ঢাকার ১৩টি আসনে মনোনয়নের বিষয়ে জানতো না বিএনপির স্থায়ী কমিটি!

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৯, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৩টি আসনে প্রার্থীদের মনোনয়নের বিষয়ে কিছুই জানতো না বিএনপির স্থায়ী কমিটি। কে বা কারা ১৩ জন প্রার্থীকে চূড়ান্ত করলো, কেন করলোÍ এর কোনও কারণ খুঁজে বের করতে পারছেন না স্থায়ী কমিটির সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার (৩১ জানুয়ারি) রাতে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এ বিষয়ে আলোচনা করেন। পুরো বিষয়টিকে ‘কঠোর গোপনীয়তা’র সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয় এ বৈঠকে। যদিও কোনও সদস্যই এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের কাছে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, লে. জে. অব. মাহবুবুর রহমান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মনোনয়নের বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই না। মহাসচিবকে বলেন, তিনি বলতে পারবেন।’ পরে মির্জা ফখরুলকে প্রশ্ন করা হলে তিনিও কোনও জবাব দেননি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য শুধু বললেন, ‘কে দিলো, কোত্থেকে দিলো, চিন্তাই করতে পারছি না। আমরা কিছুই বের করতে পারি নাই।’
কিন্তু কেন এই রহস্য, এমন প্রশ্নের উত্তরে এই সদস্যের ভাষ্যÍ ‘রহস্য তো আছেই। এটা নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে কেন জানবো না, এটা গুজব। কোত্থেকে এই প্রসঙ্গ এলো? এটা কি নতুন ইস্যু? কে দিলো?’ সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দিকে এত নজর দেয়ার কিছু নেই, সরকারের দিকে নজর দিন।’
ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৩টি আসনে রহস্যজনক মনোনয়নের বিষয়ে শুক্রবার (১ ফেব্রুয়ারি) বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। এরমধ্যে ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মনোনয়নের বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপিকে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে।’
জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, ঢাকার মনোনয়ন নিয়ে অনেক সদস্যের কাছে খবর না থাকারই কথা। বিশেষ করে স্থায়ী কমিটির অন্যতম কয়েকজন সদস্য তখন নিজের এলাকায় চলে যান। এরা হলেন, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ড. আবদুল মঈন খান। এর মধ্যে মোশাররফ হোসেন দুটি আসনে নির্বাচন করেন।
ভাইস চেয়ারম্যানদের একজনের ভাষ্য, ‘বেগম জিয়ার অনুপস্থিতি, তারেক রহমান লন্ডনে থাকায় নেতৃত্বের মধ্যে ঘাটতি ছিলই। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, নিজের ঠাকুরগাঁও ও বগুড়া আসনে যাতায়াত এবং নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যস্ত থাকলেও বাকি নেতাদের মধ্যে নজরুল ইসলাম খান ২০ দলীয় জোট, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নির্বাচনি আসনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সেক্ষেত্রে দলের মূল নেতৃত্বশূন্যতা তো ছিলই। সেই হিসাবে মনোনয়নের বিষয়ে তাদের জানা না থাকলে বিস্ময়ের কিছু নেই।’
নাম প্রকাশ না করে আরেকজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘নির্বাচনের আগে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের দিনলিপি দেখলেই পরিষ্কার হবে, তারা কী কাজে ব্যস্ত ছিলেন।’
ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে কয়েকটি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কয়েকজন নেতাকে বরাদ্দ দেয়া হয়। কিছু আসন নিয়ে প্রশ্ন ছিল মনোনয়নের আগে ও পরে। বিশেষ করে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসকে ঢাকা-৯, নবীউল্লাহ নবীকে ঢাকা-৫, সাইফুল ইসলাম নীরবের ঢাকা-১২ আসন নিয়ে প্রশ্ন ছিল বেশি। এছাড়া, ঢাকা-২ আসনে ইকবাল ইবনে আমান অনিক, ঢাকা-১১ শামীম আরা বেগম, ঢাকা-১৩ আবদুস সালাম, ঢাকা-১৬ আহসান উল্লাহ হাসান, ঢাকা-১৯ দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন, ঢাকা-১৪ আবু বকর সিদ্দিক, ঢাকা- ১ খন্দকার আবু আশফাক এবং ঢাকা-২০ তমিজউদ্দিনের আসন পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন ছিল দলের ভেতরে-বাইরে।
স্থায়ী কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য গত ৩১ ডিসেম্বর গুলশানে বৈঠক শেষে এ প্রতিবেদকের কাছে মন্তব্য করেছিলেন, নবীউল্লাহ ও নীরব, তারা প্রার্থী হয় কী করে? ওই সদস্যের ভাষ্য ছিল, ‘ঢাকার ২০টি আসনে মনোনয়নের হালই-তো বলে দেয়, নির্বাচনের বিষয়ে পরাকাষ্ঠা কতদূর।’
বিষয়টি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন ঢাকার কয়েকটি আসনের বিএনপি প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। ঐক্যফ্রন্টের একজনকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিএনপির সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
ঢাকা-১৩ আসন থেকে বিএনপির হয়ে প্রার্থিতা করেছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম। বাংলা ট্রিবিউনের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘স্থায়ী কমিটি কেন জানবে না, তাদের তো জানার কথা। জানবে না কেন?’ যদিও স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এই ‘কেন’র কোনও উত্তর জানা যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘ঢাকার মনোনয়ন তো দাগ কেটে দেওয়ার মতো ঘটনা। যেমনÍ কাইয়ূম কমিশনার মনোনয়ন পেলো তার অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী। এই কাইয়ূম কমিশনার কে? তার স্ত্রী-ই বা কে? পুরো প্রক্রিয়াই তো অগোছালো ছিল। ঢাকায় কী হচ্ছে, এটা নিয়ে স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্যদের কোনও রা ছিল না।’
স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য জানান, বৃহস্পতিবার (৩১ জানুয়ারি) স্বল্প সময়ের বৈঠকে ঢাকার ১৩টি আসনের মনোনয়ন ছাড়াও সারাদেশের প্রার্থীদেরকে আবারও ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। নেতাকর্মীদের মামলা দেখভাল, ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহযোগিতা এবং নিয়মিত যোগাযোগ করার বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা একমত হন।
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন