তরুণদের কর্মসংস্থান দুর্গতি : বাধাগ্রস্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রস্তুতি

আপডেট: নভেম্বর ১১, ২০১৭, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

মো. আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়


নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২৯ ডিসেম্বর ২০০৮) সামনে রেখে আওয়ামীলীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল তাতে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। ফার্স্ট টাইম ভোটারদের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ রীতিমতো জনপ্রিয় সেøাগান হয়ে ওঠে। সময়ের বিবর্তনে কতই না পরিবর্তন ঘটে। ২০০৯ সালে সরকার লক্ষ্য নির্ধারণ করে-২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর মধ্যে বাংলাদেশের ডিজিটাল যুগে উত্তরণ সম্পূর্ণ হবে। এ সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে আয় পোশাক খাতকে ছাড়িয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা রয়েছে। বিল গেটস দুই দশক আগে বলেছিলেন, এক সময় ধনি ব্যক্তি বলতে বোঝাত তার কত বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে, ব্যাংকে কত বড় অঙ্কের অর্থ গচ্ছিত আছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে একজন তরুণ ঘরে বসেও বছরে কোটি কোটি টাকা আয় করতে পারে। ফেইসবুকের প্রতিষ্ঠাতা ইতোমধ্যে বিশ্বের সেরা ধনি হয়ে তা প্রমাণ করেছেন। তথ্য প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দিনে দিনে তথ্য প্রযুক্তি সেবা এতটাই সর্বজনিন হয়েছে যে ঘরে বসে ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিং এ কাজ করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছেন। আজকাল তথ্য প্রযুক্তির সুফলে অনেকগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে আমরা সবাই অতি পরিচিত। ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, ভাইভার, ইমু, হোয়াটস আপ আরো অনেক কিছু। এর সুফল অনেক।
তথ্য প্রযুক্তির সাথে নিজেকেও এগিয়ে নিতে হবে। পশ্চিমা দেশের মানুষরা সব সময় যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলে ফলে নিজেকে তারা প্রবীণ ভাবে না। আমরা নিজেদের প্রয়োজনীয় কাজগুলোর প্রযুক্তিগত ব্যবহার শিখে নিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারি। কারণ কম্পিউটার আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত একটা চাকর। সে অতি দ্রুত গতিতে ক্লান্তিহীন নির্ভুলভাবে আমার প্রয়োজনীয় কাজগুলো করে দিতে পারে। ভুল যদি কিছু হয়; সে ব্যক্তির, কম্পিউটারের কোন দোষ নেই। বর্তমানে নারীরাও ই-কমার্স ও এফ কমার্সে যথেষ্ট পরিমাণ মেধার স্বাক্ষর রেখেই ক্ষান্ত হয়নি বরং এগিয়ে আছে। থ্রি পিস, ফতুয়া, শাড়ি থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র নিত্যনতুন ডিজাইন করছে তারা। নানা বিষয়ে আমাদের দেশে তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পরেছে।
উন্নত বিশ্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুমের ব্যবস্থা রয়েছে। কম্পিউটারও রয়েছে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অবশ্যই প্রযুক্তিতে দক্ষ শিক্ষক রয়েছেন। পাওয়ার পয়েন্ট ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহার করে অতি সহজে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা সম্ভব। এই পদ্ধতি শুধু আইসিটি বিষয়ই নয়; সকল বিষয়ের শিক্ষকরাই এভাবে পাঠদান করতে পারেন। তাতে করে শিক্ষার্থীদের মাথায় বাড়তি পড়ার চাপ পড়ে না। বিষয়টি ভালভাবে আয়ত্ত করতে পারে। অনেক বছর আগে থেকেই আমাদের পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে কোনো কিছু শেখার জন্য কম্পিউটার অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। স্পোকেন ইংলিশ, ছবি আঁকা, গিটার শেখা, এমনকি বড় বড় বিল্ডিঙের ডিজাইন আজকাল খুব কম সময়ের মধ্যে কম্পিউটারের সাহায্যে করা সম্ভব। অনলাইনে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ; এমনকি পিএইচডি ডিগ্রি পর্যন্ত নিচ্ছেন অনেকে। বিদেশি লাইব্রেরির দুর্লভ বইটিও ই-বুক’এ পড়তে পারছে। আর এ কারণেই ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়ন কাজ সক্রিয়ভাবে শুরু করা হয় ২০০৯ সালে। তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি তথ্য প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলার বিষয়টিও মাথায় রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। সে কারণেই প্রণীত হয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) নীতিমালা ২০০৯ ।
তথ্য প্রযুক্তি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে ২০২১ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি আয় অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তির খাতই তখন জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দেশি আইসিটি শিল্পের প্রসারে আইটি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কালিয়াকৈর, যশোর, সিলেট, রাজশাহী, নাটোরসহ বিভিন্ন স্থানে আইটি পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। আইটিসি সেবা নিশ্চিতে সরকার এরই মধ্যে উপজেলা পর্যন্ত ফাইবার অপটিক ক্যাবল লাইন স্থাপন করেছে। প্রত্যন্ত ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ৫৩০০ ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে, যেখান হতে প্রায় একশ’ ধরনের ই-সেবা দেয়া যায়। শিক্ষা ক্ষেত্রেও ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অন্যান্য বিষয়ের সাথে এইচএসসি পর্যন্ত আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যবসায় যে কো নো বিষয়ে অনার্স ও ডিগ্রিতে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আগামী ১৬ ডিসেম্বরের আগেই বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’- এর মহাকাশে উৎক্ষেপণ লক্ষ্য নির্ধারণ তথ্যপ্রযুক্তিকে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। এত কিছু কল্পনা পরিকল্পনার পরও ডিজিটাল বাংলাদেশ ধ্যান ধারণা বাস্তবায়নে করতে কত পিছিয়ে আছি, তা আমার দেখতে পাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কর্মকা- পর্যালোচনার করলে। বিগত ৫ ফেব্রয়ারি ২০১৬ তারিখে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। আন্তর্জাতিক সাইবার ক্রিমিনালরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলারের সমান টাকা অনলাইনে চুরি করে নিয়ে গেছে। গভীর রাত জেগে কিছু সংখ্যক উচ্ছৃঙ্খল তরুণ-তরুণী ফেইসবুক খেললেই ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়ে গেল এই ধারণা ভুল আর ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উন্নয়ন রিপোর্ট ২০১৬ অন্তত তাই বলে।
যোগাযোগ, বিনোদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির আর্শীবাদ হয়ে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে এই অর্জন অনেক বড় মনে হলেও জাতিসংঘের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক বিশেষায়িত সংস্থা আইটিইউ বলছে, বাংলাদেশ খুব বেশি এগোয়নি। ২০১৬ সালের আইসিটি উন্নয়ন সূচকে (আইডিআই) ১৭৫ দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান অনেকটাই তলানিতে, ১৪৫ তম। বর্তমান বিশ্বে ৪০০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশে এই সংখ্যা ১৪ কোটি। ইন্টারনেট থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যায় একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। তবে জনসংখ্যার হিসাবে পিছিয়ে থাকলে সার্বিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারে ৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৬তম। ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে এক গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণাটি করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট।
তাদের এই অভিযোগ অমূলক নয়। দেশে ডিজিটাল ‘ডিভাইড’ তথা বৈষম্য প্রকট। গতিহীন ইন্টারনেট খুব একটা কাজে দেয় না, অথচ দ্রুতগতির ইন্টারনেটসেবা এখনো শহর এলাকাগুলোতেই সীমিত। লাখ লাখ মানুষ আছে অ্যানড্রয়েড, আইফোন কিংবা উইন্ডোস ফোন চালানোর মতো জ্ঞান রাখে না। প্রযুক্তি জবাবদিহি বাড়ায়, প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনে। অথচ অনেক সরকারি দপ্তরে কম্পিউটারের ব্যবহার করতে জানে না। ই-অফিস ব্যবস্থাপনার অর্থই হচ্ছে লাল ফিতার দৌরাত্ম, তথা উপরি আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া! দুর্নীতিগ্রস্ত মহল তা চাইবে কেন? কাজটি করতে হবে নীতিনির্ধারক মহলকে। সরকারি দপ্তরগুলো ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় চলে এলে সাধারণ মানুষের হয়রানিও অনেক কমে আসবে।
সম্প্রতি তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর বা বিষয়ক বেশ কিছু প্রকল্প, এগুলোর বাস্তবায়ন ও সাবেক অবস্থা ইত্যাদি নিয়ে বিতর্ক আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক প্রকল্পগুলো ও অন্যান্য ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রযুক্তি উপাংশগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। একেকটা প্রকল্পে অনেক বড় অঙ্কের টাকা অনুমোদন বা লগ্নি করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়ে থাকে। কিন্তু সফলতার হার সন্তোষজনক নয়। একটি তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর সিস্টেম কিংবা সফটওয়্যার সঠিকভাবে নির্মিত হয়েছে কী না তা পরীক্ষা করা একটি সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি। ‘সফটওয়্যার টেস্টিং’ এই কারণে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল পাঠক্রমের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্প্রতি বাংলা নিয়ে কিছু ব্যয়বহুল প্রকল্পের কথা আলোচনায় এসেছে। একই সফটওয়্যার সরকারেরই একাধিক অধিদপ্তর বা প্রকল্প থেকে আলাদাভাবে নেয়া হয়েছে, যা সুস্পষ্টভাবে সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত বহন করে।
এরপরও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে বসে থাকলে হবে না, গৃহীত উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়নও করতে হবে। জনসংখ্যার আধিক্যকে আমরা বোঝা মনে করি; তথ্য-প্রযুক্তির পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হলে তারাই হয়ে উঠবে উন্নয়নের হাতিয়ার। সবকিছু ছাপিয়ে ব্যবহারে তথ্য প্রযুক্তির দরকার দক্ষ জনশক্তি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন করার পর দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সোনার বাংলা গড়বে। সোনার বাংলা গড়তে তিনি ‘সোনার মানুষ’ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ তারই পরিবর্তিত সংস্করণ। এজন্য প্রয়োজন ডিজিটাল মানুষ। ব্যাংক, বিমা, চিকিৎসা, শিক্ষা, শিল্প, কৃষিতে এনালগ কর্মকা- বাতিল করে ডিজিটাল করতে হবে। বিশ্বব্যাপি ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীরাই আধুনিক প্রযুক্তির ধারক বাহক। উপনিবেশিক আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রসারে প্রাচীর নির্মাণ করে রেখেছেন। বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করে এই প্রাচীর ভাঙতে হবে। ২০২০ সালের মধ্যে দেশকে প্রকৃত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এ পরিণত করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিতেই হবে। ডিপ্লোমা শিক্ষাকেই বিবেচনা করতে হবে। দ্রুত উন্নযন প্রত্যাশি দেশসমূহ তাই করেছে।
লেখক: সভাপতি ও মহাসচিব, ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।
কযধহধৎধহলধহৎড়ু@মসধরষ.পড়স