ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

আপডেট: জুলাই ১৩, ২০১৯, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

ড. কানাই লাল রায়


ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন বহু ভাষাবিদ্, ভাষাতাত্ত্বিক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্য-সাধক, গবেষক, পত্রিকা-সম্পাদক, দার্শনিক, ধর্মবেত্তা, জ্ঞানতাপস প্রভৃতি নানা অভিধায় ভূষিত এক জ্ঞানসাধক। মানববিদ্যার নানা শাখায় তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল, যেমন সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি, পুরাতত্ত্ব প্রভৃতি। প্রজ্ঞা, অধ্যবসায়, অনুসন্ধিৎসা ও নিষ্ঠার এক বিস্ময়কর সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর জীবনে। জীবনকালেই তাঁকে ”Moving Encyclopedia’ বা চলন্ত বিশ্বকোষ বা ”Living Dictionary’ বা জীবন্ত অভিধান বলা হতো।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঐতিহ্যগত সূত্রে গোরাচাঁদ পীরের খাদিম বংশের সন্তান। কথিত আছে, আনুমানিক খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের প্রথমার্ধে ১৩২৩ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আব্বাস আলী মক্কী নামে জনৈক সাধুপুরুষ চব্বিশপরগণা জেলার ‘দেউলিয়া’ গ্রামে ধর্মপ্রচারের কাজে এসেছিলেন। সাধারণের কাছে তিনি পীর গোরাচাঁদ নামে পরিচিত। সম্ভবত গায়ের গৌরবর্ণের কারণেই তিনি গোরাচাঁদ আখ্যা পান। হিন্দু মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের কাছেই তিনি অতি জনপ্রিয় ও সমদৃত মানুষ ছিলেন। পীরের মতোই তিনি ভক্তি-শ্রদ্ধা পেতেন। দেউলিয়ার নিকটবর্তী ‘বলণ্ডা’ পরগণার অন্তর্গত ‘হাড়োয়া’ গ্রামে বিদ্যাধরী নদীর তীরে এখনও পীর গোরাচাঁদের দরগা বর্তমান আছে। ওই দরগার নিকটস্থ ‘পেয়ারা’ গ্রামে ওই পীরের আদিম খাদিম বা সেবায়েত বংশের আদি নিবাস। ‘পেয়ারা’ গ্রাম বশিরহাট মহকুমার অন্তর্গত। বলা হয়ে থাকে, শেখ দারা মালিকী প্রথম খাদিম হয়ে গোরাচাঁদ পীরের সঙ্গেই বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং এই বংশেরই অধঃস্তন পুরুষ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। অবশ্য শহীদুল্লাহ-ই তাঁদের বংশের খাদিম গিরির ঐতিহ্য ভাঙেন। যদিও তিনি তাঁর শৈশবেই পারিবারিক ঐতিহ্য ও পারিপার্শ্বিক গ্রামীণ জীবনযাত্রা থেকে ধর্ম-সহিষ্ণুতার শিক্ষা পেয়েছিলেন। মফিজ উদ্দীন আহমেদের সাত সন্তানের (তিন কন্যা ও চার পুত্র) মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ষষ্ঠ। ১৮৮০ সালের দিকে শহীদুল্লাহ-র পরিবার পেয়ারা গ্রাম ছেড়ে হাওড়ায় এসে বসবাস শুরু করেন।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই শুক্রবার (বাংলা ১২৯২ সনের ১৭ আষাঢ়) অবিভক্ত বাংলার ২৪ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার ‘পেয়ারা’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সী মফিজউদ্দীন আহমেদ এবং মাতা-র নাম হুরুন্নেসা। হুরুন্নেসা কলকাতার চব্বিশ পরগণা জেলার বারাসাতের অন্তর্গত দেগঙ্গা এলাকার ভাসলিয়া গ্রামের কাজী আবদুল লতিফের কনিষ্ঠা কন্যা।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যে-পরিবারে জন্মেছিলেন সে-পরিবারে প্রচলিত ছিল ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার ঐতিহ্য। তাঁর ডাকনাম ছিল সদানন্দ। তখনকার দিনেও এখনকার মতো অনেক মুসলমান পরিবারে ইসলামি নামের সঙ্গে থাকতো একটি বাংলা নামও। আকিকার সময়ে তাঁর নামকরণ হয়েছিল মুহম্মদ ইব্রাহীম। কিন্তু তাঁর জননীর ইচ্ছানুযায়ী তাঁর পুনর্নামকরণ হয় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাল্য জীবনে কিন্তু সুবোধ বালকটি ছিলেন না। তিনি ছিলেন আত্মভোলা কিন্তু স্ফূর্তিময় বালক। তাঁর আচরণ দেখে পাড়া-পড়শীরা তাঁকে ডাকতেন ‘সদানন্দ’ বলে। গ্রামীণ আড্ডায় অন্যের গানের সঙ্গে পেটবাজিয়ে নেচে নেচে সকলের আনন্দ দান করতেন। গ্রামের মেঠো বাঁশীর সুর তাঁকে আনমনা উদাস করে তুলতো। ভাবতে অবাক লাগে, পরবর্তী জীবনে যিনি সঙ্গীত, নৃত্য ও চিত্রকলা প্রভৃতি নান্দনিক শিল্পের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতেন, তিনিই বাল্য ও কৈশোর জীবনে ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এমনকি, যৌবনের প্রারম্ভ পর্যন্ত তিনি তাঁর এই নানন্দিক দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রেখেছিলেন। শোনা যায় তিনি খুব ভালো শিস দিতে পারতেন এবং এমনকি শালিদের মহলেও তাঁর শিস দিয়ে নাচারও সুখ্যাতি ছিল। অবশ্য একথা ঠিক যে, তিনি আশৈশব পড়াশোনার প্রতি ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী ও অধ্যবসয়ী। এমনকি, শুধু পাঠ্যবিষয় নয়, ইংরেজি, সংস্কৃত, ফারসি, হিন্দি প্রভৃতি নানা ভাষা শিক্ষার প্রতিও তাঁর ছিল সমান আগ্রহ।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের জন্য আত্মজীবনী বা স্মৃতিচারণমূলক কোনও গ্রন্থ রচনা করে যাননি, যা থেকে তাঁর পূর্ব পুরুষের পারিবারিক সংস্কৃতি বিষয়ে কোনও ধারণা তৈরি করা যায়। তবে তিনি যে একটি শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। খাদিম পরিবার হলেও শহীদুল্লাহ-র শৈশবে তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও পারিপার্শ্বিক গ্রামীণ সংস্কৃতিতে পরধর্ম সহিষ্ণুতা বহমান ছিল। হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনও সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব তো ছিলই না, বরং ছিল পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়-সুলভ সদ্ভাব।
আগেই উল্লেখ করেছি, ডক্টর শহীদুল্লাহ-র পরিবার লেখাপড়া জানা পরিবার। কাজেই বাড়িতেই শুরু হয়েছিল তাঁর প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা। পারিবারিক পরিবেশেই তিনি শিখেছিলেন কোরানপাঠ, নামাজশিক্ষা, দরুদপাঠ এবং তার সঙ্গে বাংলা, আরবি ও ফারসি ভাষা। তাঁর আনুষ্ঠানিক হাতে খড়ি হয়েছিল ভাসলিয়া গ্রামের সাওলতিয়া মক্তবে। সেখানে তিনি শিশুপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে পড়েছিলেন বিদ্যাসাগর-প্রণীত বর্ণ পরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ, কথামালা, বোধোদয় প্রভৃতি গ্রন্থ এবং গণিত।
শৈশবে শহীদুল্লাহ মৌলভী সাহেবের হাতে নিগৃহীত হবার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য স্কুলে আরবি-ফারসির পরিবর্তে নিয়েছিলেন সংস্কৃত তৃতীয় ভাষা হিসেবে। দশ বছর বয়সে পিতার কর্মস্থল হাওড়ায় তাঁর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয়। তিনি হাওড়ায় বেলিলিয়াস মিডল ইংলিশ স্কুল ও পরে হাওড়ার পঞ্চাননতলা এম.ই স্কুলে লেখাপড়া করেন। হাওড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি এন্ট্রান্স (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে পাস করেছিলেন। সালটি ১৯০৪ অর্থাৎ উনিশ বছর বয়সে। উল্লেখ্য, কর্মসূত্রে শহীদুল্লাহ্-র পিতা ছিলেন হাওড়া জেলা বোর্ডের এক করণিক। হাওড়ায় আসার পর তাঁর স্কুল জীবনের সূত্রপাত।
