ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

আপডেট: জুলাই ১৪, ২০১৯, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

ড. কানাই লাল রায়


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
অতঃপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ক্লাসে ভর্তি হন। এ সময় (১৯১২-১৩) যে শহদিুল্লাহ্-র আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিল না তার প্রমাণ পাওয়া যায় কলকাতার সৈয়দ সালেহ লেনে অবস্থিত মুসলিম এতিমখানায় তাঁর ম্যানেজারির পদ গ্রহণ। শহীদুল্লাহ্ বি.এল. পাশ করেন ১৯১৪ সালে এবং তার পরপরই মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর অনুরোধে তিনি চট্টগ্রাম সীতাকু- হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চাকরিটা তাঁর যথার্থই প্রয়োজন বলে ওই দূরদেশে যেতে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু আত্মীয়-স্বজন থেকে দূরে ওই অপরিচিত পরিবেশে বেশিদিন চাকরি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তিনি পরের বছরই (১৯১৫) মার্চ মাসে শিক্ষকতার চাকরি ত্যাগ করে ফিরে আসেন জন্মস্থানে এবং চব্বিশ পরগনার বশিরহাট কোর্টে ওকালতি শুরু করেন। বশিরহাটে এসেই তাঁর যথারীতি সংসারজীবন শুরু হয়। ¯েœহশীল পিতা, প্রেমময় স্বামী এবং সচেতন অভিভাবক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল। ধর্মমতিসম্পন্ন শহীদুল্লাহ নিয়মিত নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, ওয়াজ মাহফিলে যোগ দিতেন এবং ইসলাম ধর্মের অন্যান্য বিধান নিষ্ঠাসহকারে পালন করতেন। ইতোমধ্যে তিনি বিশিষ্ট নাগরিক হিসেবেও পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন। তাই কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বশিরহাট পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ও চব্বিশ পরগণা জেলা বোর্ডের সম্মানিত সদস্যপদও লাভ করেছিলেন। শহীদুল্লাহ্ ছিলেন শিক্ষকতা ও গবেষণাধর্মী মানসিকতার মানুষ। তাই আইন ব্যবসা তাঁর মানসিক প্রবণতা ও রুচির সম্পূর্ণ পরিপন্থী ছিল। তাই নিজের বি.এল. ডিগ্রির তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন ‘ইধফ খরাবষরযড়ড়ফ’ বা খারাপ জীবিকা বলে। ওকালতি করতে গিয়ে তিনি ভীষণ অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছিলেন। কারণ, শহীদুল্লাহ্-র অস্থি-মজ্জায় ছিল পড়াশোনা ও গবেষণার নেশা। শুধুমাত্র জীবনধারণের জন্যই তিনি ওকালতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে পুত্র তকীয়ুল্লাহ লিখেছেনÑ সহধর্মিণী মরগুবা খাতুন বাদ সাধলেন ওকালতি ব্যবসায়। ওকালতি ব্যবসায় নানাপ্রকার কলাকৌশল, সত্য-মিথ্যার মারপ্যাচ, মক্কেলের সাথে দরকষাকষি সাধ্বী স্ত্রীর মনঃপুত ছিল না। তিনি স্বামীর গবেষণা ও সাহিত্য-কর্মকেই আন্তরিক সমর্থন জানালেন। ওকালতি ব্যবসার আর্থিক প্রাচুর্যের চেয়ে স্বামীর জ্ঞান সাধনার পথে মোটামুটি স্বচ্ছল জীবনযাত্রার জন্যে সামান্য আর্থিক নিশ্চয়তাকেই তিনি শ্রেয় মনে করে তাঁকে ওকালতি ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ দিতে লাগলেন। কি করবেন শহীদুল্লাহ। স্বাধীনতার মোহে সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা না করে ওকালতিতে এসে জুটেছিলেন। কিন্তু এখানে পরাধীন বৃত্তির চূড়ান্ত। তিনি ‘ভাবতে লাগলেন স্কুলে শিক্ষকতাই ভাল ছিল।’ (আ.জা.মা.একী মুল্লাহ, বাঙালী মুসলমানের নবজাগরণে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ আবু তালিব সম্পাদিত, ইসলামী ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯০)। প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য, ওই যুগে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে আইন পড়াটা একটা প্রথাসিদ্ধ ব্যাপারে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। চাকরির অনিশ্চয়তাও এর অন্যতম কারণ বলা যেতে পারে। আর শহীদুল্লাহ্ যে-বিষয়ে এম.এ. করেছিলেন সে বিষয়ে চাকরির সুযোগও কম ছিল।
যাহোক, ওকালতিতে শহীদুল্লাহ মোটেই পশার জমাতে পারেন নি। আইন ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে তিনি মনে-প্রাণে একটি ভালো চাকরি খুঁজছিলেন। ঠিক সেই সময় এক আকস্মিক যোগাযোগে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। এই আমন্ত্রণ শহীদুল্লাহ সানন্দচিত্তে গ্রহণ করেন। ১৯১৯ সালে তিনি শরৎকুমার লাহিড়ী গবেষণা-সহায়ক পদে ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের সহকর্মী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। মাসিক বেতন ২০০ টাকা। আমাদের এমন ধারণা করা অযৌক্তিক হবে না, খুব সম্ভব ডক্টর শহীদুল্লাহ্-র মানস-প্রবণতা স্যার আশুতোষের কাছে অজানা ছিল না। বাংলাদেশে শিক্ষা প্রসারের অগ্রদূত এই মানুষটির কাছে তাঁর সাহায্য-সহযোগিতার কথা তিনি আজীবন আলাপ-আলোচনায় ও লিখিতভাবে স্বীকার করে গেছেন। এ প্রসঙ্গে ডক্টর শহীদুল্লাহ্ প্রণীত ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’ (২য় খ- অর্থাৎ মধ্যযুগ) উৎসর্গপত্রের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনও শহীদুল্লাহ্-র পা-িত্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি একস্থানে লিখেছেনÑ ‘আপনার মতন এতো বড় প-িত যাঁহার বিদ্যার পরিধি আয়ত্ত করিবার সাধ্য আমাদের নাই …ফার্সী, আরবী যাঁহার নখদর্পণে, যিনি জার্মান ব্যাকরণের জটিল গুহ্য ভেদ করিয়া অবসর রঞ্জন করেন…।” উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে তিনি মাসিক ‘আল্ এসলাম’ পত্রিকার সহ-সম্পাদকের (১৯১৫) পদ লাভ করেছিলেন এবং যুগ্ম-সম্পাদক হয়েছিলেন (১৯১৮) বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির মুখপত্র ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার।’ তাছাড়া, এই সময় তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধগুলির তালিকা আমি তাঁর অন্যান্য প্রবন্ধের সঙ্গে বিশেষ স্থানে সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। যাহোক, আবার আমরা তাঁর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের প্রসঙ্গে ফিরে আসি।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর শহীদুল্লাহ্ প্রায় দু’বছর ছিলেন। পরে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি ঐ বছরের ৩১ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে লেকচারার পদে যোগ দেন। চাকরিস্থল পরিবর্তনের কারণ সম্পূর্ণই অর্থনৈতিক। কলকাতা শহরে থেকে ২০০ টাকা বেতনে তাঁর মতো বৃহৎ পরিবারের জীবিকানির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন গবেষণা-সহকারী; আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পেয়েছিলেন লেকচারারের পদ। আপাতত অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে কিছুটা লাভবান হলেও কলকাতা শহরের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার পরিম-ল ত্যাগ করে ঢাকার মতো মফঃস্বল অঞ্চলে চলে আসায় তাঁর মতো সাহিত্য-জিজ্ঞাসু মানুষের কোনো সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী লাভ হয়েছিল কিনা সে-বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। তবে সামাজিক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবশ্যই যে লাভবান হয়েছিলেন, সে-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বাস্তভূমি ত্যাগ করে শেষ ৪৮ বছর তাঁর কেটেছে পূর্ববঙ্গে, মৃত্যুবরণও করেছেন পূর্ববঙ্গেই (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে)। কাজ করেছেন পূর্ববঙ্গের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেমন, ঢাকা, রাজশাহী), একাধিক প্রতিষ্ঠানে (বাংলা একাডেমি প্রভৃতি)। কলেজের অধ্যক্ষপদেও বৃত হয়েছেন (বগুড়া)।’
তাঁর সামাজিক ভূমিকা পারিপার্শ্বিকের প্রভাবে এবং নিজস্ব প্রবণতার ফলে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায় যেখানে তাঁর প্রধান কর্তব্য হয়ে ওঠে ওয়াজমাহফিল, সামাজিক বা পারিবারিক ধর্মানুষ্ঠানে ইমামতি করা। ঢাকায় চলে আসার ফলে, অনুকূল ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিম-ল পেয়ে, তা আরও প্রসারিত হয়। অতঃপর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে, পূর্ববঙ্গে তথা পূর্ব পাকিস্তানে এই ধর্মীয়-সংস্কৃতির চর্চা আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। ডক্টর শহীদুল্লাহ্ ক্রমশ তাঁর প্রারম্ভিক লক্ষ্যবিন্দু থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যেতে থাকেন। তাই দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, শহীদুল্লাহ-র পা-িত্য ও বহুমুখী জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও এবং সাহিত্য সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট সময় পেলেও (যদিও তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ একেবারে কম নয়) তাঁর মৌলিক ও গুণগত সাহিত্য সৃষ্টির পরিমাণ নিতান্তই অপ্রতুল। ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘শহীদুল্লাহ সাহেবের প্রধান কৃতিত্ব বাঙালির ভাষার ও সংস্কৃতির সার্থক আলোচনা এবং আনুসঙ্গিকভাবে মুসলমান বাঙালির আহৃত উপাদান নির্ণয় করা।” একজন যোগ্য ব্যক্তির সম্পর্কে একজন যোগ্য ব্যক্তির এটি যুক্তিনিষ্ঠ মূল্যায়ন সন্দেহ নেই। কিন্তু শহীদুল্লাহ-র পুত্র শিল্পী মুর্তজা বশীরকে যখন সুনীতিকুমারই দুঃখ করে বলেন, কলকাতা ছেড়ে যদি ডক্টর শহীদুল্লাহ ঢাকায় না যেতেন তাহলে তাঁর কাছ থেকে বাঙালি বিদ্বান সমাজ এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য আরও নানা বিষয়ে উপকৃত হতে পারতো, তখন সত্যই আমাদের মন দুঃখভারাক্রান্ত করে তোলে। যে-কোনো মণীষীর পূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজন পড়ে উপযুক্ত ক্ষেত্রের। তখনকার সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় এসে শহীদুল্লাহ-র সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেলেও তাঁর মণীষা যথার্থভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পাঁচ বছর পর ১৯২৬ সালে শহীদুল্লাহ দুই বছরের শিক্ষা ছুটি নিয়ে প্যারিস যান। সেখানকার সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.লিট ডিগ্রি (ডক্টর অব লিটারেচার) ও ডিপ্লো-ফোন (অর্থাৎ ডিপ্লোমা ইন ফনেটিক্স)Ñএই দুটি প্রাতিষ্ঠানিক উপাধি অর্জন করেন কৃতিত্বের সঙ্গে (১৯২৮)। ১৯২৭ সালের ৬ ডিসেম্বর প্যারিস থেকে লেখা চিঠিতে তিনি তাঁর অধ্যয়নসূচির যে-বর্ণনা দেন, তা বেশ বৈশিষ্ট্যম-িতÑ
“কলেজের পড়াশোনা শেষ করিয়াও ছাত্র ছিলাম। কিন্তু আজকাল একেবারে পুরাদস্তর লেখান ছাত্র। আমাকে আমার থিসিস উপলক্ষে বাঙ্গালা ব্যতীত, আসামী, উড়িয়া, মৈথিলী, পূরবীয়া, হিন্দী, পাঞ্জাবী, গুজরাটী, মারাঠি, সিন্ধী, লাহিন্দা, কাশ্মিরী, নেপালী, সিংহলী ও মালদ্বীপী ভাষার আলোচনা করিতে হইতেছে। প্রাচীন ভাষার মধ্যে প্রাকৃত ও আবেস্তার চর্চাও করিতেছি। বিরাট ব্যাপার সন্দেহ নাই। কিন্তু বিরাট কার্যের জন্য বিরাট আয়োজন চাই। তিব্বতীও শিখিতেছি। কাজেই বুঝিতে পার আমার সময়ের উপর কিরূপ গুরুতর চাপ পড়িতেছে।”
ড. শহীদুল্লাহ্-র ডক্টরেট ডিগ্রির থিসিসের শিরোনাম ছিল লেশঁ মিস্তিক্ দ্য কান্ন এ দ্য সরহ (খবং ঈযধহঃং গুংঃরয়ঁবং ফব কধহহধ বঃ ফব ঝধৎধযধ) এবং ধ্বনিতত্ত্ব বিষয়ক নিবন্ধের নাম ‘লে সঁ দু বঁগালি’ (খবং ঝড়হং ফব ইবহমধষরব)। বাংলা করলে বলা যায় ‘কাহ্ন ও সরহের মরমী পদাবলী’ এবং ‘বাংলা ধ্বনি’। কাহ্ন ও সরহের দোহা নিয়ে থিসিস করার পশ্চাতে একটি কাহিনি আছে। ১৯১৬ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১) তাঁর সম্পাদনায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে প্রকাশ করেছিলেন ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয় চারটি পুঁথিÑ চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সররূহব্রজের দোহাকোষ, কৃষ্ণাচার্যের দোহাকোষ, ও ডাকার্ণব। এই গ্রন্থ প্রকাশের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কাল হঠাৎ করে কয়েকশত বছর পিছিয়ে গেল। এর পূর্বে বড়– চ-ীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’কে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদিতম গ্রন্থ বলা হতো। উপর্যুক্ত চতুষ্টয়ের মধ্যে প্রথমটি (চর্যাচর্যবিনিশ্চয়) নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেন ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু তখন পর্যন্ত সরহ ও কাহ্নের দোহা নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। কাজেই শহীদুল্লাহ্ এই দুই জনের দোহার ভাষার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে আগ্রহান্বিত হন। এই থিসিস করার এক অবসরে তিনি জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ও আরবির পাঠও নিয়েছিলেন। দেশে ফিরে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পদে যোগদান করেন। এরপর বাকি সারা জীবন তাঁর কেটেছে অধ্যয়ন, অধ্যাপনা ও শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে। তাঁর রচনার দীর্ঘ তালিকার দিকে তাকালে মনে হবে তিনি সারাজীবন লেখা-লেখির মধ্যেই কাটিয়েছেন। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ রচনাই বিদ্বদ্জনের কাছে মনে হতে পারে তাঁর মেধা ও পা-িত্যের অপচয়। তবে তাঁর রচনার বিষয়বৈচিত্র্য আমাদের কৌতূহল আকর্ষণ করে। বিভিন্ন ভাষার তুলনামূলক আলোচনা, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা লিপি, ভাষাতত্ত্ব, বাঙলি সংস্কৃতি, ধর্ম, সমাজ সব বিষয় নিয়েই তিনি বিচিত্র-ধর্মী প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর লেখার ভাষা সহজসরল ও অনাড়ম্বর। বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু মিলিয়ে তাঁর প্রবন্ধের সংখ্যা আড়াই শ’র কম নয়। স্কুল ও মাদ্রাসা পাঠ্য বই লিখেছেন ৩৩টি, ইসলাম ধর্ম ও নবী সম্পর্কে পরিচিতিমূলক সহজপাঠ্য পুস্তক রচনা করেছেন কমপক্ষে ৮টি। তাঁর প্রবন্ধাবলীর মধ্যে ধর্ম বিষয়ক রচনার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশিÑ ৭০টি। অপরপক্ষে ভাষাতত্ত্ব, ধ্বনিতত্ত্ব ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কিত গ্রন্থ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তবু যা আছে তার সাহিত্যমূল্য অপরিসীম।
জ্ঞানতাপস এই মহামানব জীবনে বহু খ্যাতি, পুরস্কার ও উপাধি লাভ করেছেন। দেশ-বিদেশে অনুষ্ঠিত বহু সম্মেলনে তিনি সভাপতি বা প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেছেন।
অবশেষে এই জ্ঞানবৃদ্ধ মহামানব ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পরিণত বয়সে ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।
লেখক: প্রফেসর (অবসরপ্রাপ্ত) ভাষা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়