তামিম এবং এক হাতে ব্যাট করা অন্য নায়কেরা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৮, ১:০৪ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ক্রিকেটে ‘ডট বল’ মানেই দর্শকদের জন্য বিরক্তির কারণ। টেস্টে তবু মেনে যাওয়া যায়। কিন্তু সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ‘ডট বল’ দেয়া ব্যাটসম্যানের মু-ুপাত করতেও ছাড়ে না দর্শকেরা। অথচ শনিবার একটা ডট বল’ দিয়েই তামিম ইকবাল নাম লেখালেন কিংবদন্তিদের কাতারে। দুবাইয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দেয়া ওই ‘ডট বল’ই যে ক্রিকেট দুনিয়ার কাছে ফুটিয়ে তুলেছে তামিমের সত্যিকারের পরিচয়-দেশপ্রেমিক, দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ।
শনিবার এশিয়া কাপের উদ্বোধনী ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারেই বাঁ-হাতে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন তামিম। সুরঙ্গা লাকমালের করা ওভারের শেষ বলটি হঠাৎ লাফিয়ে উঠা বলটি পুলতে করতে চেয়েছিলেন তামিম। কিন্তু বলটি ব্যাটের পরিবর্তে তার কব্জিতে আঘাত হানে। সঙ্গে সঙ্গেই তামিম মাঠ ছেড়ে ফিরে যান ড্রেসিংরুমে। সেখান থেকে হাসপাতালে।
হাসপাতালে ডাক্তারি পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয়, তার বাঁ-হাতের দুটো আঙুলে চিড় ধরেছে। চোটের গুরুত্ব বুঝে চিকিৎসকদের ততক্ষণায় রায়, অন্তত ৬ সপ্তাহ তামিমকে কাটাতে হবে মাঠের বাইরে। মানে তামিমের এশিয়া কাপ শেষ। কিন্তু তার ঘণ্টা দুয়েক পরই তামিম ব্যাট হাতে নেমে পড়েন মাঠে!
এই নামাটা স্বাভাবিক ছিল না মোটেও। বরং ছিল অবিশ্বাস্য। হাতে ব্যান্ডেজ। পুরো হাতটাই স্লিংয়ে গলায় ঝুলানো। চোটগ্রস্ত আঙুল দুটোর কারণে গ্লাভস পরাই সম্ভব ছিল না। তিনি কিভাবে মাঠে নামবেন! কিন্তু তামিম নামলেন বিশেষ কায়দায়। চোটগ্রস্ত আঙুল দুটো যাভে গ্লাভসের বাইরে থাকে, সেভাবেই নিপূণ হাতে গ্লাভস কেটে।
নিপূণভাবে গ্লাভস কেটে তামিমের চোটগ্রস্ত হাতে পরার উপযোগী করে তৈরি করেছিলেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। তবে চ্যালেঞ্জটা নিতে হয়েছে তামিমকেই। আর শুধু চ্যালেঞ্জিং নয়, মাঠে নামার জন্য তামিমকে নিতে হয়েছে ক্যারিয়ারের ঝুঁকিও। কারণ, তামিম ভালো করেই জানতেন, চোটগ্রস্ত হাতে নতুন করে বল লাগলে তার ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে যেতে পারে!
এটা জেনেও তামিম ঝুঁকিটা নেন দলের জন্য। দেশের কথা ভেবে। আর দুর্দান্ত খেলতে থাকা মুশফিককে সঙ্গ দেওয়ার জন্য শুধু মাঠে নামা নয়, এক হাতে তাকে ব্যাটও করতে হয়েছে। ৪৭তম ওভারের সেই শেষ বলটিই ‘ডট’ দিয়েছেন তামিম। সেই ‘ডট বল’টিই তাকে নিয়ে গেছে ইতিহাসখ্যাত সেই ৪ কিংবদন্তির পাশে, যারা তামিমের আগেই এক হাতে ব্যাটিং করার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন।
সেই ৪ কিংবদন্তির কথায় পরে আসছি। তার আগে এই তথ্যটাও জেনে রাখার দরকার। ইনিংসের শুরুতে তামিম চোট পান লাকমালের বাউন্সারে। ৪৭তম ওভারের শেষ বলটিও চোটগ্রস্ত তামিমকে করেন সেই লাকমালই। এবং সুযোগ বুঝে লাকমাল এবারও দিয়েছিলেন বাউন্সার। তামিম চোটগ্রস্ত বাঁ-হাত লুকিয়ে রেখে ডান-হাতে দারুণ দক্ষতায় বলটি নিচে নামিয়েছেন।
তামিমের ওই ডট বল কীর্তির সূত্র ধরেই পরের ১৬ বলে ৩২ রান তুলে নেন মুশফিক। তাতে বাংলাদেশের রান ২২৯ থেকে হয়ে যায় ২৬১। তার চেয়েও বড় কথা, তামিমের এভাবে ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামাটাই বদলে দেয় বাংলাদেশ দলের আত্মবিশ্বাস। বদলে দেয় ম্যাচের গতিপ্রকৃতিও।
আর তামিমকে তো তুলে দিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। ইতিহাসের যে পাতাটিতে আগে থেকেই আছেন ম্যালকম মার্শাল, পল টেরি, সেলিম মালিক ও গ্রায়েম স্মিথ। এই ৪ কিংবদন্তিও দলের প্রয়োজনে এক হাতে ব্যাট করতে নেমেছেন। তবে এই ৪ জনই কাজটা করেছেন টেস্টে। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে তামিমই এক হাতে ব্যাট করতে নামা প্রথম ক্রিকেটার।
গায়ে ম্যাচ পাতানো কলঙ্ক থাকলেও ১৯৮৬ সালে ফয়সালাবাদ টেস্টে দলের প্রয়োজনে এক হাতে ব্যাট করতে নামার অবিশ্বাস্য কীর্তিটি গড়েন সেলিম মালিক। সতীর্থ ওয়াসিম আক্ররামকে হাফসেঞ্চুরি পাইয়ে দিতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেই টেস্টটিতে এক হাতে ব্যাট করতে নামেন সেলিম মালিক। ওয়াসিমকে ফিফটি পাইয়ে দিতে ১৪ বলে অপরাজিত ৩ রানও করেন তিনি। এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানও জিতেছিল টেস্টটা।
টেস্ট জিতেছিল ম্যালকম মার্শালের ওয়েস্ট ইন্ডিজও। ১৯৮৪ সালে হেডিংলি টেস্টের প্রথম ইনিংসে ল্যারি গোমেজ ৯৬ রানে অপরাজিত থাকার সময় ৯ উইকেট হারিয়ে ফেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সতীর্থকে সেঞ্চুরি পাইয়ে দিতেই এক হাতে ব্যাট করতে নামেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা পেসার মার্শাল। তার ত্যাগ সার্থকও হয়েছিল। ঠিকই সেঞ্চুরি করেছিলেন ল্যারি গোমেজ। পরে এক হাতে প্ল্যাস্টার নিয়ে অন্য হাতে বোলিং করেও মার্শাল নেন ৭ উইকেট। তাতে ম্যাচটাও জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ক্রিকেটীয় সামর্থে পল টেরি হয়তো কিংবদন্তি নন। তবে এক হাতে ব্যাটিং করার কীর্তিই তাকে দিয়েছে কিংবদন্তি খেতাব। ১৯৮৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টে সতীর্থ অ্যালান ল্যাম্বকে সেঞ্চুরি পেতে সহায়তা করতে এক হাতে ব্যাটিংয়ে নামেন টেরি। এবং এক হাতেই খেলে ফেলেন ৩৩ বল। তার এই ত্যাগের বিনিময়ে ল্যাম্ব ঠিকই তুলে নেন সেঞ্চুরি।
এক হাতে ব্যাট করার সর্বশেষ কীর্তিটি ছিল গ্রায়েম স্মিথের। ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিডনি টেস্টে দলের পরাজয় এড়াতে এক হাতে ব্যাটিংয়ে নেমেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন অধিনায়ক। ভাঙা হাত নিয়ে স্মিথ ১০টি বল সামলেছিলেনও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠিকই আউট হয়ে যান তিনি। হেরে যায় তার দলও। অবিশ্বাস্য সাহসিকতার জন্য স্মিথ স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেন ক্রিকেটপ্রেমীদের অন্তরে।