ডেঙ্গু

আপডেট: আগস্ট ১৬, ২০১৯, ১:১১ পূর্বাহ্ণ

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের আতঙ্কের বিষয় ডেঙ্গুজ্বর। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত এবং ৪০ জন ডেঙ্গুজ্বরে মারা গেছে। সারা পৃথিবীতে ৫ থেকে ১০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়।

ডেঙ্গু নামটির উৎপত্তি কিভাবে হলো? ১৭৮৯ সালে ইবহলধসরহ জঁংয প্রথমে নামকরণ করেন ‘নৎবধশনড়হব ভবাবৎ’ বাংলায় ভাঙ্গা জ্বর। কারণ ছিলো ডেঙ্গুজ্বর হলে মাংসপেশীতে এবং হাড়ের সংযোগ স্থলে প্রচন্ড ব্যথা অনুভূত হয়, তাই বলা হতো “ভাঙ্গা জ্বর”। বিংশ শতাব্দীতে পরিস্কারভাবে জানা যায়- এক ধরনের ভাইরাস যা মশার মাধ্যমে ডেঙ্গুজ্বরের সৃষ্টি। ৫০০ থেকে ১০০০ বছর পূর্বে আফ্রিকা বা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বনমানুষদের থেকে মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রামিত হয়।

ডেঙ্গু ভাইরাসের নাম কি? ডেঙ্গু ভাইরাসের নাম হচ্ছে উঊঘঠ যার কারণে ডেঙ্গুজ্বর হয়ে থাকে। যা হচ্ছে জঘঅ ভাইরাস- ফ্লাভিরিডি পরিবারে ফ্লাভিভাইরাস। ডেঙ্গু ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হলে ডেঙ্গুজ্বর হয়। একটু বেশী আক্রান্ত হলে ডেঙ্গু থেমোরহেজিক জ্বর (উঐঋ) হয় এবং পরবর্তিতে ডেঙ্গু সক্ সিনড্রম (উঝঝ) হতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বরের বৈশিষ্ট্য কি? ডেঙ্গুজ্বর হলে মাংসপেশী, হাড়ের সংযোগ স্থলে প্রচন্ড ব্যথা, লিম্ফনোডগুলি ফুলে যায়। মাথা ব্যথা, জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি (ৎধংয), অবসাদ ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। তবে জ্বর, ফুসকুড়ি এবং মাথাব্যথা (ফবহমঁব ঃৎরধফ) হলে বুঝতে হবে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত।

ডেঙ্গুজ্বরের চিকিৎসা কি? ডেঙ্গুজ্বরের নির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা নেই। ডেঙ্গুজ্বর হলে শরীরে প্রচন্ড ব্যথা অনুভূত হয়- সে কারণে ব্যথা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। তবে কোনভাবেই এসপ্রিন জাতীয় ঔষধ সেবন করা যাবে না- এসপ্রিন খেলে রক্তক্ষরণ হতে পারে। প্রচুর পরিমাণ তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

রক্তে প্লাটিলেটের স্বাভাবিক পরিমাণ কত? প্রতি মাইক্রোলিটার রক্তে দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ প্লাটিলেট স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। ভাইরাল জ্বর হলে নব্বই হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। তবে ডেঙ্গুজ্বর হলে বিশ হাজার বা তার নিচে নামতে পারে। জ্বর সেরে গেলে প্লাটিলেটের সংখ্যা আবার স্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছায়।

রোগের লক্ষণ কতদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়? স্বাভাবিকভাবে লক্ষণগুলি ৩ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয় তবে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ভাইরাসযুক্ত মশা কামড়ালে ৪ থেকে ৭ দিনের মধ্যে লক্ষণগুলি বুঝা যায়।

সাধারণ মশা কি ডেঙ্গুজ্বর সৃষ্টি করে? সাধারণ মশা ডেঙ্গুজ্বর বিস্তার করে না। এডিস ইজিপটাই (অবফবং ধবমুঢ়ঃর) মশা কামড়ালেও ডেঙ্গুজ্বর হবে না। এডিস মশা ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ালে অর্থাৎ রক্ত গ্রহণের কয়েকদিন পর সুস্থ মানুষকে কামড়ালে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির মাধ্যমে ডেঙ্গুজ্বর বিস্তার লাভ করে না। ডেঙ্গুজ্বর হলে মশারির মধ্যে থাকলে মশা কামড়ানোর সম্ভাবনা কম থাকে এবং বিস্তার লাভ করতে পারে না।

ডেঙ্গুজ্বর কি আপনা-আপনিই সেরে যায়? স্বাভাবিকভাবে এক সপ্তাহের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বর সেরে যায়। যদি পুনরায় অন্য ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত না হলে ৭ দিনের মধ্যে ভাল হয়ে যায়। শতকরা ৫ ভাগ রোগীর ব্লাড ভেসেলের মাধ্যমে রক্ত বেরিয়ে আসে এবং শরীরে ফুসকুড়ির সৃষ্টি হয়। মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়। হাটুর নিচে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কামড়িয়ে থাকে। যারা প্যান্ট এবং মোজা-জুতা পরে থাকে তাদের কামড়ানোর সম্ভাবনা কম থাকে। তাপমাত্রা ১৬ ডিগ্রীর নিচে এডিস মশা বংশ বিস্তার করতে পারে না।

ডেঙ্গুজ্বর হলে কি খাওয়া উচিত? তরল জাতীয় খাবার প্রচুর পরিমাণে খাওয়া প্রয়োজন। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে কলা খাওয়া যাবে কি? অনেক সময় রোগী শক্ত খাবার খেতে না পারলে, সেক্ষেত্রে কলা, আপেল, ডালিম, লেবু, পেয়ারা খাওয়া যাবে। অনেক সময় বমি হলে পানি বেরিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে ফল খাওয়া উচিত। খনিজ লবণ এবং ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করে। পেঁপের পাতার রস খেলে (৩০ মি.লি.) প্লাটিলেটের মাত্রা বেড়ে যায়। তাই অনেকে পেঁপের পাতার রস খেয়ে থাকে।

ডেঙ্গু নিয়ে ভাববার বিষয়। সর্তক থাকতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমান সময় অর্থাৎ ঝির ঝির বৃষ্টি- ডেঙ্গু মশার বংশ বিস্তার করার উপযুক্ত সময়। যদি প্রবল বর্ষণ হতো- তাহলে ডেঙ্গু মশা ডিম পাড়ার সুযোগ পেতো না। নিজের বাড়ীতে যেন কোন জায়গায় পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাসার বাইরে গেলে ফ্রিজের পানি যে জায়গায় জমা থাকে সেখানে নেপথোলিন দিলে উপকার পাওয়া যাবে। পায়ে নারিকেল তেল মাখলে কিছুটা উপকার পাওয়া যাবে। মশারি ব্যবহার করা উচিত। সম্মিলিতভাবে সজাগ এবং সচেতন থাকতে হবে এবং ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা
উপ-উপাচার্য
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়