আমরা জেনেছি, এন্ট্রান্স পাশের পূর্বেই তিনি অন্ততঃপক্ষে মোটামুটি সাতটি ভাষা জানতেন। গ্রামের ছেলেদের ক্ষেত্রে সচরাচর যেমন হয়, তাঁর বিদ্যাশিক্ষাও শুরু হয়েছিল একটু বেশি বয়সে, তথাপি ঊনিশ বছরের একটি ছেলের পক্ষে সাত সাতটি ভাষার জ্ঞান, তা যতই ভাসা ভাসা হোক, তাঁর বিভিন্ন ভাষার প্রতি বিশেষ প্রবণতা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রম প্রমাণ করে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত তো ছিলই এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলে আরবি-ফারসি-উর্দুর চর্চা থাকায় সেগুলিও শিখতে হয়েছিল। স্কুল জীবনের আট বছর হাওড়ার যে-পাড়ায় তিনি ছিলেন সে-পাড়ায় উড়িষ্যাবাসী এক ধোপার বাড়ি ছিল, ওড়িয়া ভাষা শিখেছিলেন তিনি ওই ধোপা পরিবারের কাছ থেকে। শহীদুল্লাহ-র হিন্দি শিক্ষার গুরুও ছিলেন ওখানকারই এক হিন্দুস্থানী। শহীদুল্লাহ-র নিজের কথায়, “গ্রীক ও তামিল অক্ষরও পড়তে শিখেছিলাম। এই স্কুল জীবনেই ভাষা শিক্ষা আমার একটা বাতিক হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণ ছেলেদের মত ঘুড়ি ওড়ানো, লাটিম ঘোরানো, মারবেল খেলা প্রভৃতি খেলাধূলা না করে আমি ভাষা শিক্ষা করতাম।”
ডক্টর শহীদুল্লাহ-র শিক্ষাজীবন নিরঙ্কুশ মসৃণ ছিল না। ছাত্র হিসেবেও তিনি চোখে পড়ার মতো অতিশয় ধীমান বা মেধাবী ছিলেন না। বরঞ্চ বলা যায়, অতি উজ্জ্বল মেধাবী ছাত্রও দেখা যায় পরবর্তীকালে নিষ্প্রভ হতজ্যোতি হয়ে পড়েছেন, তাঁদের কথা কেউ মনেও রাখেনি। কিন্তু শহীদুল্লাহ-র কথা এক্ষেত্রে একেবারে আলাদা। তাঁর উজ্জ্বলতা প্রকাশ পেয়েছে ক্রমশ, তাঁর গভীর নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় গুণে। তিনি ক্লাসে সাধারণত প্রথম তিন জনের মধ্যেই থাকতেন। সপ্তম শ্রেণির বাৎসরিক পরীক্ষায় একবার রৌপ্য পদক পেয়েছিলেন। কিন্তু এন্ট্রান্স, এফ.এ. বা বি.এ. পরীক্ষায় তেমন আহামরি কোনো রেজাল্ট করতে পারেন নি। তাঁর মেধা ও প্রবণতা এমন একটি বিশেষ লক্ষ্যের অভিমুখী ছিল যা অর্জিত হওয়া না পর্যন্ত শিক্ষিত সমাজে তেমন কোনো দৃষ্টি কাড়তে পারেনি।
এন্ট্রান্স (Entrance) পাস করার পর শহীদুল্লাহ এফ.এ (F.A) পড়ার জন্য ভর্তি হন কলকাতা মাদ্রাসায়। কলকাতা মাদ্রাসা তখন যুক্ত ছিল প্রেসিডেন্সি কলেজের সঙ্গে। সে অর্থে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ. পাস করেন ১৯০৬ সালে। কলেজেও তিনি অন্যতম বিষয় হিসেবে সংস্কৃত নিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, তাঁর কলেজ জীবন নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছিল। তাই অধ্যবসায়ী ও ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও এম.এ. পরীক্ষায় তিনি আশানুরূপ ফল করতে পারেন নি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এফ.এ. পরীক্ষায় পাস করার পর ১৯০৬ সালেই হুগলী মহসীন কলেজে সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। নিয়মনুসারে ১৯০৮ সালেই তাঁর বি.এ. ডিগ্রি লাভের কথা। কিন্তু ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর এই মনঃকষ্ট অনেকটা প্রশমিত হয়েছিল অন্য একটি সৌভাগ্যে। তিনি বহুভাষাবিৎ পণ্ডিত হরিনাথ দে-র সান্নিধ্য লাভ করেন। হরিনাথ বত্রিশটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ওই সময় হরিনাথ দে মহসীন কলেজের অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন। বিভিন্ন ভাষার প্রতি যে শহীদুল্লাহ-র বিশেষ আগ্রহ আছে, সে-কথা তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনাকালেই (শহীদুল্লাহ তখন ওই কলেজে এফ.এ. শ্রেণির ছাত্র) জানতেন। আজহারউদ্দিন খান তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন, “হরিনাথ দে তাঁকে (শহীদুল্লাহ-কে) বিশেষ স্নেহ করতেন। কলেজে পড়ার সময় তিনি তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়তে দিতেন এবং কোন্ কোন্ বই পড়লে সত্যিকারের জ্ঞানার্জন হতে পারে তার তালিকা তৈরি করে দিতেন।” এই কলেজে তিনি শিক্ষক হিসেবে আরও পেয়েছিলেন প্রখ্যাত পণ্ডিত আশুতোষ শাস্ত্রীকে। এই সময় থেকেই ভাগ্যদেবতা শহীদুল্লাহ্-র প্রতি অপ্রসন্ন হতে থাকেন। তিনি কঠিন ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হন এবং ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে তিনি যথা সময়ে বি.এ. পরীক্ষা দিতে পারলেন না। ফলে সাময়িকভাবে ছেদ পড়ে ছাত্রজীবনে। বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে শহীদুল্লাহ্ অতঃপর যশোর জেলা স্কুলে সহকারী শিক্ষকের পদে চাকরি নিয়ে যশোরে চলে যান (১৯০৮)। কিন্তু মনের অস্থিরতায় তিনি বছর পার না হতেই আবার কলকাতায় ফিরে আসেন (১৯০৯ খ্রি.)। শহীদুল্লাহ্ ওই বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বি.এ. পরীক্ষায় প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু এবারও ভাগ্য বিরূপ, সামান্য ১ নম্বরের জন্য পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। তাঁর এই অসাফল্য সম্ভবত তাঁকে যশোর জেলা স্কুলের চাকরি ছাড়তে প্ররোচিত করতে পারে। অতঃপর শহীদুল্লাহ্ কলকাতায় এসে সিটি কলেজে বি.এ. ক্লাসের দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হন। এবারও তাঁর সংস্কৃত বিষয়ে অনার্স ছিল। সিটি কলেজে ভর্তির ব্যাপারে তিনি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়-এর সহযোগিতা লাভ করেছিলেন। সিটি কলেজে সংস্কৃত অনার্স ক্লাসে শহীদুল্লাহ্ শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন পণ্ডিত উপেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ, হরেন্দ্রকুমার মুখোপাধ্যায় প্রমুখদের। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯১০ সালে তিনি বি.এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। উল্লেখ্য, বেদের পেপারে তাঁর সর্বোচ্চ নম্বর ছিল। একজন মুসলমান ছাত্রের পক্ষে সে-যুগের প্রেক্ষিতে সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে বি.এ. পাস করা একটি ব্যতিক্রমধর্মী এবং দুর্লভ ঘটনা বলা যায়। যখন শহীদুল্লাহ যশোর জেলা স্কুলে শিক্ষকতারত তখন তিনি ‘মদনভস্ম’ নামে একট নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করে’ সেকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাসিক পত্র ‘ভারতী’তে পাঠান এবং প্রবন্ধটি গুণগত কারণে ১৩১৬ সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যা ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হয়। রচনাটির ভাষা সুললিত এবং বিষয়বস্তু প্রাচীন সংস্কৃত কাব্যে সামাজিক রূপকান্বেষণ। প্রবন্ধটি পাঠ করে’ পত্রিকার সম্পাদক স্বর্ণকুমারী দেবী এত মুগ্ধ ও চমৎকৃত হন যে প্রবন্ধের শুরুতে মুখবন্ধ রচনা করে’ নবীন লেখককে বিদ্বৎসমাজে পরিচিত করাবার একপ্রকার দায়িত্ব অনুভব করেন। তিনি লিখেছিলেন-
“নিম্নলিখিত ক্ষুদ্র প্রবন্ধটি একজন মুসলমানের লেখা। ইনি সংস্কৃত সাহিত্যের অন্তরে কতদূর প্রবেশ লাভ করিয়াছেন এই প্রবন্ধ তাহার পরিচায়ক। আজকাল বাংলা সাহিত্যকে জাতীয় সাহিত্যরূপে গ্রহণের দিকে আমাদের মুসলমান ভ্রাতাগণের মধ্যেও একটি চেষ্টা দেখা যাইতেছে। ইহা বড়ই সুখের বিষয়। ধর্ম সম্বন্ধে আমাদের পরস্পরের যতই মতভেদ থাকুকÑ আমরা উভয় সম্প্রদায়ই বাঙালী, বিধাতার বিধানে আমাদের উভয়কেই একত্রে বাঁচিতে হইবে। এ অবস্থায় আমাদের মধ্যে সাহিত্যের একতা বিশেষভাবে প্রার্থনীয়। কেননা সাহিত্যই পরস্পরের মিলনের শ্রেষ্ঠ উপায়। বর্তমান লেখকের আমাদের পুরাতন সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ দেখিয়া তাই আমরা অতিশয় আনন্দলাভ করিয়াছি। Ñভারতী সম্পাদিকা।
এই সময় ড. শহীদুল্লাহ-র জীবনে একটি বড় ঘটনা ঘটে। তখনও তিনি বি.এ. পাশ করেননি, তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয় চব্বিশ পরগণার ভাসলিয়া (দেগঙ্গা) গ্রামের মুন্সী মুহম্মদ মুস্তাকিমের কন্যা মরগুবা খাতুনের সঙ্গে। তাঁর বিবাহের তারিখ মনে রাখা খুব সহজ, বৃদ্ধ বয়সে তিনি পরিহাস করে বলতেন ‘টেন কিউব’ (১০৩) অর্থাৎ ১০.১০.১৯১০ তারিখে। এ সময় তাঁর বয়স পঁচিশ এবং তাঁর স্ত্রীর মরগুবা খাতুনের বয়স চোদ্দ বছর।
১৯১০ সালে বি.এ. পাশ করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিষয় নিয়ে এম.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। এখানেই বিপত্তি ঘটে। সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক বেদজ্ঞ পণ্ডিত সত্যব্রত সামাশ্রমী এবং অন্যান্য কয়েকজন পণ্ডিত, একজন অব্রাহ্মণ তদুপরি মুসলমান ছাত্রকে পাঠদানে অস্বীকৃতি জানান। সামাশ্রমীর যুক্তি একজন অব্রাহ্মণকে বেদ পড়ানো অর্ধমের কাজ, আর এক্ষেত্রে তো ছাত্র আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী। এ নিয়ে নানা বাত-বিতণ্ডা শুরু হয়। বিদ্বৎ সমাজে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় (হিতবাদী, সঞ্জীবনী, দি বেঙ্গলি) অধ্যাপক সামাশ্রমীর পক্ষে ও বিপক্ষে সমানভাবে আলোচনা-সমালোচনা প্রকাশিত হতে থাকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মৌলানা মুহাম্মদ আলীর মত রাজনৈতিক নেতা পর্যন্ত এক সঙ্গে ও সমানভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যায়তনের তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দি বেঙ্গলি’ পত্রিকায় লিখলেন, ‘The Pandits should be thrown into the holy water of the ganges ‘মৌলানা মুহম্মদ আলী ‘কমরেড’ পত্রিকায়’ The Lingua Franca of classics would no doubt be attracted by the inexhaustible minus of literature and philosophy in Sanskrit and Arabic, and while we hope that Muslim Scholars would learn Sanskrit in larger number than we do at present, we trust such incidents as the ‘Shahidullah Affair’, when a pundit of Calcatta University refused to teach Sanskrit to a Muslim student would not recur. এতৎসত্বেও অধ্যাপক সামশ্রমী তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। কিন্তু যে ছাত্রের সংস্কৃতে এম.এ. পড়া নিয়ে এত বাদ-প্রতিবাদ তিনি দুঃখ পেলেও অপমানিত বোধ করেন নি। তিনি স্থির মানসিকতা নিয়ে পরিস্থিতি লক্ষ্য করছিলেন। ধীমান বিনয়ী শহীদুল্লাহ আত্মপক্ষ সমর্থনে একটি কথাও বলেন নি। এই ঘটনা প্রবাহের নাম, সংবাদপত্রের ভাষায়, শহীদুল্লাহ অ্যাফেয়ার’ নামে পরিচিত হয়। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র জীবনী লেখক হায়াৎ মাহমুদের মনে হয়েছে, গুরুর ধর্মীয় সংস্কারকে শ্রদ্ধা জানাবার জন্যই শহীদুল্লাহ নীরব থেকে ছিলেন। অধ্যাপক আশুতোষ শাস্ত্রীও তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন যে, শহীদুল্লাহ্ এই বিবাদ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। অবশেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এই জটিল সমস্যার সমাধানে স্বয়ং এগিয়ে আসেন। তিনি শুধুমাত্র ছাত্র শহীদুল্লাহ-র জন্য তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব নামে একটি নতুন বিভাগ খোলেন। বলাবাহুল্য, শহীদুল্লাহ-ই ওই বছর ওই নতুন বিভাগে একমাত্র ছাত্র ছিলেন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন প্রতিষ্ঠিত (১৯১০) এই তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একমাত্র ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন এবং যথাসময়ে অর্থাৎ ১৯১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। উল্লেখ্য, ছাত্রজীবন থেকেই শহীদুল্লাহ্-র বিভিন্ন ভাষার প্রতি যে আগ্রহ জন্মেছিল তা আমরা জানি। সেই আগ্রহই হয়তো তাঁকে শেষ পর্যন্ত এই বিভাগে ভর্তি হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কারণ, এই বিভাগে ভর্তি হলে ভাষার বৈজ্ঞানিক আলোচনা পাঠগ্রহণে সুযোগ মিলবে। বিভিন্ন ভাষার তুলনামূলক আলোচনার সুযোগ ঘটবে। এখানে তিনি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন রবিদত্ত ও মটোট্রসের মতো ভাষাতাত্বিক শিক্ষকদের। এই সময়ের মধ্যেই (শহীদুল্লাহ-র বয়স তখন ২৭ বছর) তিনি আঠারটি ভাষায় (বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু, আরবি, ওড়িয়া, ফ্রেঞ্চ, জার্মানি প্রভৃতি) দক্ষতা অর্জন করেন।
এম.এ. ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি নানারকম কর্মযজ্ঞে জড়িয়ে পড়েন। যেমন, আইন অধ্যয়ন, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি প্রতিষ্ঠা, স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা, এতিমখানা পরিচালনা, ওকালতি, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, ইংরেজি-বাংলা পত্রিকা সম্পাদনা, ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা, মৌলিক সৃজনধর্মী গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ রচনা, অনুবাদ কর্ম, প্রাচীন গ্রন্থ (চর্যাপদ, বিদ্যাপতি শতক, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন প্রভৃতি) সম্পাদনা, অভিধান প্রণয়ন, স্কুল ও মাদ্রাসাপাঠ্য পুস্তক রচনা, ধর্ম সভায় সভাপতিত্ব, ওয়াজমাহফিল, ধর্মান্তরীকরণ, সমাজসেবা প্রভৃতি বিচিত্রধর্মী কাজ। ভাষা বিজ্ঞানী ডক্টর পবিত্র