায়ে প্রাথমিক শিক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করবে?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের পরম ও পবিত্র ছায়াতলে সবার অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা বিধানে এবং জাতিসংঘ কর্তৃক বিশ্বব্যাপি যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট প্রণীত হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতি দৃষ্টিপাত করে বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় উপরিউক্ত যে বিষয়গুলো নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করতে বলা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করাই এখন বাংলাদেশের জন্য অতিকায় চ্যালেঞ্জ। তবে শিক্ষাই যেহেতু উত্তরাধুনিক বিশ্বের মূল চালিকাশক্তি, সেহেতু শিক্ষা অর্জনের বা প্রদানের পথে কোনো কিছুকে চ্যালেঞ্জ মনে করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। বরং ষোলো কোটি মানুষের সবাইকে একই কাতারে ফেলে শিক্ষার দীপ জ্বালিয়ে দিতে হবে। তবেই কিনা দেশের সংবিধান সমুন্নত হবে, শিক্ষাব্যবস্থা গতিশীল, যুগোপযোগী ও ফলপ্রসূ হবে এবং বিশ্বব্যাপি টেকসই উন্নয়নের আন্দোলনে বাংলাদেশের অবস্থান টেকসই হবে।
লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট