তাকওয়া অর্জনের ক্ষেত্রসমূহ

আপডেট: মে ১৬, ২০১৯, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

ড. মাওলানা ইমতিয়াজ আহমদ


মানুষ যখন মাতৃগর্ভ হতে পাপ-পঙ্কিলে ভরা এই ধরায় পদার্পণ করে তখন সে থাকে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ, থাকে নিষ্কলুষ। পাপের ছিটেফোঁটাও থাকে না তার দেহ-মনে। কিন্তু দাহ্য পদার্থ যেমন আগুনে নিক্ষিপ্ত হলে দহন থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না, আগুন তাকে গ্রাস করেই, ঠিক তেমনি পাপপ্রবণ নফসের অধিকারী মানুষও দুনিয়ার এই পাপের মাঝে নিক্ষিপ্ত হয়ে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। ক্রমশ সে জড়িয়ে পড়ে পাপের শক্ত মজবুত বেড়াজালে। পাপময় দুনিয়া তার সমস্ত প্রচেষ্টার বিনিময়ে মানুষকে বেঁধে ফেলে। তাকে পাপিষ্ঠ করে তোলে। করে কলুষিত। তাকে ভুলিয়ে দেয় আলমে আরওয়াহে দেওয়া ‘আলাসতু বি রব্বিকুম’ এর স্বীকৃতি বা প্রতিশ্রুতিমূলক ঐতিহাসিক জবাব। ফলে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য (আল্লাহর ইবাদত) থেকে সরিয়ে তাকে জাহান্নামের পথযাত্রী করে তোলে। (অবশ্য নবীগণ এর অন্তর্ভুক্ত নন। কারণ তারা আজন্ম মাসুম- নিষ্পাপ।) কিন্তু আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন অতি মহান, তিনি রহমান, তিনি হাদী, পথপ্রদর্শক। তিনি মানুষকে সহজ-সরল পথ তথা তাঁকে পাওয়ার পথ দেখিয়েছেন। এই পথ দেখিয়েছেন নবী-রাসুল ও কিতাব দ্বারা। সহজ-সরল পথ বলতে তার ইবাদত করাকেই বুঝায়। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, এবং তোমরা আমার ইবাদত কর। এটাই সহজ-সরল পথ। (সূরা ইয়াসিন, ৬১) কিছু কিছু ইবাদতকে আল্লাহ্ তায়ালা অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যেমন ঈমান, সালাত, সাওম, জাকাত ও হজ্জ। এই ইবাদতের জন্য কোনো কোনো মুহুর্তকে আবার কোনো কোনো দিন বা রাতকে বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন তিনি। আর বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মাস হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন মাহে রমজানকে।
প্রতিটি জিনিসেরই একটা মৌসুম আছে। যেমন ব্যবসার মৌসুম, ফল-ফলাদির মৌসুম ইত্যাদি। নির্দিষ্ট মৌসুমে নির্দিষ্ট বস্তুটি সহজলভ্য ও সময়োপযোগী হওয়ার কারণে তা যেমন আকর্ষণীয় হয় তেমনি তা হয় গুরুত্ববহ। যেমন উল বা উলজাতীয় বস্ত্রাদির মৌসুম হচ্ছে শীতকাল। শীতকালে তা যেমন সহজলভ্য হয় তেমনি হয় সময়োপযোগী। এছাড়া উলজাতীয় হরেক রকম পোশাকের বিপুল সমাহারও ঘটে। ঠিক তেমনি ইবাদতের মৌসুম হচ্ছে মাহে রমজান। অন্যান্য ইবাদতসহ ইসলামের মৌলিক পাঁচটি ইবাদতের চারটিরই সমাবেশ ঘটে এ বরকতের মাসে।
মানুষের কাজই হলো এক আল্লাহর ইবাদত করা। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, হে মানুষ সকল! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর। যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদিগকে সৃষ্টি করেছেন। যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো। (সূরা বাকারা, ২১) অত্র আয়াতে প্রতীয়মান হয় যে, শুধু রোজা নয়, সকল প্রকার ইবাদতের উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করা।
তাকওয়া অর্থ হচ্ছে ভয় করা বা নিজেকে অন্যায় অপকর্ম থেকে বিরত রাখা। অর্থাৎ আল্লাহর ভয় সামনে রেখে তার নির্দেশিত পথে চলা এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে তার সন্তষ্টি অর্জন করা। উল্লেখ্য, যিনি তাকওয়া অর্জন করেন তাকে মুত্তাকী বলা হয়।
রমজানুল মুবারকে তাকওয়া অর্জনের ক্ষেত্রসমূহ
সিয়াম সাধনা: মাহে রমজানে বান্দাকে দীর্ঘ একটি মাস সিয়াম সাধনা করতে হয় তাকওয়া অর্জনের জন্যই। আল্লাহ্ তায়ালা বান্দার উপর রোজা ফরজ করেছেন। যাতে করে বান্দা তাকওয়া অর্জনপূর্বক মুত্তাকি হতে পারে। আল্লাহ্ তায়ালা কুরআনে বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেরূপ ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সূরা বাকারা, ১৮৩) আর এ অর্জনটা হয় বরকতময় রমজান মাসেই।
নামাজ কায়েম: রমজান মাসে বিভিন্ন রকম নামাজ আদায়ের পরিমাণ তুলনামূলক ভাবে বৃদ্ধি পায়। একজন বান্দাকে মুত্তাকী হতে হলে তাকে অবশ্যই নামাজ কায়েম করতে হবে। পবিত্র কুরআনে মুত্তাকির পরিচয় দিতে গিয়ে পাঁচটি গুণাবলী উল্লেখ করা হয়েছে। তার দ্বিতীয় গুণটি হচ্ছে, (তারাই মুত্তাকি যারা) নামাজ কায়েম করে। (সূরা বাকারা, ৩)। নির্ধারিত ফরজ, সুন্নাত নামাজসহ পূর্বের ছুটে যাওয়া ক্বাযা নামাজ আদায়ের পাশাপাশি অধিক হারে নফল নামাজ আদায়ের মাধ্যমে বান্দা তাকওয়া অর্জন করে মুত্তাকী হতে পারে ইবাদতের মাস রমজানে।
কালেমা পাঠ: কালেমা পাঠ মানে আল্লাহ্কে না দেখে অদৃশ্যের উপর ঈমানের ঘোষণা করা। আর এটাই হচ্ছে কুরআনে বর্ণিত মুত্তাকির পাঁচটি গুণের প্রথম গুণ। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, (তারাই মুত্তাকি যারা) অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। (সূরা বাকারা, ৩) রমজান মাসে বান্দা অধিক হারে কালেমা পাঠের মাধ্যমে নিজের তাকওয়াকে মজবুত করে নিতে পারে।
জাকাত বা দান সদকা:- জাকাত আদায় করা মুত্তাকির তৃতীয় গুণ। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, (তারাই মুত্তাকি যারা) আমার দেয়া রিজিক থেকে ব্যয় করে। (সূরা বাকারা, ৩) রমজানে বান্দা জাকাত বা দান সদকার মাধ্যমে অনায়াসে তাকওয়া অর্জন করতে পারে।
কুরআন তেলাওয়াত:- রমজানকে কুরআনের মাস বলা হয়। এমাসে কুরআন নাজিল হয়েছে। আর তা নাজিল হয়েছে মূলত মুত্তাকিদের হেদায়েতের জন্য। আল্লাহর ঘোষণা, এ সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই। (ইহা) মুত্তাকিদের জন্য পথ প্রদর্শনকারী স্বরূপ। (সূরা বাকারা, ২) রমজান-কুরআন-তাকওয়া- এ তিনটি একটি যোগসূত্রে গাঁথা। বান্দা এমাসে প্রচুর পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত ও কুরআন নির্দেশিত পথে চলে সত্যিকার অর্থে মুত্তাকি হতে পারে।
মুত্তাকি আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত। রমজান মাসে তাকওয়া অর্জন করে পাপমুক্ত হয়ে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে পারি তিনি আমাদের সবাইকে সে তাওফিক দান করুন।
লেখক: পেশ ইমাম, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট জামে মসজিদ, রাজশাহী