সরকার ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, এই স্বল্প-সাক্ষরের দেশে তাঁর মতো মহামণীষীকে কেবল বিদ্যাচর্চা বা বিদ্যার সংগঠনে নয়, অন্যান্য বিষয়েও নেতৃত্ব দিতে হয়েছে বলেই তাঁর অজস্র সময় নষ্ট হয়েছে। স্বল্পসাক্ষর এবং দরিদ্রের দেশে শিক্ষিত বা পণ্ডিত হওয়ার অর্থই হল খানিকটা নানা বিষয়ের নেতৃত্বের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া। যাঁরা চার পাশের মানুষের জিজ্ঞাসা আর প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে নিজেদের সূক্ষ্ম গবেষণায় স্থিরবদ্ধ থাকতে পারেন এবং কেবল উচ্চাঙ্গের বুধজনকে নিজেদের পাঠক হিসাবে নির্ধারিত করে কুশাগ্র জ্ঞান চর্চায় নিজেদের নিমগ্র রাখতে পারেন, তাঁদের কথা আলাদা। তাঁরা বড়ো কীর্তি রেখে যেতে পারেন, কিন্তু তাঁদের নিরক্ষর এবং অল্পবোধসম্পন্ন দেশবাসীর তাঁরা কোনো অব্যবহিত প্রয়োজনে আসেন না। …সমৃদ্ধ দেশে কিংবা সর্বজনীন শিক্ষিতের দেশে জ্ঞানভিক্ষুকে সব সময় ‘যুগনায়কে’র ভূমিকা নিতে হয় না, তিনি তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা এবং জ্ঞানপ্রসারে নিজের সমস্ত ব্যবহার্য সময় ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু এই উপমহাদেশের সময় এবং সমাজ যে-কোনো বিবেকবান বিদ্যাজীবীকে তাঁর গজদন্তমিনার থেকে নেমে আসতে বাধ্য করে।” ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র মতো বিবেকবান ও সমাজ হিতৈষী মানুষও তা পারেন নি। আর পারেন নি বলেই আমরা তাঁর মতো জ্ঞানতাপসের কাছ থেকে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় কিংবা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো যথার্থ গবেষণা-সমৃদ্ধ কোনো গ্রন্থ আমরা পাইনি।
এম.এ. পাশ করার পরের বছরে (১৯১৩) মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সুপারিশে ভারত সরকারের একটি বৃত্তি পান জার্মানি গিয়ে সংস্কৃত শিক্ষার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েও শহীদুল্লাহ্-কে তিনি সংস্কৃতে এম.এ. পড়ার সুযোগ দিতে পারেন নি। এটি তাঁর মর্মপীড়ার কারণ হয়েছিল। তাই যখন সুযোগ এল স্যার আশুতোষ আবার শহীদুল্লাহ্-কে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। ১৯১৩ সালেই ভারত সরকার ইউরোপে গিয়ে সংস্কৃত চর্চা করার জন্য এই বৃত্তিটি প্রচলন করেন। স্যার আশুতোষ এই প্রথম প্রচলিত বৃত্তির জন্য শহীদুল্লাহ্-র নাম সুপারিশ করেন। শহীদুল্লাহ্ জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত পড়বার সুযোগ পেলেন। কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্য ওই দুর্লভ সুযোগ তিনি কাজে লাগাতে পারেন নি। কারণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষার মেডিকেল রিপোর্টে তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেন নি। আর একটি মত হলো যে স্বাস্থ্যের কারণে নয়, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার জন্য নাকি শহীদুল্লাহ্-র পক্ষে বিদেশে পড়তে যাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে, ভারত সরকারের এই বৃত্তি নিয়েই ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯২১ সালে ইউরোপে পড়াশুনা করতে গিয়েছিলেন।
(আগামীকাল সমাপ্য)
লেখক: প্রফেসর (অবসরপ্রাপ্ত) ভাষা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়